জাতীয় পার্টিতে রওশনপন্থীরা তৎপর, লক্ষ্য উপনির্বাচন

রওশন এরশাদ
ফাইল ছবি

এবারও রওশন এরশাদকে সামনে রেখে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন করতে চায় জাতীয় পার্টির (জাপা) একটি অংশ। বিএনপির সদ্য ছেড়ে দেওয়া আসনগুলোর উপনির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়ন দিয়ে এর শুরু করতে চাইছে তারা। গত বুধবার রাতে হঠাৎ রওশন এরশাদকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ঘোষণা করা তারই অংশ বলে দলের দায়িত্বশীল বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ৭ ডিসেম্বর রাজধানীর ওয়েস্টিন হোটেলে রওশন এরশাদের উপস্থিতিতে জাপার কো–চেয়ারম্যান ও প্রেসিডিয়ামের ছয় সদস্যের একটি অনানুষ্ঠানিক সভা হয়। সেখানে রওশনকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তবে তা গণমাধ্যমে জানানো হয়নি। এক সপ্তাহ পর বুধবার রাতে সেটি প্রকাশ করা হয় দুটি ইন্টারনেটভিত্তিক যোগাযোগমাধ্যমে। এগুলো পরিচালনা করেন রওশন এরশাদের ঘনিষ্ঠজনেরা।

আরও পড়ুন

জাপার দায়িত্বশীল একাধিক সূত্র থেকে জানা গেছে, কোনো সাংগঠনিক নিয়ম না মেনে হঠাৎ রওশন এরশাদকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ঘোষণায় দলের ভেতরে তীব্র প্রতিক্রিয়া হয়। এ পরিস্থিতিতে জাপার ভেতরের ও বাইরের বিভিন্ন মহলের তাৎক্ষণিক তৎপরতায় রওশনকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান করার ঘোষণা স্থগিত করা হয়। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, রওশনপন্থীদের এ তৎপরতা একেবারে বাতিল হয়নি। কৌশলগত কারণে আপাতত রওশনপন্থীদের থামানো হলেও জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে তা আবার শুরু হতে পারে।

নির্দলীয় সরকারের অধীন নির্বাচনসহ ১০ দফা দাবিতে ১১ ডিসেম্বর বিএনপির সংসদ সদস্যরা পদত্যাগ করেন। শূন্য হওয়া ছয় আসনে উপনির্বাচনের জন্য আগামীকাল রোববার তফসিল ঘোষণা করবে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।

জাপার নেতা-কর্মীদের অনেকের ধারণা, শূন্য আসনগুলোর উপনির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়ন নিয়ে দলে জটিলতা দেখা দিতে পারে। কারণ, আসনগুলোতে রওশন এরশাদ তাঁর অনুগত ব্যক্তিদের মনোনয়ন দিতে চান। কিন্তু সেটি দলের শীর্ষ নেতৃত্বের কাছে কতটা গ্রহণযোগ্য হবে, তা নিয়ে নেতা-কর্মীদের মধ্যে সংশয় আছে। ইতিমধ্যে গুঞ্জন ছড়িয়েছে যে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে জিয়াউল হক (মৃধা), ঠাকুরগাঁও-৩–এ হাফিজউদ্দিন আহমেদ, বগুড়া-৬–এ নুরুল ইসলাম এবং কাজী মামুনুর রশীদকে কোনো একটি আসনে প্রার্থী করার কথা ঘনিষ্ঠজনদের বলেছেন রওশন এরশাদ। এর মধ্যে জিয়াউল হক ও কাজী মামুনুর রশীদকে নিয়ে দলে বিতর্ক আছে।

আরও পড়ুন

জিয়াউল হক গতকাল শুক্রবার প্রথম আলোকে বলেন, ‘নমিনেশন (মনোনয়ন) তো আমারই হবে। ম্যাডাম (রওশন এরশাদ) আমাকে বলেছেন এলাকায় কাজ করার জন্য। বাকিটা উনি বুঝবেন।’

ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে ২০১৮ সালের নির্বাচনে জাপার প্রার্থী ছিলেন প্রেসিডিয়াম সদস্য রেজাউল ইসলাম ভূঁইয়া। তিনি জিয়াউল হকের জামাতা। সে নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে জিয়াউল হক স্বতন্ত্র প্রার্থী হন। জয়ী হন বিএনপির আবদুস সাত্তার। এবারও এ আসনে এই দুজনকে নিয়ে রওশন এরশাদ ও জি এম কাদেরের মধ্যে টানাপোড়েন চলছে।

আরও পড়ুন

এ বিষয়ে জিয়াউল হক বলেন, ‘আমি এক মেরুতে, সে (রেজাউল) আরেক মেরুতে। এখানে পারিবারিক সম্পর্ক আর রাজনৈতিক সম্পর্কটা ভিন্ন। তাকে নিয়ে আমি ভাবছি না। নেতারা যদি ঐক্য চায়, শান্তি চায়, তাহলে সমঝোতা হবে। নাহয় আইন আইনের গতিতে চলবে।’

