সরকার আসলে চলছে ‘সবার আগে যুক্তরাষ্ট্র’ নীতিতে: আনু মুহাম্মদ

বিএনপি সরকারের আড়াই মাসের কাজের মূল্যায়ন তুলে ধরে আজ শনিবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটি আয়োজিত আলোচনা সভায় আনু মুহাম্মদসহ আলোচকেরাছবি: গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির ফেসবুক পেজ

বিএনপি ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগান দিয়ে ক্ষমতায় গেলেও দেশের পরিবর্তে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষা করে চলছে বলে দাবি করেছেন অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ।

তিনি বলেছেন, ‘বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সব সময় বলছেন—সবার আগে বাংলাদেশ। এটা বলেই তিনি শুরু করেছেন, বাংলাদেশে এসে প্রথম দিনই বলেছেন ‘সবার আগে বাংলাদেশ’। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যে চুক্তি, সেই চুক্তিটা দেখাচ্ছে যে সরকার “সবার আগে যুক্তরাষ্ট্র” এই নীতি অনুযায়ী চলছে।’

বিএনপি সরকারের আড়াই মাসের কাজের মূল্যায়নে আজ গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটি আয়োজিত এক সভায় এ কথা বলেন আনু মুহাম্মদ। আজ শনিবার দুপুরে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে অনুষ্ঠিত এ আলোচনায় সভাপ্রধান ছিলেন তিনি।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি এবং তার ধারাবাহিকতায় বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানি বোয়িং থেকে ১৪ উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি দিকে ইঙ্গিত করে দুটি সরকারেরই সমালোচনা করেন আনু মুহাম্মদ।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির সাবেক এই অধ্যাপক বলেন, এই চুক্তি স্বাক্ষরের অনেক আগে থেকে এর বাস্তবায়ন শুরু করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। সেই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এলএনজি আমদানির চুক্তি হলো। পত্রপত্রিকায় খবর এসেছিল, এলএনজি আমদানির বিষয়ে পেট্রোবাংলা কিছু জানে না। এই চুক্তি করেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী। তখন বিমান কেনার ব্যাপারেও একটা বোঝাপড়া হয়েছিল, যা বিমান জানত না। এখন নির্বাচিত সরকারের সময়ও একই ঘটনাই ঘটছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে স্বাক্ষরিত বাণিজ্যচুক্তিকে ‘জাতীয় স্বার্থবিরোধী অবিশ্বাস্য চুক্তি’ আখ্যা দেন তিনি। তাঁর দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই চুক্তি সইয়ে তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের পাশাপাশি উৎসাহী ছিলেন তৎকালীন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান এবং বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী।

খলিলুর রহমানকে বিএনপির সরকারে পররাষ্ট্রমন্ত্রী করা এবং বিডায় আশিক চৌধুরীকে রেখে দেওয়া নিয়ে আনু মুহাম্মদ বলেন, এই চুক্তির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে তদন্ত ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা। অথচ তাদের রেখে দিয়ে আরও দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

আরও পড়ুন

অন্তর্বর্তী সরকারের কার্যক্রম পর্যালোচনা করে একটি শ্বেতপত্র প্রকাশের দাবি জানান আনু মুহাম্মদ। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে নীরবতার জন্য সংসদে থাকা বর্তমান দলগুলোর সমালোচনা করেন তিনি।

দেশি-বিদেশি লবিস্টদের তৎপরতায় বর্তমান বিএনপি সরকারে দুটি প্রবণতা দেখার কথা জানান আনু মুহাম্মদ। তা হলো উৎপাদন–অংশীদারি চুক্তিকে কোম্পানির স্বার্থে সংশোধন করা হচ্ছে এবং উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের বিষয়ে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের চিন্তা।

