চিকিৎসক জাহিদের দায়িত্ব পড়ল নারী, শিশু ও সমাজকল্যাণের

অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন। গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় সংসদ ভবনে সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার জন্য ঢোকার পথেছবি: জাহিদ হোসেন

অধ্যাপক ডা. আবু জাফর মো. জাহিদ হোসেনের মন্ত্রিত্ব নিশ্চিত ছিল। বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির এই সদস্য কোন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পাচ্ছেন, তা নিয়ে কিছু জল্পনা-কল্পনা ছিল। শেষে দেখা গেল, তাঁকে দুটি মন্ত্রণালয় সামলাতে হবে। একটি নারী ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়, অন্যটি সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়।

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জয়ী হয়ে গতকাল মঙ্গলবার বিএনপি নতুন সরকার গঠন করে। দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমান তাঁর সরকারের মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের নিয়ে শপথ নেন।

৬৫ বছর বয়সী জাহিদ হোসেন এবারের নির্বাচনে দিনাজপুর-৬ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। এই প্রথম ভোটের লড়াইয়ে নামেন তিনি, প্রথমবার নির্বাচিত হয়েই মন্ত্রী হলেন।

জাহিদ হোসেনের পৈতৃক বাড়ি দিনাজপুর জেলার নবাবগঞ্জ উপজেলার পুটিমারা ইউনিয়নের মতিহারা গ্রামে। তাঁর বাবার নাম মো. জাফর আলী সরকার ও মায়ের নাম বেগম জেবুন নেছা। ১৯৬০ সালের ২৫ ডিসেম্বর তিনি ময়মনসিংহ জেলার গফরগাঁওয়ে নানার বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন।

ময়মনসিংহের কাওরাইদ কে এন হাইস্কুল থেকে মাধ্যমিক ও আনন্দ মোহন কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন তিনি। এরপর ১৯৮৩ সালে তিনি ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করেন। ১৯৯৭ সালে বাংলাদেশ কলেজ অব ফিজিশিয়ানস অ্যান্ড সার্জনস (বিসিপিএস) থেকে এফসিপিএস, ২০০০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইউরোলজিতে এমএস, ২০০৪ সালে পাকিস্তানের কলেজ অব ফিজিশিয়ানস অ্যান্ড সার্জনস থেকে এফসিপিএস, ২০০৬ সালে যুক্তরাজ্যের (এডিনবরা) রয়্যাল কলেজ অব ফিজিশিয়ানস থেকে এফআরসিপি ফেলোশিপ অর্জন করেন তিনি। দেশে ও বিদেশে তিনি মূল ইউরোলজি বিশেষজ্ঞ হিসেবে পরিচিত।

খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত চিকিৎসক হিসেবে এ জেড এম জাহিদ হোসেন দলীয় প্রধানের স্বাস্থ্যের খবর দিতে নিয়মিত আসতেন সাংবাদিকদের সামনে
ফাইল ছবি

১৯৮৩ সালে তিনি বিসিএস (স্বাস্থ্য) ক্যাডারে যোগদান করেন। পেশাগতভাবে তিনি ইউরোলজির অধ্যাপক। তিনি দুবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসা অনুষদের ডিন, দুবার বিসিপিএসের নির্বাচিত কাউন্সিলর ও অনারারি সচিব ছিলেন। বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) দুবার নির্বাচিত মহাসচিব ছিলেন তিনি।

১৯৭৯ সালে ছাত্রদলের সদস্য হিসেবে ছাত্ররাজনীতির মাধ্যমে জাহিদ হোসেনের রাজনৈতিক পথচলা শুরু। সরকারি চাকরিতে যোগদানের পর তিনি সরাসরি রাজনীতিতে না জড়িয়ে পেশাজীবী রাজনীতিতে সক্রিয় হন। ১৯৮৯ সালে তিনি বিএনপি–সমর্থক চিকিৎসকদের সংগঠন ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) সঙ্গে যুক্ত হন। ১৯৯৮ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত চারবার ড্যাবের নির্বাচিত মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদ, শত নাগরিক কমিটি, জাতীয়তাবাদী নাগরিক কমিটির উদ্যোক্তা সদস্য ছিলেন।

মন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পর শপথপত্রে সই করেন অধ্যাপক এ জেড এম জাহিদ হোসেন (সবার ডানে)। তার পাশে দুই মন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু ও শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ। গতকাল মঙ্গলবার সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায়
ছবি: বিএনপির প্রেস উইং

২০০৯ সালে জাহিদ হোসেন বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা নিযুক্ত হন। এরপর ২০১৬ সালে দলের কাউন্সিলের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন এবং ২০২৪ সালে বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য হন।

দলীয় চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার অসুস্থতার দীর্ঘ সময় জাহিদ হোসেন প্রায় সার্বক্ষণিকভাবে হাসপাতালে তাঁর চিকিৎসা ও সেবা ব্যবস্থাপনায় যুক্ত ছিলেন, নেতৃত্ব দিয়েছেন। নেত্রীর প্রতি তাঁর এই দায়িত্ব ও দরদ দেশবাসীর দৃষ্টি কেড়েছে। সাংগঠনিক দক্ষতা বিবেচনায় নিয়ে অধ্যাপক জাহিদ হোসেনকে দুই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এই দুটি মন্ত্রণালয়ে বেশ কিছু জটিলতা আছে, আছে দুর্নীতির অভিযোগ। ফলে সেই জঞ্জাল সরানোর চ্যালেঞ্জ এখন চিকিৎসক নেতা জাহিদ হোসেনের সামনে।

রাজনৈতিক কারণে জাহিদ হোসেনের বিরুদ্ধে গত ১৮ বছরে মোট ৪৮টি মামলা দায়ের করা হয়। এই সময়ে তিনি তিন দফায় জেল খেটেছেন।

নির্বাচনী হলফনামায় জাহিদ হোসেন তাঁর বার্ষিক আয় দেখিয়েছেন ৭০ লাখ টাকা। তাঁর অস্থাবর সম্পদের মূল্যমান দেখিয়েছেন ৭ কোটি ৯ লাখ টাকা। পাশাপাশি ৬৪ লাখ টাকার স্থাবর সম্পদের তথ্য হলফনামায় দিয়েছেন তিনি।