শুক্রবার সকাল। ঢাকার আকাশ তখনো পুরোপুরি উজ্জ্বল হয়নি। আরামবাগ থেকে সাড়ে আটটার দিকে বাস ছাড়ে। গন্তব্য সাগরকন্যা কুয়াকাটা—দক্ষিণের শেষ প্রান্ত। সামনে দীর্ঘ পথ—এক্সপ্রেসওয়ে, পদ্মা সেতু, ফরিদপুরের ভাঙ্গা, মাদারীপুর, বরিশাল হয়ে পটুয়াখালী।
জানালার কাচে ভেসে যায় শহরের শেষ দৃশ্য। ঢাকার কোলাহল পেছনে পড়ে গেলে সামনে খুলে যায় এক অন্য বাংলাদেশ—নদী, মাঠ, বাজার আর নির্বাচনের ছায়ায় থাকা মানুষের মুখ।
পোস্তগোলা পেরিয়ে কেরানীগঞ্জ হয়ে এক্সপ্রেসওয়ে ধরে এগোতে থাকে গাড়ি। হাইওয়ের দুই পাশে দেখা যাচ্ছে বিভিন্ন প্রার্থীর নির্বাচনী ব্যানার–ফেস্টুন। তবে সেই সংখ্যা খুবই কম। নির্বাচন মানেই পোস্টার দিয়ে ছেয়ে ফেলার যে অতীত স্মৃতি, তা এবার অনেকটাই মুছে দিয়েছে আচরণবিধি।
পদ্মা সেতু পার হয়ে ফরিদপুরের ভাঙ্গা পেরিয়ে মাদারীপুরে ঢুকতেই মোস্তফাপুর গোলচত্বরে চোখে পড়ে বিভিন্ন প্রার্থীর সাদা–কালো ব্যানার। সেখানে যেমন মাদারীপুর–২ (রাজৈর–সদর) আসনে বিএনপির প্রার্থী জাহান্দার আলি মিয়ার ধানের শীষ প্রতীকের প্রচারণা দেখা গেল, পাশেই জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলের প্রার্থী বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের নেতা মুফতি আব্দুস সোবহানের রিকশা মার্কার ব্যানারও ছিল। মাওলানা মামুনুল হকের নেতৃত্বাধীন দলটির উপস্থিতি সীমিত হলেও জানান দিচ্ছে—এই এলাকাতেও ভোটের সমীকরণ পুরোপুরি একরঙা নয়।
আবার মাদারীপুর–৩ আসনে ধানের শীষের প্রার্থী আনিসুর রহমান তালুকদার খোকন এবং একই আসনের ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী মাওলানা এস এম আজিজুল হকের ব্যানারও দেখা গেল একই চত্বরে। মাদারীপুরের কালকিনির ভুরঘাটা এলাকায়ও চোখে পড়ে ইসলামী আন্দোলনের বেশ কিছু বিলবোর্ড। বরিশালের চরমোনাই মাদ্রাসা ঘিরে দক্ষিণাঞ্চলে ইসলামী আন্দোলনের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি নতুন কিছু নয়। হাতপাখার প্রচারণায়ও রয়েছে তার প্রতিফলন।
বাসের ভেতরে ভোটের আলোচনা
বাসের ভেতরেই নির্বাচন ঢুকে পড়ে কথোপকথনে। পাশের সিটে বসা মধ্যবয়সী এক ভদ্রলোক বারবার ফোনে কথা বলছিলেন। অন্য প্রান্তে থাকা ব্যক্তিকে জিজ্ঞেস করছেন—এলাকায় কে কী করছে, কার পোস্টার উঠছে? তিনি নামলেন বরিশালের বাকেরগঞ্জে।
নামার আগে কথার ফাঁকে বলেন, ‘মেইন রোডে (প্রধান সড়কে) কম দেখা গেলেও এলাকায় অনেক ব্যানার দেওয়া হয়েছে। কিন্তু চিন্তার বিষয় হলো মানুষ কি ভোট দিতে যাবে? ভোট না দিতে দিতে মানুষ ভোটের মজাই হারিয়ে ফেলেছে।’
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের আলাপে এভাবেই এসে পড়ে আওয়ামী লীগ আমলের তিনটি নির্বাচন, যার সবগুলোই ছিল বিতর্কিত ও প্রশ্নবিদ্ধ।
