জামায়াতের কোনো অভিযোগ আছে কি না, প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্ক কেমন হবে—জানতে চায় ইইউ
জামায়াতে ইসলামীসহ ১১ দলের নির্বাচনী আসন সমঝোতার বিষয়টি আগামীকাল মঙ্গলবার ঘোষণা হতে পারে বলে জানিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান। তিনি বলেছেন, আগামীকালের মধ্যে আসন সমঝোতা চূড়ান্ত হতে পারে। না হয় পরশু। সব দল একসঙ্গে গণমাধ্যমের সামনে আসবে বলেও জানান জামায়াতের আমির।
আজ সোমবার দুপুরে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশনের প্রধান পর্যবেক্ষক ও ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্য ইভার্স ইজাবসের নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠক করেন জামায়াতের আমির। রাজধানীর বসুন্ধরায় জামায়াত আমিরের কার্যালয়ে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এ কথা বলেন তিনি।
জামায়াত আমির বলেন, বৈঠকে ইইউ প্রতিনিধিদলের পক্ষ থেকে সব দলের জন্য সমান সুযোগ আছে কি না, কোনো সুনির্দিষ্ট চ্যালেঞ্জ ও অভিযোগ আছে কি না, তা জামায়াতের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছে। জামায়াত অভিযোগ আছে বলে জানালেও এখনই সেগুলো প্রকাশ করবে না বলে তাদের জানিয়েছে। আগে নির্বাচন কমিশন এবং অন্তর্বর্তী সরকারকে অভিযোগ ও চ্যালেঞ্জের বিষয়ে জানাতে চায় জামায়াত। এরপরও সমাধান না পেলে জামায়াত জনগণকে এসব বিষয়ে জানাবে।
জামায়াতে ইসলামী সরকার গঠন করলে প্রতিবেশীসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক কেমন হবে, তা ইইউ প্রতিনিধিদল জানতে চেয়েছে বলে জানান শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, জামায়াতের সঙ্গে বিশ্বের সভ্য, শান্তিকামী ও গণতান্ত্রিক সব রাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় থাকবে বলে তাঁদের জানানো হয়েছে। প্রতিবেশীদের সঙ্গে প্রতিবেশীসুলভ সম্পর্ক থাকবে বলেও জানানো হয়েছে। প্রতিবেশীরাও প্রতিবেশীর মতো আচরণ করবে, এমন আশা করে জামায়াত। তবে সেই আচরণ হতে হবে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সমতার ভিত্তিতে। নির্দিষ্ট কোনো রাষ্ট্রের দিকে না ঝুঁকে সারা বিশ্বের সঙ্গে বন্ধুত্ব ও সমন্বয় রক্ষা করে বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে চায় জামায়াত।
নারীদের নিরাপত্তার বিষয়টি জামায়াত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে উল্লেখ করে দলটির আমির বলেন, তাঁরা বিশ্বাস করেন, মা-বোনেরা এবার জামায়াতকে বেছে নেবেন। এর লক্ষণ ইতোমধ্যে দেখা যাচ্ছে। কিন্তু জামায়াতের নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণায় অংশ নেওয়া নারীদের বাধা দেওয়া হচ্ছে। এমনকি হিজাব খুলে নেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। তাঁদের তাড়িয়ে দেওয়ার, ঠেকিয়ে দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। রাজনৈতিক দলের কাজ হচ্ছে সব শ্রেণি-পেশার, বয়সের, লিঙ্গের মানুষকে সম্মান দেখানো। শুধু রাজনৈতিক কারণে কাউকে অপমান করার অধিকার কারও নেই।
শফিকুর রহমান বলেন, আশা করা যায়, আগামী নির্বাচনে বাংলাদেশের জনগণ সঠিক সিদ্ধান্ত নেবে। জামায়াত অর্পিত আমানতের বোঝা সঠিকভাবে বহন করার চেষ্টা করবে। জনগণ যদি অন্য কাউকে পছন্দ করে, জামায়াত দেশবাসীর প্রতি কৃতজ্ঞ থাকবে। অন্যরা যদি বিরোধী দলে যায়, তাদের কাছ থেকেও একই বিষয় প্রত্যাশা করে জামায়াত। এটা স্থিতিশীলতার জন্য জরুরি। নির্বাচন হয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে স্থিতিশীলতার প্রক্রিয়ায় কোনো পক্ষ বা রাজনৈতিক দল হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। বিচার বিভাগ স্বাধীনতা ভোগ করবে। তবে বিচার বিভাগেরও জবাবদিহি, দায়বদ্ধতার জায়গা থাকবে। সেটিও নিশ্চিত করা হবে, যাতে সেখানে একটি ভারসাম্য নিশ্চিত করা যায়।
