অবশ্য নির্বাচনকালীন সরকার কেমন হবে—এ নিয়ে বিভিন্ন দলের দেওয়া প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়ন করার এখতিয়ার ইসির নেই। এসব প্রস্তাব মানতে গেলে সংবিধান সংশোধন করতে হবে। ফলে জাতীয় সংসদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকা আওয়ামী লীগ না চাইলে এসব প্রস্তাব বাস্তবায়িত হবে না। তবে ইসি যদি মনে করে এই প্রস্তাবগুলোর বাস্তবায়ন হলে তা সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য সহায়ক হবে, তাহলে বিষয়টি সরকারকে জানাতে পারে।

সংবিধান অনুয়ায়ী, ক্ষমতাসীন সরকারের অধীনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন হবে। ভোটে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব না নেওয়া পর্যন্ত বর্তমান প্রধানমন্ত্রীই দায়িত্ব পালন করবেন।

এবারের সংলাপে কোনো সুনির্দিষ্ট আলোচ্যসূচি না থাকলেও নির্বাচনকালীন সরকারব্যবস্থার পাশাপাশি আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছিল ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহারের বিষয়টি। এই প্রশ্নে বেশির ভাগ রাজনৈতিক দলই ইভিএম ব্যবহারের বিপক্ষে মত দিয়েছে। তবে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ৩০০ আসনেই ইভিএমে ভোট চেয়েছে।

আর নির্বাচনকালীন সরকার প্রশ্নে দলটি বলেছে, নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ‘পাস্ট অ্যান্ড ক্লোজড চ্যাপটার’ (অতীত এবং সমাপ্ত অধ্যায়)। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় ইসির অধীনে নির্বাচন হবে। নির্বাচনকালীন সরকারের কর্মপরিধি দৈনন্দিন কাজে সীমিত থাকবে। প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ নির্বাচন পরিচালনার জন্য আবশ্যকীয় সব সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানকে ইসির ‘তত্ত্বাবধানে’ ন্যস্ত করা হবে।

default-image

সংলাপে বিভিন্ন দলের দেওয়া প্রস্তাবের মধ্যে ছিল, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর সংসদ ভেঙে দেওয়া, ভোটকেন্দ্রগুলোতে সিসিটিভি লাগানো, নির্বাচনের সময় সেনা মোতায়েন, সশস্ত্র বাহিনীকে বিচারিক ক্ষমতা দেওয়া, রাজনৈতিক মামলা ও হয়রানি বন্ধ করা, সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা, জেলা প্রশাসকদের রিটার্নিং কর্মকর্তা না করা, নির্বাচনে ধর্মের ব্যবহার বন্ধ করা, কালোটাকা ও পেশিশক্তির ব্যবহার বন্ধে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়াসহ বিভিন্ন প্রস্তাব দিয়েছে দলগুলো।

সংলাপে আসা সুপারিশগুলো পর্যালোচনা করে একটি কৌশলপত্র ঠিক করবে ইসি। এরপর তারা আবার অংশীজনদের সঙ্গে সংলাপে বসবে। এরপর নির্বাচনের চূড়ান্ত কৌশলপত্র ঠিক করা হবে বলে ইসি সূত্র জানিয়েছে।

এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার মো. আলমগীর গতকাল সোমবার সাংবাদিকদের বলেন, প্রস্তাবগুলো পর্যালোচনা করা হচ্ছে। মোটাদাগে তিন ধরনের সুপারিশ এসেছে। এর মধ্যে কিছু সুপারিশ ইসির এখতিয়ারের মধ্যে নয়। এসব সুপারিশের বিষয়ে আলাপ-আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তখন হয়তো ইসি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে প্রস্তাবগুলো পাঠিয়ে দেবে। তবে এ বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।

ইসির অধীনে মন্ত্রণালয়

নির্বাচনের সময় মাঠপর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকেন সরকারি কর্মকর্তারা। বিশেষ করে পুলিশ, প্রশাসন ও সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের ভূমিকা ভোটের সময় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সংলাপে অংশ নিয়ে ১২টি দল স্বরাষ্ট্র, জনপ্রশাসন, স্থানীয় সরকার, প্রতিরক্ষা, অর্থসহ গুরুত্বপূর্ণ কিছু মন্ত্রণালয় নির্বাচনের সময় সরাসরি ইসির অধীনে আনার প্রস্তাব করেছে। এসব প্রস্তাব দিয়েছে ইসলামী ফ্রন্ট, কংগ্রেস, জাসদ, সাম্যবাদী দল, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, তরীকত ফেডারেশন, ওয়ার্কার্স পার্টি, খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ মুসলিম লীগ, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, খেলাফত আন্দোলন ও জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ।

