জাতির মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টির অপচেষ্টা মোকাবিলাই এখন মূল চ্যালেঞ্জ: সালাহউদ্দিন আহমদ
জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজনে খুব বেশি চ্যালেঞ্জ দেখছেন না বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ। এর পরিবর্তে বিভিন্ন কায়দা-কানুনের মধ্য দিয়ে নির্বাচন বিলম্বিত করার চেষ্টা, আলোচনা এবং রাস্তায় একই ইস্যুতে আন্দোলন করে জাতির মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা অথবা পিআর (সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব) পদ্ধতির বিষয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করে একটি অস্থিতিশীল সরকারব্যবস্থার দিকে নিয়ে যাওয়ার যে চেষ্টা, সেগুলোকে মোকাবিলাই মূল চ্যালেঞ্জ মনে করেন তিনি।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, এখনো কেউ কেউ আগে গণভোট (জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন প্রসঙ্গে) ও সাংবিধানিক আদেশের কথা বলছে। এগুলো পরিহার করা উচিত। এগুলোই মূল চ্যালেঞ্জ, নির্বাচন চ্যালেঞ্জ নয়।
আজ সোমবার দুপুরে জাতীয় প্রেসক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে এক আলোচনা সভায় বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন আহমদ এ কথা বলেন। আগামী নির্বাচন গুণমানসম্পন্ন ও সবার জন্য গ্রহণযোগ্য করার চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা শীর্ষক এই আলোচনা সভার আয়োজন করে নাগরিক যুব ঐক্য।
সংবিধান বা অন্যান্য জাতীয় ইস্যুতে গণভোট করা যাবে না, এমন কোনো বিধান নেই উল্লেখ করে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সরকার অধ্যাদেশ জারি করে অথবা আরপিওতে সংশোধনী এনে গণভোট পরিচালনা করার জন্য নির্বাচন কমিশনকে ক্ষমতা দিতে পারে। নির্বাচন কমিশন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন এই গণভোট করতে পারে। এতে একই আয়োজন, একই অর্থ ব্যয়, একই লজিস্টিকস, একবার ভোট সেন্টারে যাওয়ার সুবিধা পাওয়া যাবে।
জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের জন্য জনগণের সম্মতি নিতে পৃথকভাবে গণভোটের আয়োজনের অসুবিধা হলো আরেকটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতো বিশাল আয়োজনের জন্য দেশকে প্রস্তুত করতে হবে। নির্বাচনকে বিলম্বিত করা এর একটি উদ্দেশ্য হতে পারে।
একই দিনে দুটি ব্যালট দিলে জনগণ বিভ্রান্ত হতে পারে বলে যে ধারণা, সেটির সমালোচনা করেন সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, এখনই দেশের মানুষ স্থানীয় সরকার, উপজেলা ও সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দুই-তিনটি ব্যালটে ভোট দিতে অভ্যস্ত।
পুলিশের মনোবল আগের অবস্থায় না আসায় তাদের মাধ্যমে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব কি না, সেটি নিয়ে এখনো জনমনে প্রশ্ন রয়েছে বলে মন্তব্য করেন সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, তাদের সহায়তার জন্য এক লাখ সেনাসদস্য কাজ করবেন। আনসারসহ সহযোগী বাহিনীগুলোকেও এ বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। তবে জনগণ এবার সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য এত বেশি উদ্গ্রীব হয়ে আছে, তারাই মূল ভূমিকা পালন করবে। মূলত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা হবে গৌণ। এখানে কেউ অনিয়ম করার চেষ্টা করলে জনগণই সে বিষয়টি দেখবে।
রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ না থাকলে পোলিং ও প্রিসাইডিং কর্মকর্তার পক্ষপাতিত্ব করার সুযোগ নেই বলেও উল্লেখ করেন বিএনপির এই নেতা।
