গত আগস্ট মাসে আত্মপ্রকাশ করা রাজনৈতিক জোট গণতন্ত্র মঞ্চে রয়েছে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি), নাগরিক ঐক্য, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, গণসংহতি আন্দোলন, গণ অধিকার পরিষদ, ভাসানী অনুসারী পরিষদ ও রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন।

এই মঞ্চের নেতারা গতকাল শনিবার বাংলাদেশ জাসদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক মতবিনিময় করেছেন। বাংলাদেশ জাসদ আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪–দলীয় জোটের শরিক। আনুষ্ঠানিকভাবে ১৪ দল ছেড়ে যাওয়ার ঘোষণা না দিলেও কয়েক বছর ধরে জোটের সভায় দলটির নেতারা অংশ নিচ্ছেন না। সরকারের নেওয়া বিভিন্ন সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে প্রকাশ্যে বক্তব্য দিয়ে আসছেন দলটির নেতারা।

বাংলাদেশ জাসদ কার্যালয়ে গণতন্ত্র মঞ্চের সঙ্গে মতবিনিময় সভা শেষে দলটির সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হক প্রধান বলেন, বর্তমান সরকারের সীমাহীন লুটপাট-অর্থ পাচারের ফলে জনগণের যে নাভিশ্বাস উঠেছে, তার বিরুদ্ধে ঐক্য ও আন্দোলন গড়ে তুলতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করবেন তাঁরা।

গণতন্ত্র মঞ্চ মনে করে, বর্তমান সরকারের অধীনে নিরপেক্ষ নির্বাচনের কোনো অবকাশ নেই। তবে শুধু সরকারের বিদায় এবং একটা নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানই যথেষ্ট নয়। বিদ্যমান শাসনব্যবস্থাও বদলাতে হবে। এ লক্ষ্যে যুগপৎ আন্দোলনে বিএনপির সঙ্গে প্রাথমিকভাবে কী ধরনের রাজনৈতিক সমঝোতা বা চুক্তিতে পৌঁছেছেন, সেটি বিভিন্ন মতবিনিময়ে খোলাসা করবেন মঞ্চের নেতারা। এর চূড়ান্ত লক্ষ্য হচ্ছে, যুগপৎ আন্দোলনে আরও বেশি সংখ্যক দলকে যুক্ত করা। একই সঙ্গে আন্দোলনের শক্তি বাড়ানো।

বর্তমান কর্তৃত্ববাদী শাসকেরা বাংলাদেশকে যে বিপজ্জনক পরিণতির দিকে নিয়ে যাচ্ছে, তাতে বিদ্যমান সংবিধানকে সংস্কার করে একটি নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত দরকার।
জোনায়েদ সাকি, প্রধান সমন্বয়কারী, গণসংহতি আন্দোলন

মঞ্চের একাধিক সূত্র জানায়, যেসব দলের সঙ্গে মতবিনিময় করার প্রাথমিক সিদ্ধান্ত হয়েছে, তার মধ্যে নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত দুই পর্যায়ের দলই রয়েছে। এর মধ্যে গণফোরামের দুই অংশ, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল (বদরুদ্দীন উমর), বাংলাদেশের সাম্যবাদী আন্দোলনসহ (শুভ্রাংশু চক্রবর্তী) বামধারার কয়েকটি দল রয়েছে। মঞ্চের নেতারা বলছেন, অনিবন্ধিত হলেও কয়েকটি দলের শীর্ষ নেতৃত্বের সমাজে গুরুত্ব ও প্রভাব রয়েছে। তাই সরকারবিরোধী বৃহত্তর আন্দোলনে যত দল, সংগঠন ও ব্যক্তিকে সম্পৃক্ত করা যায়, সে চেষ্টার অংশ হিসেবে তাঁরা বিএনপির বাইরে আলাদা করে এই রাজনৈতিক আলোচনার উদ্যোগ নিয়েছেন।

