এদিকে রওশন এরশাদের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্রের দাবি, এখনই জি এম কাদেরকে সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা করা হচ্ছে না। কারণ, রওশন এরশাদের ব্যাপারে আগে থেকেই সরকারের উচ্চ মহল সহানুভূতিশীল।

রওশন দীর্ঘদিন ধরে ব্যাংককের হাসপাতালে শয্যাশায়ী। তিনি বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে বিদেশে চিকিৎসায় সরকারি যে আর্থিক সহযোগিতা পাচ্ছেন, পদ হারালে সেটা আর পাবেন না। এ কারণে রওশন এরশাদ বিরোধীদলীয় নেতার পদ ধরে রাখতে চান। সরকারও এ ব্যাপারে সহানুভূতিশীল। এ অবস্থায় রওশন তাঁর অনুসারীদের নিয়ে ২৬ নভেম্বর দলের যে সম্মেলন ডেকেছিলেন, সেটা আপাতত বন্ধ করিয়ে সরকার জি এম কাদেরের নেতৃত্বাধীন জাপাকে সংসদে ফেরাতে উদ্যোগ নেয়।

এর আগে গত রোববার জাপার সংসদীয় দল সিদ্ধান্ত নেয়, জি এম কাদেরকে বিরোধীদলীয় নেতা করতে তারা দুই মাস আগে সংসদে যে প্রস্তাব পাঠিয়েছে, সেটা কার্যকর না করা পর্যন্ত সংসদে যাবে না। কিন্তু পরদিন সোমবার জাপা সংসদ অধিবেশনে যোগ দেয়। তার আগে বিকেলে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে দলটি জানায়, ‘স্পিকারের আশ্বাসের পরিপ্রেক্ষিতে’ তাঁরা সংসদে যাচ্ছেন।

যদিও সংসদ সচিবালয়ের দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, জাপাকে স্পিকার আশ্বাস দিয়েছেন বলে যে কথা বলা হচ্ছে, সংসদ সচিবালয় সে বিষয়ে অবহিত নয়। এ বিষয়ে জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী স্পিকার যে সিদ্ধান্তই নেন, তা সংসদের অধিবেশনেই জানানো হবে।

জি এম কাদেরকে বিরোধীদলীয় নেতা করার বিষয়টি নিয়ে গত রোববার স্পিকারের সঙ্গে কথা বলেছিলেন, জাপার এমন একজন নেতা প্রথম আলোকে বলেছেন, তাঁরা স্পিকারের কথাবার্তায় সন্তুষ্ট হতে পারেননি। স্পিকার আইনি জটিলতার কথা উল্লেখ করে বিষয়টি নিয়ে রুলিং দেওয়ার কথা জানান। এরপর রোববার রাতে জাপা সংসদে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত গণমাধ্যমকে জানায়।

এখন সরকারের কোন পর্যায় থেকে কী ধরনের আশ্বাসে জাপা সিদ্ধান্ত পাল্টে সংসদে গেল, তা নিয়েই নানা আলোচনা চলছে। এর সঙ্গে রওশন এরশাদ আহূত দলীয় সম্মেলন স্থগিত করার কোনো যোগসূত্র আছে কি না, সেটাও আলোচিত হচ্ছে দলের নেতা-কর্মীদের মধ্যে। রোববার জি এম কাদেরের নেতৃত্বাধীন জাপা সংসদ বর্জনের ঘোষণা দেওয়ার পর ওই রাতেই রওশন এরশাদ আহূত ২৬ নভেম্বরের সম্মেলন স্থগিত করে গণমাধ্যমে বিজ্ঞপ্তি পাঠান তাঁর প্রেস উইংয়ের দায়িত্বশীল কাজী লুৎফুল কবীর। বিজ্ঞপ্তিতে সম্মেলন স্থগিত করার কারণ উল্লেখ ছিল না। কাজী লুৎফুল কবীর সোমবার রাতে প্রথম আলোকে বলেন, এ বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না।

এ বিষয়ে জানতে ব্যাংককে চিকিৎসাধীন জাপার প্রধান পৃষ্ঠপোষক রওশন এরশাদকে সোমবার কয়েক বার ফোন দিলেও তিনি ধরেননি। তাঁর সঙ্গে থাকা ছেলে সাদ এরশাদের ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়। ঢাকায় রওশনের পক্ষ হয়ে তৎপর নেতাদেরও ফোন বন্ধ ছিল।

জাপার দায়িত্বশীল একাধিক সূত্র জানায়, জি এম কাদেরের নেতৃত্বে জাপার সংসদীয় দল সংসদ বর্জনের ঘোষণা দেওয়ার পর সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে রওশন এরশাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। এরপরই ঢাকায় রওশনের পক্ষে সক্রিয় দুজন নেতাকে সম্মেলন স্থগিত ঘোষণা করতে বলা হয়। তারপর তড়িঘড়ি করে ওই সংবাদ বিজ্ঞপ্তি পাঠানো হয়।

অপরদিকে রোববার রাতেই জাপার কয়েকজন সংসদ সদস্যের সঙ্গে সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে আলাদাভাবে যোগাযোগ করা হয় এবং তাঁদের মনোভাব জানার চেষ্টা করা হয় বলে জানা গেছে।

সোমবার বিকেল সাড়ে চারটায় সংসদের অধিবেশন শুরু হয়। তার আগে দুপুরের দিকে সংসদ এলাকায় যান জাপার কয়েকজন সংসদ সদস্য। এ খবর দলের শীর্ষ নেতৃত্বের কানে গেলে বিকেল তিনটার দিকে গণমাধ্যমে বিজ্ঞপ্তি পাঠিয়ে বলা হয়, দলের চেয়ারম্যান ও সংসদে বিরোধীদলীয় উপনেতা জি এম কাদের দলীয় সংসদ সদস্যদের সংসদে যোগ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। পরে দলের সংসদ সদস্য কাজী ফিরোজ রশীদকে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ করার লিখিত প্রস্তাব জমা দেয় জাপা। এ পদে থাকা মসিউর রহমানকে সম্প্রতি দল থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।

তবে জাপার মহাসচিব মো. মুজিবুল হক প্রথম আলোকে বলেন, রওশন এরশাদের সম্মেলন স্থগিত করার সঙ্গে জাপার সংসদে যোগদানের কোনো সম্পর্ক নেই। জি এম কাদেরকে বিরোধীদলীয় নেতা করার বিষয়ে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সিদ্ধান্ত দেওয়া হবে, স্পিকারের এমন আশ্বাস পেয়েই তাঁরা সংসদ অধিবেশনে যোগ দিয়েছেন।