২০০৬ সালের ফুলবাড়ীর আন্দোলনের পর তৎকালীন বিএনপি সরকারের সঙ্গে আন্দোলনকারী জনগণের চুক্তির কথা মনে করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, ‘সেই চুক্তিতে বলা হয়েছিল, বাংলাদেশে কোনো উন্মুক্ত খনি হবে না। যেখানে পৃথিবীর সবাই কয়লা থেকে সরে যাচ্ছে, সেখানে আওয়ামী লীগ সরকার কয়লার মধ্যে আবার ঢুকে আমদানিমুখী তৎপরতা চালিয়েছে। আবার দেখা এই সরকার যাচ্ছে ওই রাস্তার মধ্যেই হাঁটা শুরু করেছে।’

দিনাজপুরের ফুলবাড়ীতে কয়লাখনিতে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা আহরণের উদ্যোগে ভিটেমাটি হারানোর শঙ্কায় ২০০৬ সালে আন্দোলনে নেমেছিল স্থানীয়রা। সেই আন্দোলনে সমর্থন দিয়েছিল বামসমর্থিত তেল–গ্যাস খনিজ সম্পদ রক্ষা জাতীয় কমিটি, যে কমিটির সদস্যসচিব ছিলেন আনু মুহাম্মদ।

বিদেশি কোম্পানি এশিয়া এনার্জি (বর্তমানে জিসিএম) ফুলবাড়ীর খনির কাজ নিয়ে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা আহরণের উদ্যোগ নিয়েছিল। ২০০৬ সালের ২৬ আগস্ট তেল–গ্যাস রক্ষা কমিটি ফুলবাড়ীতে এশিয়া এনার্জির কার্যালয় ঘেরাওয়ে গেলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী গুলি চালায়, তাতে তিনজন নিহত হন। এরপর তৎকালীন বিএনপি সরকার ফুলবাড়ীবাসীর সঙ্গে চুক্তি করে পরিস্থিতি শান্ত করেছিল।

‘সর্বত্র কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার প্রয়াস’

আওয়ামী লীগের মতো বর্তমান বিএনপি সরকারও রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার পথে হাঁটতে চাইছে বলে মনে করছেন আনু মুহাম্মদ। কাকে ধরা বা তুলে নিয়ে যাওয়া হবে, বিনা বিচারে আটক রাখা, কাকে কোন আইনে আটকে রাখা হবে—এসব ক্ষেত্রে বর্তমান সরকারের সময়ও প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধ নির্ধারক বিষয় হয়ে দাঁড়াচ্ছে কি না, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি।

আনু মুহাম্মদ সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মানুষকে আটকে রাখার সমালোচনা করে বলেন, হাসিনা আমলে যেভাবে ব্যবহার করা হয়েছিল, তার থেকে আইন-আদালত কিংবা এসব কোনো ক্ষেত্রে কোনো পরিবর্তনের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। পুরো সংস্কৃতির মধ্যে একই ধারাবাহিকতা দেখা যাচ্ছে যে “ক্ষমতায় এলে আমরা যা খুশি করতে পারি”। সরকার আইন-আদালতসহ সবকিছুকে নিয়ন্ত্রণ করার, একটা কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করছে।

‘চব্বিশের হত্যাকাণ্ডে দায়মুক্তি নয়’

জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমানের একটি বক্তব্যের প্রতি ইঙ্গিত করে আনু মুহাম্মদ বলেন, বিরোধী দল ও জামায়াতের নেতা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন যে “ইতিহাস নিয়ে টানাটানি কেন, আমরা ইতিহাসের গালগল্প শুনতে আসিনি...।”

তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধ কোনো গালগল্পের বিষয় নয়, মুক্তিযুদ্ধ হচ্ছে বাংলাদেশের জন্য অস্তিত্বের প্রশ্ন। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কথা বলতে হবে। ইতিহাসের ফয়সালা না করলে সামনে অগ্রসর হওয়া যাবে না। সেখানে মুক্তিযুদ্ধ খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। নব্বই ও চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান, মানুষের বিভিন্ন লড়াই ও দাবিগুলো খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সেগুলো বিচার-বিশ্লেষণ এবং পর্যালোচনার মধ্য দিয়েই অগ্রসর হতে হবে।

