‘সিসি ক্যামেরায় দেখেছি, কারা গুলি করেছে ছেলেকে; কিন্তু কারও বিচার হচ্ছে না’

‘২০২৪-এর রক্তিম বর্ষার সন্তান হারানো মায়েদের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি’ শীর্ষক এই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে ছিলেন জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে প্রাণ হারানো শহীদদের মায়েরা। শিল্পকলা একাডেমি, ঢাকা; ২ আগস্ট ২০২৬ছবি: খালেদ সরকার

‘আমি সিসি (ক্লোজ সার্কিট টিভি ক্যামেরা) ক্যামেরায় দেখেছি, কারা গুলি করেছে আমার ছেলেকে, আমার সন্তানকে মারধর কারা করেছে, টেনে নিয়ে যাচ্ছে কারা। আমি সবাইকে চিনি। কিন্তু কারও বিচার হচ্ছে না। আমি সরকারকে বলতে চাই, আমার সন্তানসহ সব সন্তান হত্যার বিচার নিশ্চিত করুন।’

কথাগুলো বলছিলেন জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে শহীদ ইমাম হাসান ভূঁইয়া তাইমের মা পারভীন আক্তার। আজ রোববার রাজধানীর শিল্পকলা একাডেমির নাট্যমঞ্চে জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশন আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এ কথা বলেন তিনি।

‘২০২৪-এর রক্তিম বর্ষার সন্তান হারানো মায়েদের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি’ শীর্ষক এই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে ছিলেন জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে শহীদদের মায়েরা। বিশেষ অতিথি করা হয় জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের শহীদ পরিবারের সদস্য ও আহত জুলাই যোদ্ধাদের।

অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ করে আরেক শহীদ মেহেরুন্নেসা তানহার মা আছমা আক্তার বলেন, জুলাই সনদের বাস্তবায়ন, জুলাই শহীদ হত্যার বিচার এবং আহত ব্যক্তিদের দেখভালের দায়িত্ব সরকার যদি পালন না করে, এই কষ্ট সব সময় তাদের বয়ে বেড়াতে হবে।

শহীদ মেহেদী হাসানের মা পারভীন আক্তার বলেন, ‘আমার ছেলের কোনো দোষ ছিল না। অথচ তাকে তিনটি গুলি করে পুলিশ। আমরা সন্তান হারিয়েছি আজ দুই বছর পার হলেও এখনো কোনো বিচার পাইনি। বিচার যে পাব, সেটার কোনো নিশ্চয়তাও পাচ্ছি না।’ সরকার যাতে দ্রুত জুলাই হত্যার বিচার নিশ্চিত করে, সে দাবি জানান তিনি।

অনুষ্ঠানে আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান ফুয়াদ বলেন, অনেকে চেষ্টা করছে চব্বিশকে ভুলিয়ে দিতে। কারও নাম উল্লেখ না করে তিনি বলেন, ‘আপনারা মনে রাখবেন, আপনারা সেটা পারবেন না। কারণ, চব্বিশে কী ঘটে গেছে, সেটা এই দেশে যাঁরা ছিলেন, একমাত্র তাঁরাই উপলব্ধি করতে পারবেন।’

জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সংসদ সদস্য নুসরাত তাবাসসুম শহীদ জননীদের উদ্দেশে বলেন, ‘আমাদেরকে আপনারা আপনাদের সন্তান হিসেবে গ্রহণ করুন। কারণ, আপনাদের সন্তানেরা প্রাণ দিয়েছে বলেই আমরা নতুন এক বাংলাদেশ দেখতে পেয়েছি।’

অনুষ্ঠানে আলোকচিত্রী শহিদুল আলম বলেন, ‘নতুন বাংলাদেশ অর্জনে যাঁরা জীবন দিয়েছিলেন, তাঁদের সেই রক্তের দাম আমরা এখনো দিতে পারিনি। জুলাইয়ের শহীদের সেই স্বপ্নের বাংলাদেশ যদি আমরা গড়তে না পারি, সেটা হবে শহীদদের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা।’

শহিদুল আলম আরও বলেন, ‘দুই বছর পার হতেই জুলাই শহীদদের ভুলতে বসেছি। ক্ষমতা চায়, আমরা তাঁদের ভুলে যাই। ক্ষমতা চায়, সবকিছু আগের মতো চলুক, আগের মতো সব থাকুক।’

অনুষ্ঠানে কণ্ঠশিল্পী আসিফ আকবরের উপস্থিতিতে জুলাই গণ–অভ্যুত্থানভিত্তিক দেশাত্মবোধক একটি গানের অডিও-ভিজ্যুয়াল প্রকাশ করা হয়। গানটি গেয়েছেন আসিফ আকবর। এই গান থেকে আগামী ৬০ বছরে যে অর্থ আয় হবে, সেটা জুলাই ফাউন্ডেশনকে দান করার কথা জানান তিনি।

আসিফ আকবর বলেন, জুলাই ফাউন্ডেশনকে বাঁচিয়ে রাখা সরকারের নৈতিক দায়িত্ব। কারণ, এই ফাউন্ডেশন কাজ করে জুলাইয়ে প্রাণ হারানো মানুষের পরিবারদের নিয়ে, আহতদের নিয়ে। তিনি ঘোষণা দেন, একজন শিল্পীর জায়গা থেকে ফাউন্ডেশনকে সব ধরনের সহযোগিতার ক্ষেত্রে তিনি আপ্রাণ চেষ্টা করবেন সব সময়।

জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) কামাল আকবরের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন জুলাইয়ের শহীদ সাংবাদিক তাহির জামান প্রিয়র মা সামসি আরা জামান। তিনি এই ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদক। অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন শহীদ রমিজ উদ্দিন আহমেদের মা রাবেয়া সুলতানা, শহীদ গোলাম নাফিজের মা নাজমা আক্তার প্রমুখ।