রাজনৈতিক জোট গঠনের বিষয়ে তিনি বলেন, রাজনৈতিক জোট হোক বা না হোক, নির্বাচনে যখন দলগুলো অংশগ্রহণ করবে, সেটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বাংলাদেশে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন যাতে না হতে পারে, সে জন্য পতিত ফ্যাসিবাদী গোষ্ঠী চেষ্টা করছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত তারা কিছু ঝটিকা মিছিল ছাড়া তেমন সফলতা অর্জন করতে পারেনি। ফ্যাসিবাদবিরোধী জাতীয় ঐক্য শক্তিশালী ও সমুন্নত রাখলে ভবিষ্যতে ফ্যাসিবাদী শক্তির কোনো উৎপাত এবং উৎপত্তি হবে না।
ফ্যাসিস্ট গোষ্ঠীর রাজনৈতিক দল হিসেবে বিচারিক ব্যবস্থা ত্বরান্বিত করতে তিনি সব রাজনৈতিক দলগুলোকে উদ্যোগ নেওয়ার অনুরোধ জানান।
নির্বাহী আদেশের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করার প্রথা ভবিষ্যতের জন্য ভয়ংকর হবে উল্লেখ করে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, নির্বাহী আদেশে জামায়াতের রাজনীতি নিষিদ্ধের বিষয়ে বিএনপি প্রতিবাদ জানিয়েছিল। যারা এখনো নির্বাহী আদেশে রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধের দাবির পক্ষে, বিএনপি এর প্রতিবাদ জানাচ্ছে। বিএনপি এই চর্চা কখনো মেনে নেবে না।
আলোচনা সভায় নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো সংস্কার বিষয়ে প্রায় ঐকমত্যে পৌঁছে গেছে। ফলে নির্বাচন নিয়ে কালো মেঘ কেটে গেছে। নির্বাচন হবে কি না, সেই প্রশ্ন করার মতো পরিবেশ এখন নেই। দেশে নির্বাচন হবে। দেশে ভোট নিয়ে গোলযোগ হলে যেকোনো কিছু ঘটতে পারে। ভোট না হলে নিরাপত্তা শঙ্কা বাড়বে এবং এতে সব দলই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক হাসনাত কাইয়ূম বলেন, আগামী নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তিনটি রাজনৈতিক জোট হতে পারে। একটি জোটে বিএনপিসহ কয়েকটি দল, একটি জোটে জামায়াতসহ ধর্মভিত্তিক কয়েকটি দল আর অন্য জোটে গণতন্ত্র মঞ্চসহ কয়েকটি দল থাকতে পারে। তিনটি জোট হলেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা ভারসাম্যপূর্ণ হবে। আবার তিনটির বদলে দুটি জোটও হতে পারে। সে ক্ষেত্রে প্রতিদ্বন্দ্বিতা বেড়ে যাবে।
এই মুহূর্তে বিশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের মতো মানসিক শক্তি পুলিশের নেই উল্লেখ করে এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, এবারের আন্দোলনে কিশোর-তরুণদের একটা ভূমিকা ছিল। সম্ভব হলে এই তরুণদের মধ্যে যারা ভোটার হয়নি, তাদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নির্বাচন কেন্দ্রে পুলিশের সঙ্গে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে দেওয়া যেতে পারে।
এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব বলেন, ‘২০২৪ সালের নির্বাচনের আগে রাজনীতিবিদদের বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা থেকে ফোন করে, উঠিয়ে নিয়ে, নজরবন্দী করে নির্বাচনে যেতে বাধ্য করা হয়েছিল। ওই সময় যারা এ কাজগুলো করত তাদের চেহারা এখনো বদলায়নি। উচ্চপদস্থ কয়েকজনের হয়তো রদবদল হয়েছে। তাই অভ্যুত্থানের আগের ও পরের বাংলাদেশে যেই সিস্টেম রয়ে গেছে, একই সিস্টেমে আবারও একটি জাতীয় নির্বাচন করতে যাওয়া মানে কারা সরকারি দল হবে, কারা বিরোধী দল হবে, কে সংসদ সদস্য হবে আর কে হতে পারবে না, সেই একই পদ্ধতিতে নির্ধারণ হবে।’
আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন নাগরিক যুব ঐক্যের প্রধান সমন্বয়কারী মাহফুজুল ইসলাম খান, সঞ্চালনা করেন যুব ঐক্যের সমন্বয়কারী ফারুক হোসেন খান। সভায় আরও বক্তব্য দেন ভাসানী জনশক্তি পার্টির চেয়ারম্যান শেখ রফিকুল ইসলাম বাবলু, জেএসডির জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি তানিয়া রব, নাগরিক ঐক্যের সাধারণ সম্পাদক শহীদুল্লাহ কায়সার, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক, গণ অধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খান প্রমুখ।