বিষয়গুলো ধামাচাপা রাখার বিরোধিতা করে আনু মুহাম্মদ বলেন, যার যে দায় ইতিহাসে, সেই দায় তাকে পূরণ করতে হবে, সেই দায় তাকে নিতে হবে; দায়মুক্তি দেওয়া যাবে না। একাত্তরের গণহত্যার সঙ্গে যারা যুক্ত ছিল এবং চব্বিশে যে হত্যাকাণ্ড—কেউই দায়মুক্তি পাবে না। সবাইকেই দায় নিতে হবে।

বিএনপি সরকারের আড়াই মাসের কাজের মূল্যায়ন তুলে ধরে আজ শনিবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটি আয়োজিত আলোচনা সভায় আনু মুহাম্মদসহ আলোচকেরা
ছবি: গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির ফেসবুক পেজ

১৩ দফা

‘বিএনপি সরকারের আড়াই মাস: পর্যালোচনা, উদ্বেগ ও দাবিনামা’ শীর্ষক এই আলোচনা সভার শুরুতে একটি ধারণাপত্র পড়ে শোনান গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির সদস্য সজীব তানভীর ও গণতান্ত্রিক ছাত্র কাউন্সিলের সভাপতি ছায়েদুল হক নিশান। সেখানে সরকারের ‘আশু করণীয়’ বিষয়ে অধিকার কমিটির ১৩ দফা দাবি ও সুপারিশ তুলে ধরা হয়।

অধিকার কমিটির এসব দাবির মধ্যে আছে—জুলাই হত্যাকাণ্ড এবং এরপর মব সন্ত্রাস, খুন–জখম, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের দ্রুত বিচার; সংবিধান, বিচার বিভাগ, প্রশাসনসহ সব ক্ষেত্রে অঙ্গীকার অনুযায়ী প্রয়োজনীয় গণতান্ত্রিক সংস্কার; অবিলম্বে ধর্মীয় উপাসনালয়, মাজার, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, ভাস্কর্যসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও বিভিন্নজনের বাড়িঘরে হামলা–ভাঙচুর রোধে ব্যবস্থা নেওয়া ও জড়িতদের বিচার; খাদ্যদ্রব্য, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য ও খাদ্যপণ্যের দাম কমাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া; ন্যূনতম জাতীয় মজুরি ঘোষণা এবং প্রকৃতি ও কৃষকবান্ধব কৃষিব্যবস্থা নিশ্চিত করতে কমিশন গঠন।

এ ছাড়া শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ ও অব্যবস্থাপনা বন্ধ ও অভিন্ন শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় কমিশন গঠন; স্বাস্থ্যরক্ষা ও চিকিৎসাকে সাংবিধানিক অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা এবং সর্বজন (পাবলিক) হাসপাতালে সম্পূর্ণ বিনা মূল্যে চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সংস্কারের কাজ শুরু করা; পার্বত্য চট্টগ্রামে গণতান্ত্রিক পরিবেশ সৃষ্টি করতে সেনাশাসন প্রত্যাহারের রোডম্যাপ ঘোষণা; উত্তরাধিকার সূত্রে জমি-সম্পত্তিতে নারীদের সমানাধিকার নিশ্চিত করা ও সব কাজে সমশ্রমে সমমজুরি নিশ্চিত করা; মানব পাচার ও প্রবাসে বাংলাদেশি নারী-পুরুষের নিপীড়ন প্রতিরোধে বিশেষায়িত সেল গঠন এবং ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও জাপানের সঙ্গে স্বাক্ষরিত সব চুক্তি প্রকাশের পাশাপাশি জনস্বার্থবিরোধী চুক্তিগুলো বাতিলে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া।

সভায় অন্যদের মধ্যে লেখক ও গবেষক আলতাফ পারভেজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সামিনা লুৎফা, সহযোগী অধ্যাপক মোশাহিদা সুলতানা, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জ্যোতির্ময় বড়ুয়া ও মানজুর আল মতিন বক্তব্য দেন।