এই সরকারের কাছে সাধারণ মানুষ কীভাবে নিরাপদ থাকবে, প্রশ্ন জামায়াতের রফিকুল ইসলাম খানের
২০২৬–২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটকে ‘গরিব মারার বাজেট’ আখ্যা দিয়ে নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, খেলাপি ঋণ, আইনশৃঙ্খলার অবনতি, ব্যাংক খাতের সংকট, দুর্নীতি ও অর্থ পাচার নিয়ে সরকারের কঠোর সমালোচনা করেছেন জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য রফিকুল ইসলাম খান। তিনি বলেন, যে সরকার নিজের দলের মানুষের জীবনই নিরাপদ রাখতে পারছে না, সেই সরকারের কাছে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা আশা করা যায় না।
আজ শনিবার জাতীয় সংসদে ২০২৬–২০২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে রফিকুল ইসলাম এ কথা বলেন। ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ‘সব মন্ত্রণালয়েই প্রক্সি দেন’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সমালোচনা করে জামায়াতের এই সংসদ সদস্য দাবি করেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার ব্যর্থ হয়েছে। তাঁর ভাষায়, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ‘সব মন্ত্রণালয়েই প্রক্সি দেন’, কিন্তু আইনশৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষেত্রে সফল হতে পারেননি। তিনি বলেন, দেশে হত্যা, অপহরণ, ধর্ষণ ও মাদকের বিস্তার উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা মানুষের জানমাল ও সম্মানের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
লক্ষ্মীপুরে মা ও তিন মেয়েকে হত্যার ঘটনা এবং দেশে বিভিন্ন ধর্ষণের ঘটনার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, এসব ঘটনায় মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কতটা কার্যকর, তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে রফিকুল ইসলাম বলেন, গত ১০০ দিনে ৬০৫টি হত্যাকাণ্ড ও ১৯৬টি অপহরণের ঘটনা ঘটেছে। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে ২৮৮ জনই সরকারদলীয়। যদি নিজের দলের লোকেরাই নিরাপদ না থাকে, তাহলে সাধারণ মানুষ কীভাবে নিরাপদ থাকবে—প্রশ্ন তোলেন তিনি।
হাদি হত্যা মামলার আসামিদের বিচারের আহ্বান
শরিফ ওসমান বিন হাদির হত্যা মামলার প্রসঙ্গ তুলে রফিকুল ইসলাম বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী কয়েকজন আসামি গ্রেপ্তার হলেও তাঁদের দেশে ফিরিয়ে আনতে দেরি হচ্ছে কেন, সেটি তাঁর প্রশ্ন। তিনি দেশে-বিদেশে থাকা সব আসামিকে গ্রেপ্তার করে দ্রুত বিচারের মুখোমুখি করার আহ্বান জানান।
রফিকুল ইসলাম সংসদে মাদকবিরোধী আইন পাসে বিল উত্থাপনের জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানান। তবে তিনি বলেন, শুধু আইন করলেই হবে না, মাদক ব্যবসায়ী ও সরবরাহকারী চক্রকে চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে এবং যেসব দেশ থেকে মাদক আসছে, সেসব পথও বন্ধ করতে হবে। এটিকে তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর অন্যতম দায়িত্ব বলে উল্লেখ করেন।
এই বাজেট গরিবের ওপর বাড়তি চাপ
জামায়াত–দলীয় এই সংসদ সদস্য বলেন, সরকারি দলের সদস্যরা দাবি করছেন, বাজেটের পর কোনো জিনিসের দাম বাড়েনি, কোনো মিছিল হয়নি। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম আগেই বাড়ানো হয়েছে। এর প্রভাবেই এলপিজি গ্যাস, ডিজেল, পেট্রোল, কেরোসিন, ডিম, পেঁয়াজ, মুরগিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়েছে। ভ্যাটের কারণে ভিক্ষুক পর্যন্ত করের বোঝা বহন করছেন। তাই এটি জনবান্ধব নয়; বরং গরিব মানুষের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করা বাজেট।
রফিকুল ইসলাম বলেন, সরকার জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৫ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশ ধরলেও বাস্তব পরিস্থিতি সেই লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ১১ মাসে এডিপি (বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি) বাস্তবায়ন হয়েছে মাত্র ৪৮ দশমিক ৩ শতাংশ। এখন এক মাসে বাকি অর্ধেকের বেশি ব্যয় করতে হলে তড়িঘড়ি প্রকল্প বাস্তবায়নের নামে অনিয়ম ও লুটপাটের আশঙ্কা রয়েছে।
ব্যাংক খাতের সংকট উত্তরণে দিকনির্দেশনা নেই
ব্যাংক খাতের সংকট তুলে ধরে রফিকুল ইসলাম বলেন, বর্তমানে খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ৫ লাখ ৮৯ হাজার কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩২ শতাংশের বেশি। অথচ ২০০৯ সালে এ পরিমাণ ছিল মাত্র ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা। বাজেটে এই সংকট উত্তরণের কার্যকর কোনো দিকনির্দেশনা নেই বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
বক্তব্যে গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবি জানিয়ে রফিকুল ইসলাম বলেন, দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ গণভোটে মত দিয়েছেন। সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সেই রায় উপেক্ষা করা ঠিক হয়নি। জনগণের রায় বাস্তবায়নে সরকার গড়িমসি করলে তার পরিণতি ভালো হবে না বলেও সতর্ক করেন তিনি।
কওমি মাদ্রাসার ১২ থেকে ১৪ লাখ শিক্ষার্থীর জন্য বাজেটে আলাদা বরাদ্দ, ইবতেদায়ি মাদ্রাসা সরকারি করা, ইমাম-মুয়াজ্জিনের পাশাপাশি পুরোহিত ও পাদরিদের জন্যও সম্মান ভাতা চালুর দাবি জানান তিনি।
এ ছাড়া জুলাই আন্দোলনের শহীদদের পাশাপাশি গত ১৬ বছরে নিহত, গুম, অপহরণ ও নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারকেও ভাতা ও পুনর্বাসনের আওতায় আনার আহ্বান জানান তিনি।
দুর্নীতিবাজ কোনো দলের নয়, তারা দেশের শত্রু
প্রশাসনে দলীয়করণের অভিযোগ তুলে রফিকুল ইসলাম বলেন, আগের সরকারের আমলের অনেক কর্মকর্তা এখনো গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল আছেন, আবার দীর্ঘদিন বঞ্চিত কর্মকর্তারা এখনো বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।
শেখ হাসিনাসহ বিদেশে অবস্থানরত ‘ফ্যাসিবাদের দোসরদের’ দেশে ফিরিয়ে এনে দ্রুত বিচারের মুখোমুখি করার দাবি জানান রফিকুল ইসলাম।
দুর্নীতি, অর্থ পাচার ও ব্যাংক লুটের প্রসঙ্গ টেনে জামায়াতের এই সংসদ সদস্য বলেন, সুইস ব্যাংকে হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার হয়েছে, এস আলমসহ ব্যাংক লুটেরাদের কাছ থেকে অর্থ ফেরত আনতেও সরকার কার্যকর উদ্যোগ নেয়নি। দুর্নীতিবাজ কোনো দলের নয়, তারা দেশের শত্রু উল্লেখ করে পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে এনে দুর্নীতিমুক্ত, সন্ত্রাসমুক্ত ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ে তোলার আহ্বান জানান রফিকুল ইসলাম।