হরেক রকম প্রচার
মাদারীপুরের কালকিনি পেরিয়ে বরিশালের গৌরনদীতে ঢুকতেই দৃশ্যপটে শক্তভাবে যুক্ত হয় বিএনপির ধানের শীষের প্রচারণা। বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ও বরিশাল-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য জহির উদ্দিন স্বপন এখানে দলটির প্রার্থী। রাস্তার দুই পাশেই তাঁর ব্যাপক প্রচারণার ব্যানার দেখা যায়। তাঁর প্রচারে কিছুটা ভিন্নতাও দেখা যায়। ফেস্টুনে ধানের শীষের পক্ষে ভোট চাওয়ার পাশাপাশি ক্ষমতায় গেলে বিভিন্ন ধরনের পরিবর্তন ও উন্নয়নের প্রতিশ্রুতির বার্তাও রয়েছে।
এই এলাকায় জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মো. কামরুল ইসলাম খানের দাঁড়িপাল্লার ব্যানারও চোখে পড়ে। এই আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে ভোটের লড়াইয়ে রয়েছেন বিএনপির আবদুস সোবহান, ফুটবল প্রতীকে। এখানে ভোটের লড়াই কার কার মধ্যে—তা প্রচারণা দেখলেই অনেকটা স্পষ্ট হওয়া যায়।
গৌরনদী পেরিয়ে বাস ঢোকে বরিশালের উজিরপুরে। বামরাইল বাজার এলাকায় এসে হঠাৎ ধানের শীষের ব্যানারের ঘনত্ব বেড়ে যায়। বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও বরিশাল-২ (বানারীপাড়া-উজিরপুর) আসনে ধানের শীষের প্রার্থী শরফুদ্দিন আহমেদ সেন্টুর ব্যাপক প্রচারণা চোখে পড়ে।
গণভোটের প্রচারণা
বরিশালের বাবুগঞ্জে ঢুকতেই দৃশ্যপটে আসে নতুন প্রতীক। এখানে বরিশাল–৩ (মুলাদী–বাবুগঞ্জ) আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীনের ধানের শীষের ব্যানারের পাশাপাশি দেখা যায় ১১ দলের সমর্থিত প্রার্থী এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান ভুইয়ার (ব্যারিস্টার ফুয়াদ) ঈগল মার্কার প্রচারণা।
বরিশাল ক্যাডেট কলেজের পাশে একটি ব্যানার আলাদা করে নজর কাড়ে। সেখানে প্রার্থীর নামের পাশাপাশি লেখা গণভোটে ‘হ্যাঁ’–এর পক্ষে প্রচারণা ছিল। ব্যানারটি আসাদুজ্জামান ফুয়াদের। সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে সমান্তরালভাবে চলতে থাকা গণভোটও যে প্রাসঙ্গিক, তা কিছু বোঝা গেল এমন আরও কয়েকটি ফেস্টুনে।
ঢাকা থেকে যাত্রাপথে প্রথমবারের মতো লাঙ্গল প্রতীকের ব্যানার দেখা গেল বাবুগঞ্জের রহমতপুরে। তা জাতীয় পার্টির সাবেক সংসদ সদস্য গোলাম কিবরিয়া টিপুর, বরিশাল-৩ আসনে প্রার্থী হয়েছেন তিনি। ২০০৯, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনে মহাজোটের সমর্থনে বরিশাল-৩ আসনে জয়ী হন তিনি। ফলে তিনি এই আসনে ভোটের সমীকরণ বদলে দিতে পারেন বলে ধরে নেওয়া যায়।
বরিশালে নারী প্রার্থীর প্রচারণা