ওয়ার্কার্স পার্টির প্রস্তাবে স্বরাষ্ট্র, জনপ্রশাসন ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় নির্বাচনসংক্রান্ত কাজের জন্য নির্বাচনের সময়ে ইসির অধীনে নেওয়ার কথা বলেছে। দলটি বলেছে, নির্বাচনের আগের তিন মাস ও পরের তিন মাস নির্বাচনে যুক্ত ব্যক্তিদের বদলি, পদোন্নতি ও কর্তব্যে অবহেলার জন্য শাস্তি প্রদানের কর্তৃপক্ষ হিসেবে ইসি কাজ করবে। এ জন্য সংবিধান সংশোধন প্রয়োজন হবে না বলেও মনে করে দলটি।

তরীকত ফেডারেশন বলেছে, স্বরাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে ইসির তত্ত্বাবধানে বিশেষ মনিটরিং সেল গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে। আর জাসদ নির্বাচনের সময় ইসির চাহিদামতো নির্বাহী বিভাগকে ইসির অধীনে ন্যস্ত করার প্রস্তাব দিয়েছে।

নির্বাচনকালীন সরকার

নির্বাচনের সময়ে নতুন সরকার গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে ১০টি দল। এর মধ্যে কেউ কেউ দলনিরপেক্ষ সরকার চেয়েছে, আবার কেউ কেউ সর্বদলীয় সরকার গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে। নির্বাচনকালীন নতুন সরকারের প্রস্তাব দেওয়া দলগুলো হলো কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ, গণফোরাম, খেলাফত মজলিস, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, বাংলাদেশ মুসলিম লীগ, গণফ্রন্ট, সংস্কৃতিক মুক্তিজোট ও বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (কাঁঠাল প্রতীক)।

জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর সংসদ ও মন্ত্রিপরিষদ আর কার্যকর যাতে না থাকে, সে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ কংগ্রেস। আর এনডিএম বলেছে, নির্বাচনের সময় সিইসি ‘সুপার প্রাইম মিনিস্টারের’ ভূমিকায় থাকবেন। জনপ্রশাসন, স্বরাষ্ট্র, তথ্য ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে নতুন সচিব নিয়োগ দেবে ইসি।

default-image

সরকারের রূপরেখা

বাংলাদেশ মুসলিম লীগ তাদের প্রস্তাবে বলেছে, নিবন্ধিত দলগুলোর প্রতিনিধি নিয়ে নির্বাচনকালীন সরকার গঠন করতে হবে। সাংস্কৃতিক মুক্তিজোট বলেছে, ইসিতে নিবন্ধিত সব দল নিয়ে একটি জাতীয় পরিষদ গঠন করতে হবে। তারাই নির্বাচনকালীন সরকারের দায়িত্বে থাকবে।

গণফ্রন্ট বলেছে, একটি রাজনৈতিক সরকার গঠন করতে হবে। স্বাধীনতার পর থেকে বিতর্কিত নির্বাচনগুলো বাদে (১৯৮৬, ১৯৮৮, ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচন) জাতীয় সংসদে যেসব দলের প্রতিনিধি ছিল, তাদের সমন্বয়ে সরকার গঠন করা। তবে যাঁরা এই সরকারে থাকবেন, তাঁরা কেউ নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন না। সব নিবন্ধিত দলের সমন্বয়ে একটি নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের প্রস্তাব করেছে বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি।

ইভিএমের পক্ষে বিপক্ষে

আগামী জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে আরেকটি বিতর্ক চলছে ইভিএমের ব্যবহার নিয়ে। সংলাপে ইভিএম নিয়ে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেছে ২২টি দল। এর মধ্যে সংসদের প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টিসহ ১৪টি দল ইভিএমের বিপক্ষে মত দিয়েছে। আওয়ামী লীগসহ চারটি দল সরাসরি ইভিএমের পক্ষে বলেছে। এর মধ্যে আওয়ামী লীগ, গণতন্ত্রী পার্টি, বিকল্পধারা সব আসনে ইভিএম চেয়েছে। অন্তত ১৫০ আসনে ইভিএম চেয়েছে তরীকত ফেডারেশন। এর বাইরে চারটি দল (ওয়ার্কার্স পার্টি, জাসদ, এনপিপি ও বাংলাদেশ কংগ্রেস) শর্তসাপেক্ষে ইভিএম ব্যবহারের কথা বলেছে।

রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ইসির সংলাপের বিষয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার প্রথম আলোকে বলেন, নির্বাচনকালীন সরকার ও ইভিএম নিয়ে যেসব প্রস্তাব এসেছে, তা গুরুত্বপূর্ণ। এখন ইসি যদি মনে করে, এসব প্রস্তাবের বাস্তবায়ন না হলে দেশে সুষ্ঠু নির্বাচন করা সম্ভব নয়, তাহলে তাদের দায়িত্ব হলো এটি সরকারকে জানানো। এসব প্রস্তাব বিবেচনায় না নিয়ে একতরফা নির্বাচনের দিকে গেলে দেশে সংকট বাড়বে। আর অতীত অভিজ্ঞতার আলোকে বলা যায়, বিদ্যমান পরিস্থিতিতে দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন করা সম্ভব নয়।

রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন