৬ শতাংশ খেলাপি ঋণেই আমরা ঘাবড়ে যেতাম, বাংলাদেশে তা এখন ৬১ শতাংশ: সংসদে রেজা কিবরিয়া
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা আইএমএফের হিসাবে ৬ শতাংশ খেলাপি ঋণ হলেই উদ্বেগ তৈরি হতো। অথচ বাংলাদেশে সেই হার এখন ৬১ শতাংশে পৌঁছেছে। এসব তথ্য তুলে ধরে দেশের ব্যাংকিং খাতের নাজুক পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিএনপির সংসদ সদস্য ও অর্থনীতিবিদ রেজা কিবরিয়া।
আজ বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে হবিগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য রেজা কিবরিয়া এ উদ্বেগ প্রকাশ করেন। বেলা ১১টায় ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে অধিবেশন শুরু হয়।
আইএমএফে কাজ করার অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে রেজা কিবরিয়া বলেন, ‘আমি ৩৫টি দেশে কাজ করেছি। আমরা মোট ঋণের ৬ শতাংশ খেলাপি হলে ঘাবড়ে যেতাম। কিন্তু সেখানে বাংলাদেশ ৬১ শতাংশ। এতে ব্যাংকিং খাত সম্পূর্ণভাবে বেহাল। ব্যাংকের বিষয়ে কড়া পদক্ষেপ না নিলে অর্থনৈতিক অগ্রগতি আশা করাটা ভুল।’এ বিষয়ে অর্থমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে তিনি আশা করেন এ নিয়ে অর্থমন্ত্রী পদক্ষেপ নেবেন। কারণ, ব্যাংকিং দক্ষতা বাড়াতে হবে। এ সময় বিরোধী দলের সদস্যদের টেবিল চাপড়ে সমর্থন জানাতে দেখা যায়।
১৯৮৪ সালে আইএমএফে কর্মজীবন শুরু করা রেজা কিবরিয়া জানান, তিনি প্রায় ৪৫ বছর ধরে অর্থনীতি খাত নিয়ে কাজ করছেন। সেই অভিজ্ঞতা থেকে তিনি মনে করেন, ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং আয়বৈষম্য কমানো ছাড়া টেকসই অর্থনৈতিক অগ্রগতি সম্ভব নয়।
অদক্ষতা বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের অন্যতম বড় সমস্যা উল্লেখ করে এই সংসদ সদস্য বলেন, ‘আমরা জনগণের কাছ থেকে ৫ শতাংশ হারে [সুদে আমানত] টাকা নিই, কিন্তু ঋণ নিতে এলে ১৪ বা ১৬ শতাংশ সুদ চাই। এ জন্যই আমাদের ব্যাংকিং খাত কার্যকর না।’
এই সংসদ সদস্যের মতে, একটি দক্ষ ব্যাংকিং ব্যবস্থায় আমানত ও ঋণের সুদের হারের ব্যবধান এত বেশি হওয়ার কথা নয়। তাঁর ভাষ্যমতে, ‘ব্যাংকিং সেক্টর দক্ষ হলে যে রেটে লোক টাকা নিয়ে আসে, সেই কাছাকাছি রেটে, ৪ বা ৬ রেটে ইন্টারেস্ট থাকা উচিত। সৎ ব্যবসায়ীরা ঋণ পাচ্ছে না।’
খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র আড়াল করার অভিযোগ তুলে রেজা কিবরিয়া বলেন, ‘আমাদের ডিফল্ট সিস্টেম। আমরা ব্যাংকের ডিফল্টের সংজ্ঞা পাল্টে দিয়েছি। আগে ছিল ৯০ দিন সুদ না দিলে ডিফল্টেড। কিন্তু এখন আমরা ১ বছর সুদ না দিলে ডিফল্টেড বলি।’
আলোচনার এক পর্যায়ে সময়সীমা শেষ হলে ডেপুটি স্পিকার রেজা কিবরিয়াকে জিজ্ঞেস করেন, আর কত সময় প্রয়োজন। জবাবে তিনি বলেন, ‘চার মিনিট দেন। পরে আমাকে ইউটিউবে ছাড়তে হবে।’ তাঁর এ মন্তব্যে সংসদ কক্ষে হাস্যরসের সৃষ্টি হয়।
‘বিশ্ব অর্থনীতির বাস্তবতায় এই বাজেট বিস্ময়ের কিছু নয়’
রেজা কিবরিয়া বলেন, বৈশ্বিক অর্থনীতির চলমান মন্থরতার মধ্যে অর্থমন্ত্রী অত্যন্ত কঠিন পরিস্থিতিতে বাজেট প্রণয়ন করেছেন। তিনি বলেন, ‘বিশ্ব অর্থনীতির সম্ভাবনা দুর্বল হয়ে পড়ছে। প্রতি ছয় মাস অন্তর বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়ে আনা হচ্ছে। বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় এই বাজেট বিস্ময়ের কিছু নয়।’
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত রাখতে সামষ্টিক অর্থনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করে হবিগঞ্জ-১ আসনের এই সংসদ সদস্য বলেন, মোট ঋণের পরিমাণ এখনো নিয়ন্ত্রণযোগ্য পর্যায়ে রয়েছে। তাঁর তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট ঋণ মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ৪০ শতাংশ এবং ঋণ পরিশোধে ব্যয় হয় প্রায় ২০ শতাংশ।
তবে বাণিজ্যিক বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়ানোর বিরুদ্ধে সতর্ক করে রেজা কিবরিয়া বলেন, দীর্ঘমেয়াদি পরিশোধ সুবিধা ও তুলনামূলক কম সুদের কারণে বাংলাদেশ ঐতিহ্যগতভাবে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে ঋণ নিতে আগ্রহী। এসব ঋণের সুদের হার সাধারণত শূন্য দশমিক ৫ থেকে ১ শতাংশের মধ্যে থাকে।
মূল্যস্ফীতি ও বিনিময় হার
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার অন্যতম প্রধান শর্ত উল্লেখ করে রেজা কিবরিয়া বলেন, ‘মুদ্রাস্ফীতি কম রাখাটা শ্রেয়। আমাদের এক্সচেঞ্জ রেট (বিনিময় হার) প্রতিবছর কমে। কারণটা হচ্ছে—আমাদের ট্রেডিং পার্টনারের মুদ্রাস্ফীতির সঙ্গে আমাদের মুদ্রাস্ফীতির তফাতের ওপর সবকিছু নির্ভর করে। আমাদের মুদ্রাস্ফীতি ১০ হলে এবং আমাদের ট্রেডিং পার্টনারের মুদ্রাস্ফীতি ৩ হলে আমাদের এক্সচেঞ্জ রেট ৭ শতাংশ কম হবে।’
রেজা কিবরিয়া আরও বলেন, মূল্যস্ফীতি অর্থনীতির প্রায় সব ক্ষেত্রকে প্রভাবিত করে। নীতিনির্ধারণ, বিনিয়োগ, প্রবৃদ্ধি—সবকিছুই এর সঙ্গে সম্পর্কিত। ফলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আয়বৈষম্য কমানোর তাগিদ
আয়বৈষম্যের প্রসঙ্গ টেনে রেজা কিবরিয়া বলেন, পূর্ববর্তী সরকারগুলো এ ক্ষেত্রে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিতে পারেনি। তিনি বলেন, ‘দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী অতিরিক্ত আয় পেলে তার বেশির ভাগ বা পুরোটা ব্যয় করে, যা অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। কিন্তু ধনী ব্যক্তি অতিরিক্ত অর্থ পেলে তা ব্যয় না–ও করতে পারেন। ফলে অর্থনীতিতে এর প্রভাব তুলনামূলকভাবে অনেক কম হয়।’
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রকৃতি নিয়ে প্রশ্ন তুলে রেজা কিবরিয়া বলেন, ‘শুধু বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট ও শপিং মল নির্মাণ করলেই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত হয় না। যদি বিনিয়োগের বড় অংশ ৭ হাজার বর্গফুটের বিশাল অ্যাপার্টমেন্ট ও শপিং মল নির্মাণে কেন্দ্রীভূত হয়, তাহলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে না।’