বরিশাল নগরের দিকে এগোতে এগোতে বাস ঢোকে নথুল্লাবাদে। এখানেই প্রথম চোখে পড়ে একজন নারী প্রার্থীর প্রচারণা। তিনি মনীষা চক্রবর্তী, বরিশাল–৫ আসনে বাসদের মই প্রতীকের প্রার্থী। তাঁর ব্যানার ঝুলছিল সড়কের পাশে। পুরুষপ্রধান নির্বাচনী মাঠে এই দৃশ্য অনেকেরই চোখে পড়বে।
এই আসনে বিএনপির প্রার্থী মো. মজিবর রহমান সরোয়ার সাবেক সংসদ সদস্য। আসনটিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আছেন ইসলামী আন্দোলনের জ্যেষ্ঠ নায়েবে আমির মুফতি সৈয়দ মো. ফয়জুল করিম। শুরুর দিকে তাঁর প্রচারণার ব্যানারে কোথাও হাতপাখা প্রতীকের পাশে ব্যক্তির ছবি দেখা যায়নি। বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে দিয়ে বাকেরগঞ্জের দিকে এগোতেই আবার চোখে পড়ে হাতপাখার ব্যানার, সেখানে আবার প্রার্থীর ছবি রয়েছে।
নামাজ শেষেও ভোটের আলাপ
বরিশাল–পটুয়াখালী মহাসড়কের বরিশাল অংশে দুধল–মৌ গাজী বাড়ি জামে মসজিদের সামনে বাস থামে কিছুক্ষণের জন্য, জুমার নামাজের বিরতি। যাত্রীরা নেমে দাঁড়ান—কেউ অজু করেন, কেউ চায়ের দোকান খুঁজে নেন। কেউ এই সুযোগে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে যান।
এই বিরতিতেও রাজনীতির কথা থামে না। ছোট ছোট দলে মানুষ আলোচনা করেন—ভোট হবে কি না, কেন্দ্র নিরাপদ থাকবে কি না।
নামাজ শেষে বাস চলতে শুরু করে। পায়রা সেতু পেরিয়ে দেখা যায় গণভোটের বার্তা। লেবুখালী পায়রা সেতু পার হতেই টোল প্লাজার বুথের সামনে চোখে পড়ে বড় ব্যানার ‘দেশের চাবি আপনার হাতে’। সেখানে ছিল গণভোটের পক্ষে প্রচারণা। সরকারিভাবেই সেটি টাঙানো হয়েছে।
অবশেষে কুয়াকাটায়
পটুয়াখালী চৌরাস্তায় মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতিস্তম্ভ ঘিরেও দেখা যায় বিভিন্ন দলের প্রচারণার ব্যানার। কিছুটা সামনে এগোতেই দেখা যায় পটুয়াখালী–৪ (কলাপাড়া-রাঙ্গাবালী) আসনের প্রার্থীদের প্রচারণা। তবে কুয়াকাটার পথ যত এগোয়, তত কমে ব্যানার। কিন্তু মানুষের ভেতরের প্রশ্ন কমে না। কুয়াকাটায় পৌঁছালে নানা শ্রেণি–পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বললে উঠে আসে নানা সংশয়ের কথাও।
বরিশাল বিভাগের সাগরপাড়ের এই শহরের মানুষের মধ্যে এখনো কিছু সংশয় আছে, ভীতি আছে। উত্তেজনার চেয়ে হিসাব–কিতাবই বেশি। ভোট এখানে কেবলই আনন্দ নয়, বরং একধরনের পরীক্ষা। সমুদ্র সামনে থাকলেও মানুষের মনে প্রশ্নের ঢেউ– ‘এবার কি সত্যিই কিছু বদলাবে?’
বাসস্ট্যান্ড থেকে হোটেলে পৌঁছে দেওয়া অটোরিকশাচালক মো. নাসিরের কণ্ঠেও সেই সংশয়ী সুর। বর্ষায় সাগরে মাছ ধরতে যাওয়া নাসির পর্যটনের মৌসুমে চালান অটোরিকশা। তিনি বলছিলেন, ‘ভোট যদি দিতে পারি, চুপচাপ গিয়ে দিয়ে আসব। ভোট নিয়ে এর চেয়ে বেশি কথা না বলাই ভালো। যদি ভালো কিছু হয়, ভালো। তা না হলে আমাদের জীবন তো যেভাবে চলছিল, সেভাবেই চলবে।’