স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও জ্বালানিমন্ত্রী পদত্যাগ না করলে প্রধানমন্ত্রীকে ‘ঘেরাও’ করার হুমকি দিলেন নাহিদ

সমাবেশে বক্তব্য দিচ্ছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। আজ শুক্রবার বিকেলে শাহবাগে।ছবি: দীপু মালাকার

দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার অভিযোগ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এবং বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর পদত্যাগ দাবি করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেছেন, ‘এই দুজন মন্ত্রীই তাঁদের ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়েছেন। তাঁরা যদি পদত্যাগ না করেন, তাহলে দেশের সর্বত্র আমরা মিছিল করব। সেই মিছিল নিয়ে আমরা জনাব তারেক রহমানকে (প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান) ঘেরাও করে আমাদের দাবি আদায় করে ছাড়ব, ইনশা আল্লাহ।’

আজ শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনে গণবিক্ষোভ সমাবেশে সমাপনী বক্তব্যে জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম এ কথা বলেন। ‘দেশব্যাপী সরকার প্রযোজিত খুন, লুটতরাজ, অরাজকতা, আইনশৃঙ্খলার অবনতি, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, নিত্যপণ্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে দলীয়করণের প্রতিবাদে’ এনসিপির ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ শাখার যৌথ উদ্যোগে এ সমাবেশ হয়।

ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে এনসিপির দুই প্রার্থী আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া ও নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর উপস্থিতিতে এ সমাবেশে কয়েক হাজার নেতা–কর্মী অংশ নেন। জাতীয় জাদুঘরের সামনের চত্বর ও আশপাশের সড়কে অবস্থান নেন নেতা–কর্মীরা।

সমাবেশে সরকারের সমালোচনা করে নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, রাহাজানিতে সবার জীবন আজ নাজেহাল। দেশে বিদ্যুৎ নেই, গ্যাস নেই। দেশের সব প্রতিষ্ঠানে দলীয়করণ হচ্ছে, আইনশৃঙ্খলার অবনতি হয়েছে। মানুষের নিরাপত্তা দিতে বর্তমান সরকার সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়েছে। এ ব্যর্থতার দায় সবচেয়ে বেশি বর্তায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের ওপর। তিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব বাদ দিয়ে সংবিধান সংশোধনের কাজে ব্যস্ত হয়েছেন। গণভোটের গণরায় বাদ দিয়ে তিনি সংবিধান কাটাছেঁড়ার দায়িত্ব নিয়েছেন। চলমান নৈরাজ্য ও গুম–খুনের দায় নিয়ে তাঁকে পদত্যাগ করতে হবে। সঙ্গে জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদকেও পদত্যাগ করতে হবে। কারণ, দুজনই তাঁদের ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়েছেন।’

‘নতুন স্বৈরাচারের উত্থান দেখছি’

বিএনপি সরকার ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে দেশ পরিচালনা করার কোনো ধরনের পরিকল্পনাই নেই বলে মন্তব্য করেছেন নাহিদ ইসলাম। প্রধানমন্ত্রীর সমালোচনা করে সমাবেশে তিনি বলেন, ‘কীভাবে দেশে দুর্নীতি, লুটপাট, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস ও দখলদারত্ব কায়েম করা হবে, সেই পরিকল্পনা নিয়ে তারেক রহমান লন্ডন থেকে ঢাকায় এসেছেন। আমরা এক স্বৈরাচারকে বিদায় করে এখন নতুন স্বৈরাচারের উত্থান দেখছি। কিন্তু জনগণের সামনে আমাদের প্রতিশ্রুতি, পতিত স্বৈরাচার এবং এই নব্য স্বৈরাচার–এই দুই স্বৈরাচারকেই আমরা পরাজিত করব, ইনশা আল্লাহ।’

এনসিপির সমাবেশে উপস্থিত নেতা–কর্মীদের একাংশ। আজ শুক্রবার বিকেলে শাহবাগে
ছবি: দীপু মালাকার

আগামী ডিসেম্বরে জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা প্রসঙ্গে নাহিদ বলেন, ‘আগামী ডিসেম্বরে শুনছি পতিত স্বৈরাচার নাকি আসবে দেশে! আমরা জানি, সেই স্বৈরাচারকে এই নতুন স্বৈরাচার কোনোভাবেই মোকাবিলা করতে পারবে না।...তাই বাংলাদেশের তরুণদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে, জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের জনগণকে আবারও ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।’

করিডর, গঙ্গা চুক্তি প্রসঙ্গ

সীমান্তে হত্যা, পাহাড়ে অশান্তি, আসাম ও পশ্চিমবঙ্গে মুসলমানদের নির্যাতন, দিল্লিতে মসজিদ ভেঙে দেওয়ার পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেছেন, বর্তমান সরকার ভারতের চক্রান্ত থেকে বাংলাদেশকে রক্ষা করতে পারবে না। জাপানে গিয়ে আবারও বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে অবৈধ করিডর ভারতের হাতে তুলে দেওয়ার অপচেষ্টা চালাচ্ছেন তারেক রহমান। এ ধরনের কোনো অবৈধ করিডর বাংলাদেশের জনগণ মেনে নেবে না।

