গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট লংমার্চে মিটলে আমরাই আগে করতাম: প্রধানমন্ত্রী
গাড়ির লংমার্চ করে গ্যাস বা বিদ্যুতের সমস্যার সমাধান করা গেলে বিএনপিই সবার আগে লংমার্চের আয়োজন করত বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বিরোধী দলের লংমার্চ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এ সংকট সমাধানে সরকার বিরোধী দলের সহায়তা আশা করেছিল। উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া এসব সমস্যাকে অজুহাত হিসেবে না দেখিয়ে সমাধানে কাজ করছে সরকার।
আজ বৃহস্পতিবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের সমাপনী ভাষণে প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমান এসব কথা বলেন। গত ২৭ আগস্ট এই অধিবেশন শুরু হয়েছিল। সমাপনী বক্তব্যে তিনি গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট ও তা সমাধানে সরকারের উদ্যোগ, বিভিন্ন খাতের অনিয়ম-দুর্নীতি এবং সরকারি ও বিরোধী দলের সম্পর্ক নিয়ে কথা বলেন।
সরকার কী পরিস্থিতিতে দায়িত্ব নিয়েছিল তা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় গ্যাস-বিদ্যুৎ, শিল্পকারখানা, শিক্ষাব্যবস্থা ও ব্যাংক খাতসহ প্রতিটি খাতে অনিয়ম-দুর্নীতির পাহাড় ছিল। এসব বিষয়ে দেশের জনগণ ওয়াকিবহাল।
কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের সমালোচনা করে তারেক রহমান বলেন, এর নামে কিছু মানুষকে সুবিধা দিয়ে রাষ্ট্রকে ঋণগ্রস্ত করা হয়েছে। তারপরও বিদ্যুৎ সমস্যার স্থায়ী সমাধান করতে পারেনি বিগত সরকার।
লংমার্চে সমাধান হলে আমরাই আগে করতাম
গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট সমাধানে সরকার বিরোধী দলের সহায়তা আশা করেছিল বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘আমরা দেখলাম, একটি বিশাল গাড়ির লংমার্চ আয়োজন করা হয়েছিল। বাইরে বিভিন্ন মানুষ একটি কথা বলে যে, জনগণকে অযথা উত্তেজিত করে অন্য কিছু করার অপচেষ্টা করা হয়েছিল কি না? গাড়ির লংমার্চ করে যদি গ্যাস বা বিদ্যুতের সমস্যার সমাধান করাই যেত, তাহলে আমরাই সবচেয়ে আগে লংমার্চের আয়োজন করতাম।’
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর ২০২২ সালে তৎকালীন সরকারের নেওয়া কিছু উদ্যোগের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, যারা ২০০৯ সাল থেকে বছরের পর বছর ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রেখেছিল, মানুষের কথা বলা ও ভোটের অধিকার কেড়ে নিয়েছিল, তাদেরও বিদ্যুৎ সমস্যা মোকাবিলায় বিশেষ ব্যবস্থা নিতে হয়েছিল।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এখনো চলছে। এর মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং দেশে একটি এলএনজি টার্মিনালে দুর্ঘটনা ঘটেছে। এরপরও সরকার সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করছে।
বাস্তব পরিস্থিতি জনগণের সামনে তুলে ধরা সব সংসদ সদস্যের দায়িত্ব বলে উল্লেখ করেন সংসদ নেতা। তিনি বলেন, এই অধিবেশনেই বিদ্যুৎ সমস্যা মোকাবিলায় সরকারের পদক্ষেপ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। ইতিমধ্যে সরকার অনেকগুলো ব্যবস্থা নিয়েছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গ্যাস ও বিদ্যুতের সমস্যার সমাধান করতে পারবে বলে সরকার দৃঢ়ভাবে আশাবাদী।
তারেক রহমান বলেন, বিএনপি যতবার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে, প্রতিবার দেশকে বিপর্যয়কর পরিস্থিতি থেকে বের করে আনতে সক্ষম হয়েছে। এ সময় সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার বিভিন্ন অবদানের কথাও তুলে ধরেন তিনি।
অদৃশ্য ইশারায় গ্যাস উত্তোলনের চেষ্টা হয়নি
দেশীয় উৎস থেকে গ্যাস উত্তোলনে বিগত সরকারের উদ্যোগের সমালোচনা করে সংসদ নেতা তারেক রহমান বলেন, ‘বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের ডানে এবং বামে বাংলাদেশের প্রতিবেশী দেশগুলো সমুদ্র থেকে গ্যাস আহরণ করছে। কোনো এক অদৃশ্য ইশারায় মধ্যখানে বাংলাদেশের অংশে বঙ্গোপসাগর থেকে গ্যাস উত্তোলনের কোনো চেষ্টা করা হয়নি।’
কোনো দেশের নাম উল্লেখ না করে তারেক রহমান বলেন, ‘অনেকে বলে থাকে, বিশেষ কোনো দেশ যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, তারা যাতে নির্বিঘ্নে গ্যাস নিয়ে যেতে পারে, সেই জন্যই বাংলাদেশের অংশে বঙ্গোপসাগরে গ্যাসকূপ খনন করা হয়নি।’ তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্য ছিল বাংলাদেশের গ্যাস আমদানির প্রধান উৎস। দেশকে পুরোপুরি আমদানিনির্ভর করে ফেলা হয়েছিল।