গত ৫৪ বছরের রাজনীতি দেখে জনগণ হতাশ উল্লেখ করে জামায়াতের আমির বলেন, এই রাজনীতি আর মানুষ দেখতে চায় না, তারা পরিবর্তন চায়। সেই পরিবর্তনের জন্য মাসের পর মাস ঐকমত্য কমিশন বৈঠক করেছে। যারা সংসদ নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে, অধিকাংশ রাজনৈতিক দলই সেসব বৈঠকে অংশ নিয়েছে। এসব বৈঠক থেকে উঠে আসা পরামর্শকে ধারণ ও গ্রহণ করতে হবে। ক্ষমতায় গেলে এসব বাস্তবায়ন করার প্রতিশ্রুতি দিতে হবে দলগুলোকে। সংস্কার বাস্তবায়ন, ন্যায়বিচার নিশ্চিত এবং দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান যদি নিশ্চিত হয়, তাহলে সব ধরনের সহায়তা করতে জামায়াত প্রস্তুত।
দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে জামায়াত আমির বলেন, আগামী নির্বাচন সুন্দরভাবে করতে দেশবাসী যাতে সহযোগিতা করেন। জামায়াত সংস্কারের পক্ষে, তাই জামায়াত ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে। জামায়াত মনে করে, দেশবাসীও সংস্কার চান। রাজনৈতিক অবস্থান যা–ই হোক, দেশের স্বার্থে গণভোটে যেন সবাই ‘হ্যাঁ’ ভোট দেন।
‘এবারের নির্বাচন হাতছাড়া হলে জাতিকে মূল্য দিতে হবে’
জামায়াত আমিরের বক্তব্য শেষ হলে তাঁকে এক সাংবাদিক প্রশ্ন করেন, নির্বাচনী পরিবেশ সৃষ্টি হয়নি বলে শেষ মুহূর্তে জামায়াত নির্বাচন বয়কট করতে পারে কি না। জবাবে শফিকুর রহমান বলেন, দেশের প্রতিটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনে জামায়াত অংশ নিয়েছে। তবে ‘মিডনাইট ইলেকশন’ নামে পরিচিত ২০১৮ সালের নির্বাচন জামায়াত বয়কট (বর্জন) করেছে। এবার সে রকম পরিবেশ সৃষ্টি হবে না বলে মনে করে জামায়াত। হতে দেওয়া উচিতও হবে না। এবার সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হবে, এটা যেকোনো মূল্যে নিশ্চিত করতে হবে। এবারের নির্বাচনও যদি হাতছাড়া হয়ে যায়, এ জাতিকে কতটা মূল্য দিতে হবে সেটি জানা নেই।
আরেক সাংবাদিক প্রশ্ন করেন, বর্তমান প্রশাসনের অনেকেই আওয়ামী লীগের দোসর হিসেবে কাজ করেছেন বলে শোনা যায়। এই প্রশাসন দিয়ে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব কি না। জবাবে জামায়াতের আমির বলেন, ‘আমরা মনে করি, তাঁরা বদলাবেন। অন্যথায় তাঁদের বদলাতে বাধ্য করা হবে।’
গণমাধ্যম একটি পক্ষের দিকে ঝুঁকে পড়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, দেশের দ্বিতীয় জনপ্রিয় দলের প্রধান হিসেবে এ বিষয়ে কী বলবেন—এ প্রশ্নের জবাবে জামায়াতের আমির বলেন, ‘আমরা নিজেদের সেকেন্ডও মনে করি না, ফার্স্টও মনে করি না। আমরা ব্যাপারটা জনগণের হাতে তুলে দিতে চাই, জনগণ ডিসাইড করবে (সিদ্ধান্ত নেবে) কে ফার্স্ট, কে সেকেন্ড...কতিপয় গণমাধ্যম, মূলধারার গণমাধ্যম তাদের দেখা যাচ্ছে, তাদের রোল (ভূমিকা) কোনো একটা নির্দিষ্ট দলের পক্ষে ঝুঁকে যাচ্ছে। ওই ঝোঁকাতে এখন বাংলাদেশে বড় কিছু হয় না, এটা ঠিক। কিন্তু আমরা তাদের কাছে এটা এক্সপেক্ট (প্রত্যাশা) করি না, এটাও ঠিক। গণমাধ্যমের পজিশন...গণমাধ্যম এটা দলীয় মাধ্যম নয়, এটা মাথায় রেখে গণমাধ্যম ফাংশন করুক, সেটাই আমরা প্রত্যাশা করি। সব গণমাধ্যমের কাছে এটা আমাদের প্রত্যাশা।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনে কোনো কোনো গণমাধ্যমের পক্ষপাতমূলক প্রকাশ্য আচরণ ছিল বলে অভিযোগ করেন শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, জামায়াত জনগণকে যথেষ্ট সচেতন ও সতর্ক মনে করে। কিছু বললেই জনগণ সেটা গ্রহণ করে ফেলবে, এটা বিশ্বাস করা যায় না। মর্যাদার জায়গা গণমাধ্যমকেই সংরক্ষণ করতে হবে। জামায়াত গণমাধ্যমের কাছে ইনসাফ চায়। গণমাধ্যম যেন সাদাকে সাদা এবং কালোকে কালো বলে। গণমাধ্যম সমালোচনা করবে, তবে সেটি যেন সত্যনির্ভর হয়।
ইইউ এবারের নির্বাচনে কোনো প্রতিনিধিদল পাঠাবে কি না জানতে চাইলে জামায়াত আমির বলেন, এবার তারা ২০০ প্রতিনিধি পাঠাবে। তারা সব জেলা ও সিটি করপোরেশন এলাকার তথ্য সংগ্রহ করবে।
এর আগে ইইউ প্রতিনিধিদলের বৈঠকে জামায়াত আমিরের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন দলটির প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, শিক্ষাবিদ যুবায়ের আহমেদ, জামায়াত আমিরের পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা মাহমুদুল হাসান প্রমুখ।