জাপার নেতারা বলছেন, উপনির্বাচনে যে চারজনকে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেওয়ার গুঞ্জন বা আশা দেখানো হচ্ছে, তাঁদের মধ্যে জিয়াউল হক দল থেকে বহিষ্কৃত। তাঁর করা মামলায় জাপার চেয়ারম্যান হিসেবে জি এম কাদেরের ওপর দলীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছেন আদালত। কাজী মামুনুর রশীদও জাপার কেউ নন। সম্প্রতি তাঁর বিরুদ্ধে জি এম কাদেরকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার অভিযোগে উত্তরা পশ্চিম থানায় সাধারণ ডায়েরি করা হয়।

আরও পড়ুন

জানা গেছে, ব্যাংককে চিকিৎসাধীন থেকে রওশন এরশাদ জাপার সম্মেলন আহ্বান করে দলে যে বিতর্ক সৃষ্টি করেছেন, তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত জিয়াউল হক ও কাজী মামুনুর রশীদ। অন্য দুজন হাফিজউদ্দিন আহমেদ দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও নুরুল ইসলাম জাপা চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য। তাঁরা জি এম কাদেরের সঙ্গে আছেন বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।

মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে গণভবনে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন জাপার প্রধান পৃষ্ঠপোষক ও সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ এবং জাপার চেয়ারম্যান জি এম কাদের। সেখানে বিভিন্ন আলোচনার মধ্যে বিএনপির সংসদ সদস্যদের শূন্য আসনগুলোতে উপনির্বাচনের বিষয়টিও আসে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। এরপর উপনির্বাচনে জাপার অংশগ্রহণ, প্রার্থী মনোনয়ন এবং এ মনোনয়ন ঘিরে আর্থিক সুবিধা নেওয়ার বিষয়ে নেতা-কর্মীদের মধ্যে নানা আলোচনা ও গুঞ্জন শুরু হয়। বর্তমানে সংসদে জাপার ২৬ জন সংসদ সদস্য আছেন। এর মধ্যে চারজন সংরক্ষিত মহিলা আসনের সদস্য।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে জাপার একজন প্রেসিডিয়াম সদস্য প্রথম আলোকে বলেন, বর্তমানে জাপাকে ঘিরে একই সঙ্গে দুই ধরনের তৎপরতা চলছে। এর একটি হচ্ছে সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে দলকে নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা। অন্যটি হচ্ছে, রওশন এরশাদকে সামনে রেখে কোনো কোনো নেতার আখের গোছানোর ধান্দা। দুটো মিলেই দলে নাটকীয় ঘটনাগুলো ঘটছে।

জাপা দলীয় সূত্র জানায়, জি এম কাদেরকে আদালতে রেখে অনেকটা তড়িঘড়ি করে রওশনকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ঘোষণার লক্ষ্য মূলত দুটি। রওশনকে দলীয় মনোনয়নের ক্ষমতা দেওয়া এবং এর মাধ্যমে সম্ভাব্য প্রার্থীদের কাছ থেকে সুবিধা নেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করা। সম্প্রতি রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে জাপার প্রার্থী মনোনয়নেও একই ধরনের তৎপরতা ছিল। জাপার পক্ষ থেকে মোস্তাফিজার রহমানকে মেয়র প্রার্থী করার পরও রওশনপন্থী নেতারা দলের আরেক নেতা আবদুর রউফকে (মানিক) দলীয় মনোনয়ন দেওয়ার চেষ্টা চালান। এর জন্য আবদুর রউফ থেকে আর্থিক সুবিধা নেওয়ার কথাও নেতা-কর্মীদের মধ্যে ওই সময় আলোচনা ছিল।

জানা গেছে, এই চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর মোস্তাফিজারের মনোনয়নপত্রের ফরমে স্বাক্ষর নিয়ে ধূম্রজাল সৃষ্টি করা হয়। আদালতের অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার কারণে তখন জাপার চেয়ারম্যান হিসেবে জি এম কাদের মনোনয়ন ফরমে সই করতে পারেননি। তাঁর পরিবর্তে মহাসচিব মো. মুজিবুল হক সই করেন। তবু মোস্তাফিজারকে ডেকে তাঁকে রওশন এরশাদ মনোনয়নের পৃথক চিঠি দেন। যদিও রওশনের এই চিঠি মোস্তাফিজার রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে জমা দেননি। এখন আসন্ন উপনির্বাচনে দলীয় প্রার্থী মনোনয়ন নিয়েও একই বিতর্ক উঠতে পারে বলে নেতা-কর্মীদের অনেকে আশঙ্কা করছেন।

এ বিষয়ে জাপার মহাসচিব মো. মুজিবুল হক প্রথম আলোকে বলেন, জাতীয় পার্টির গঠনতন্ত্র এবং নির্বাচন কমিশনের আইন অনুযায়ী, দলের নির্বাচিত চেয়ারম্যান ও মহাসচিব ছাড়া অন্য কেউ দলের মনোনয়নপত্রে সই করার সুযোগ নেই। জি এম কাদের দলের কাউন্সিলে নির্বাচিত চেয়ারম্যান। কেউ যদি এর বাইরে ভিন্ন কিছু করার চিন্তা করেন, বুঝতে হবে, তিনি আইনকানুন বোঝেন না। এটা পাগলামি ছাড়া আর কিছু হবে না।