বর্তমান সংকটের কারণ ব্যাখ্যা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিএনপি সরকার গঠনের ১০-১২ দিনের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি শুরু হয়। এতে ওই অঞ্চল থেকে তেল ও গ্যাস আমদানিতে সমস্যা দেখা দেয়। এর মধ্যে দেশে থাকা দুটি ভাসমান এলএনজি সংরক্ষণ ও পুনঃগ্যাসীকরণ ইউনিটের (এফএসআরইউ) একটিতে দুর্ঘটনা ঘটে। সেটি বিকল হয়ে যাওয়ায় সংকট আরও বেড়েছে।
দুর্নীতি ও খেলাপি ঋণ প্রসঙ্গ
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ফ্যাসিস্ট অপশক্তি ২০০১ সালের জুনে বাংলাদেশকে দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন বানিয়ে জুলাই মাসে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা থেকে বিদায় নিয়েছিল। তাঁর দাবি, বিএনপি সরকার ২০০১ থেকে ২০০৬ সালে সুশাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাংলাদেশকে দুর্নীতির কলঙ্ক থেকে বের করে আনতে সক্ষম হয়েছিল।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের দুঃশাসন, দুর্নীতি, লুটপাট ও অর্থ পাচারের সমালোচনা করে তারেক রহমান বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশ ছেড়ে পালানোর আগ পর্যন্ত তাদের কর্মকাণ্ডের কারণে বাংলাদেশকে ঋণখেলাপির অপবাদ সইতে হয়েছে। এই অভিশাপ থেকে দেশকে মুক্ত করার দায়িত্ব এখন বিএনপির কাঁধে পড়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের উদ্যোগ নিয়েছে। বিভিন্ন উদ্যোগের ফলে বর্তমানে খেলাপি ঋণের অনুপাত কমেছে এবং পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে বলে জানান তিনি।
ভিন্নমত যেন শত্রুতায় রূপ না নেয়
বাক্স্বাধীনতা চর্চায় শালীনতা বজায় রাখার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘ফ্যাসিবাদী শাসনামলে জনগণের সকল গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। কেড়ে নেওয়া হয়েছিল বাক্স্বাধীনতা। বর্তমানে দেশে গণতান্ত্রিক একটি পরিবেশ বিরাজ করছে, বাক্স্বাধীনতা অবারিত। কিন্তু আমাদের মনে রাখা দরকার, বাক্স্বাধীনতা যেন বাক্শালীনতার সীমা লঙ্ঘন না করে।’
রাজনীতিতে গালাগালির সংস্কৃতির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান তারেক রহমান। এ জন্য দলমত নির্বিশেষে সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের তাগিদ দেন তিনি।
সরকারি ও বিরোধী দল মিলে কল্যাণকর রাষ্ট্র গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, গণতন্ত্রের পক্ষের শক্তির মধ্যে বিভেদ-বিরোধ শেষ পর্যন্ত বিতাড়িত ফ্যাসিস্ট অপশক্তিকে পুনর্জীবিত করতে পারে। সেই পথ সুগম করতে পারে। এটি যেন কেউ ভুলে না যান।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় ভিন্নমত ও রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা থাকবে। সারা পৃথিবীতেই তা আছে। এটিও গণতান্ত্রিক চর্চা। তবে ভিন্নমত যেন শত্রুতায় রূপ না নেয়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।
সংসদকে সমস্যা সমাধানের কেন্দ্র করতে চান
চলতি অধিবেশনে বিভিন্ন সমস্যা ও সম্ভাবনা নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে বলে উল্লেখ করেন সংসদ নেতা। তিনি বলেন, প্রতিটি আলোচনা কার্যকর হয়েছে, এমন দাবি তিনি করবেন না। তবে সদিচ্ছার অভাব ছিল না, সেটি প্রমাণিত হয়েছে। তাঁরা সংসদকে জাতীয় স্বার্থ রক্ষা ও সমস্যা সমাধানের কেন্দ্রবিন্দু করতে চান।
তারেক রহমান বলেন, উভয় পক্ষ দেশ ও জনগণের স্বার্থে কাজ করছে, আলোচনা করেছে এবং কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার চেষ্টা করেছে—এ বিষয়ে তাঁর বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনগণ বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারের পক্ষে রায় দিয়ে দলটিকে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছে। কার্যকর সংসদীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থায় বিরোধী দলও সরকারের অংশ। তাই বিরোধী দলকে সঙ্গে নিয়ে তাঁরা দেশ ও জনগণের কল্যাণে কাজ করতে চান। জনগণকে দেওয়া প্রতিটি প্রতিশ্রুতি পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়নের জন্য বিএনপি কাজ করছে।