এ বিষয়ে গণতন্ত্র মঞ্চের নেতা ও বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক প্রথম আলোকে বলেন, বর্তমান সরকার সমাজটাকে ভাগ করে ফেলেছে। তারা প্রতিশোধপরায়ণ রাজনীতি দিয়ে পাড়া-মহল্লায় পর্যন্ত বিভাজন তৈরি করেছে। মানুষ এ অবস্থা থেকে দ্রুত মুক্তি চায়। এ মুহূর্তে মানুষ দেখতে চায় মতপার্থক্য সত্ত্বেও বিরোধীরা একসঙ্গে আছে।

তবে মঞ্চের নেতারা এ–ও বলছেন, একসঙ্গে থাকা মানে ‘মঞ্চ’ বা ‘জোট’ করা নয়। যার যার অবস্থান থেকে শক্ত ভূমিকা রাখা। কারণ, ক্ষমতাসীন সরকার আরেকটি ব্যর্থ ও অকার্যকর নির্বাচনের পাঁয়তারা করছে, যা দেশকে গভীর অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেবে। অথচ আরেকটা ব্যর্থ ও অকার্যকর নির্বাচনের দায় বহন করা বাংলাদেশের পক্ষে সম্ভব নয়।

গণতন্ত্র মঞ্চের দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, বর্তমান সরকারের পদত্যাগ, সংসদ বিলুপ্ত করা, নির্দলীয় সরকারের অধীন নির্বাচনসহ কিছু সাংবিধানিক ও শাসনতান্ত্রিক সংস্কারে গণতন্ত্র মঞ্চের শরিক দলগুলো বিএনপির সঙ্গে ‘যুগপৎ আন্দোলনে’ নীতিগতভাবে একমত হয়েছে। এখন তাঁরা পাল্টা বৈঠকে বসবেন বিএনপির সঙ্গে। যুগপৎ আন্দোলনের লক্ষ্য ও ভিত্তি কী হবে, আন্দোলনের ধরন কী হবে—এসব চূড়ান্ত করা হবে সেই বৈঠকে। তবে কবে এ বৈঠকের তারিখ, এখনো চূড়ান্ত হয়নি।

এ বিষয়ে নাগরিক ঐক্যের সভাপতি ও গণতন্ত্র মঞ্চের নেতা মাহমুদুর রহমান মান্না প্রথম আলোকে বলেন, বিএনপি বলেছিল ‘যুগপৎ আন্দোলনের’ রূপরেখা তৈরি করার জন্য সবার সঙ্গে বসবে। এর আগে তাদের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের রূপরেখা দেওয়ার করার কথা। সেটা এখনো ঘোষণা হয়নি।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গণতন্ত্র মঞ্চ সারা দেশে বিভাগীয় পর্যায়ে কর্মী সম্মেলন ও সুধী সমাবেশের কর্মসূচি শুরু করবে। আগামী নভেম্বর মাসেই তা শুরু হবে বলে একাধিক নেতা জানিয়েছেন। এ মুহূর্তে তাদের লক্ষ্য, যুগপৎ আন্দোলনের বিষয়ে সমমনা অন্য দলগুলোর সঙ্গে রাজনৈতিক বোঝাপড়া বাড়িয়ে তোলা এবং তাদের আন্দোলনে যুক্ত করে সরকারবিরোধী ঐক্যমঞ্চকে বিস্তৃত করা।

এ বিষয়ে গণতন্ত্র মঞ্চের নেতা ও গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি প্রথম আলোকে বলেন, বর্তমান কর্তৃত্ববাদী শাসকেরা বাংলাদেশকে যে বিপজ্জনক পরিণতির দিকে নিয়ে যাচ্ছে, তাতে বিদ্যমান সংবিধানকে সংস্কার করে একটি নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত দরকার। এ লক্ষ্য সামনে রেখে বৃহত্তর ঐক্য গড়ার চেষ্টা করছেন তাঁরা। বিএনপিসহ প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা চলছে। তাঁরা বিশ্বাস করেন, দ্রুততম সময়ে এ ঐক্য জনগণের মধ্যে আস্থার সৃষ্টি করবে এবং গণজোয়ার সৃষ্টি হবে।