এনসিপির সমাবেশের মঞ্চে দলটির নেতারা। আজ শুক্রবার বিকেলে শাহবাগে
ছবি: প্রথম আলো

এনসিপির আহ্বায়ক বলেন, আগামী ডিসেম্বরে যদি গঙ্গা চুক্তি ন্যায্যভাবে নতুন করে তৈরি করা না হয়, বাংলাদেশের জনগণ আবারও মাঠে নামবে। ‘এবার আমরা গঙ্গা চুক্তিতে কোনোভাবেই বিন্দু পরিমাণ আমাদের ন্যায্য হিস্যায় ছাড় দেব না’ বলে উল্লেখ করেন নাহিদ।

ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটিতে এনসিপির প্রার্থী নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ও আসিফ মাহমুদের কথা উল্লেখ করে নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে ঢাকা–৮ আসনে পরিকল্পনা ও ষড়যন্ত্র করে হারানো হয়েছিল। ইনশা আল্লাহ, এবার আমরা তাঁকে হারতে দেব না। আসিফ মাহমুদকে পরিকল্পনা করে নির্বাচনের বাইরে রেখে যারা ভেবেছিল, গণ–অভ্যুত্থানের শক্তিকে নিঃশেষ করে দেবে, তারাও ইনশা আল্লাহ এবারের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে পরাজিত হবে।’

কলকাতায় ইরান যুদ্ধের প্রভাব পড়ে না?

গণবিক্ষোভ সমাবেশে এনসিপির সদস্যসচিব ও সংসদ সদস্য আখতার হোসেন বলেন, কলকাতায় এলপিজির দাম হাজার টাকা, বাংলাদেশে সেই গ্যাস কিনতে হচ্ছে ২৫০০ টাকায়। কলকাতায় কি ইরান যুদ্ধের প্রভাব পড়ে না? এর উত্তর জ্বালানিমন্ত্রীকে দিতে হবে।

সংবিধান সংশোধন কমিটি বাতিল করে গণভোটের রায় অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের দাবি জানান আখতার। মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য আওয়ামী লীগ ও তার দোসরদের বিচারের আওতায় আনার দাবিও জানান তিনি।

সমাবেশ থেকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও জ্বালানিমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করেছেন এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। আজ শুক্রবার বিকেলে শাহবাগে
ছবি: প্রথম আলো

এনসিপির ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আহ্বায়ক ইসহাক সরকার সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন। দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্যসচিব আসিফ মাহমুদ, যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব ও আকরাম হুসাইন, জাতীয় নারীশক্তির আহ্বায়ক ও সংসদ সদস্য মাহমুদা আলম, জাতীয় যুবশক্তির সভাপতি তারিকুল ইসলাম, জাতীয় ছাত্রশক্তির সভাপতি আবু বাকের মজুমদার ছাড়াও দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা সমাবেশে বক্তব্য দেন।

সমাবেশে বিপুল জমায়েত

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর আজকের গণবিক্ষোভ সমাবেশটি ছিল এনসিপির মাঠপর্যায়ের সবচেয়ে বড় কর্মসূচি। দলের বিভিন্ন পর্যায়ের কয়েক হাজার নেতা–কর্মী সমাবেশে যোগ দিয়েছিলেন। কর্মসূচির আগে সপ্তাহজুড়ে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় প্রচারপত্র বিতরণ করেছিলেন এনসিপির জ্যেষ্ঠ নেতারা।

শাহবাগে গণবিক্ষোভ শুরু হওয়ার কথা ছিল বেলা তিনটায়। তিনটার আগে থেকেই বাংলামোটরে এনসিপি কার্যালয়ের নিচে ও শাহবাগে দলটির নেতা-কর্মীরা জড়ো হতে শুরু করেন। নেতা-কর্মীদের অনেকেই বাসে করে এসেছিলেন।

বেলা সাড়ে তিনটার দিকে এনসিপির জ্যেষ্ঠ নেতারা শাহবাগের সমাবেশস্থলে আসতে শুরু করেন। দলের সদস্যসচিব আখতার হোসেন, যুগ্ম আহ্বায়ক আবদু্ল্লাহ আল আমিন, সারোয়ার তুষার ও মনিরা শারমিন প্রথমে সমাবেশস্থলে উপস্থিত হন। পরে খণ্ড খণ্ড মিছিল নিয়ে নেতা-কর্মীরা আসতে থাকেন। বিকেল পৌনে চারটার পর বাংলামোটর থেকে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর নেতৃত্বে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ এনসিপির এবং বিকেল সোয়া চারটার দিকে আসিফ মাহমুদের নেতৃত্বে ঢাকা মহানগর উত্তর এনসিপির দুটি বড় মিছিল সমাবেশস্থলে প্রবেশ করে।

বিকেল ৪টা ১০ মিনিটে পবিত্র কোরআন থেকে তিলাওয়াতের মধ্য দিয়ে সমাবেশের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। এরপর বাজানো হয় জাতীয় সংগীত। পরে এনসিপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা বক্তব্য দেন। এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্যসচিব সারজিস আলম, সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ, আবদুল্লাহ আল আমিন, আতিক মোজাহিদ, আবদুল হান্নান মাসউদ ও নুসরাত তাবাসসুম সমাবেশে উপস্থিত থাকলেও বক্তব্য দেননি।