আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থকদের একটি অংশ ভোটকেন্দ্রে যাবে

রাত পোহালেই ভোট; কেন্দ্রে কেন্দ্রে চলে গেছে ভোটের সরঞ্জামছবি: সৌরভ দাশ

‘নো বোট, নো ভোট’; অর্থাৎ নৌকা নেই, ভোটও নয়—এবারের নির্বাচনে এটাই কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের অবস্থান। ভোট ঠেকানোর কোনো পরিকল্পনা দলটির নেই। তবে দলের নেতারা মনে করছেন, ভোটকেন্দ্রে না যাওয়ার আহ্বান সত্ত্বেও কর্মী-সমর্থকদের একটা অংশ ভোট দিতে যাবে। মামলা, ভয়ভীতি এবং নানা প্রলোভনের কারণে এটা স্বাভাবিক হিসেবেই ধরে নিয়েছে আওয়ামী লীগ।

আওয়ামী লীগের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, দুই কারণে তারা ভোট প্রতিহত করার চেষ্টা করছে না। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির ভোট বর্জন ও প্রতিহত করে সফল হয় আওয়ামী লীগ। কিন্তু এবার এ ধরনের আন্দোলন করার মতো সাংগঠনিক নেতৃত্ব অনুপস্থিত। এ ছাড়া অতীতের মতো ভোট প্রতিহত করার জন্য সহযোগী রাজনৈতিক দল পাওয়া দুষ্কর। ফলে ভোটার উপস্থিতি যাতে কম হয়, নিজের দলের লোকজন যাতে ভোটকেন্দ্রে না যান, সেই লক্ষ্যই ঠিক করা হয়েছে।

ভোট প্রতিহত করা থেকে বিরত থাকার আরেকটি কারণ হচ্ছে, দেশ-বিদেশে থাকা শুভাকাঙ্ক্ষীদের এই পথে না হাঁটার পরামর্শ। ২০১৪ ও ২০২৪ সালে ভোট প্রতিহত করতে গিয়ে জ্বালাও-পোড়াওয়ের কারণে তৎকালীন বিরোধী দল বিএনপি ও জামায়াত দেশ-বিদেশে সমালোচিত হয়েছিল। এবার আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দলটির সাংগঠনিক শক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একই সমালোচনায় পড়া ঠিক হবে না বলে মনে করছেন দলটির নেতারা।

আওয়ামী লীগের নেতারা বলছেন, নিজেদের শক্তি, দলের সাংগঠনিক অবস্থা এবং শুভাকাঙ্ক্ষীদের পরামর্শ—সব মিলিয়ে আওয়ামী লীগের কৌশল ঠিক করা হয়েছে। এখন ধৈর্য ধরে সুবিধাজনক সময়ের অপেক্ষা করা ছাড়া বিকল্প খুব একটা নেই।

তৃণমূলের কর্মী-সমর্থকেরা বিভ্রান্ত

আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয় ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট। অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকারের যাত্রা শুরু হয় ৮ আগস্ট থেকে। এরপর ১২ মে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়। তখন থেকে দলটি প্রকাশ্যে কর্মসূচি পালন করতে না পারলেও বিভিন্ন সময় বিচ্ছিন্ন ও গোপন তৎপরতা দেখা গেছে। শুরুতে রাজধানীসহ কয়েকটি বড় শহরে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীরা ছোট ছোট ঝটিকা মিছিল বের করার চেষ্টা করেন। কোথাও কোথাও এসব মিছিলে পুলিশের সঙ্গে পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এরপর হরতাল, ঢাকা লকডাউনের মতো কর্মসূচি ঘোষণা করে। কিন্তু মাঠে নেতা-কর্মীদের উপস্থিতি সেভাবে দেখা যায়নি। কয়েকবার অনলাইনে সরকারের বিরুদ্ধে বিষোদ্‌গারসহ বিভিন্ন বক্তব্য দেন শেখ হাসিনা।

গত ১১ ডিসেম্বর সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর আওয়ামী লীগ অনেকটা চুপ হয়ে যায়। বিচ্ছিন্ন মিছিল বন্ধ। ককটেল বা বাসে আগুন দেওয়ার ঘটনা দেখা যায়নি। ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদী গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর সরকার দায় চাপায় আওয়ামী লীগের ওপর। এর পর থেকেই আওয়ামী লীগ নিজেকে গুটিয়ে নেয়।

সর্বশেষ দিল্লিতে দুটি সংবাদ সম্মেলন করেন আওয়ামী লীগের নেতারা। প্রথম সংবাদ সম্মেলন হয় ১৮ জানুয়ারি। বিদেশি সাংবাদিকদের সামনে আওয়ামী লীগের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা বক্তব্য দেন। ইউনূস সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচন সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য হবে না, এমন দাবি তুলে ধরেন তাঁরা। একই সঙ্গে বাংলাদেশে রাজনৈতিক দমন-পীড়ন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে ধরে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করা হয়। দ্বিতীয় সংবাদ সম্মেলন হয় ২৪ জানুয়ারি। সেখানে দলীয় প্রধান শেখ হাসিনার একটি অডিও বার্তা শোনানো হয়। সংখ্যালঘু, নারী ও বিরোধী মতের মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। পাশাপাশি আসন্ন জাতীয় নির্বাচন বর্জন এবং সমর্থকদের ভোট না দেওয়ার আহ্বানের যৌক্তিকতা তুলে ধরা হয়।

আওয়ামী লীগের এই কৌশল নিয়ে দলটির তৃণমূলের কর্মী-সমর্থকেরা কিছুটি বিস্মিত। গোপালগঞ্জের স্থানীয় আওয়ামী লীগের একজন নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগের জন্য ভালো কিছু অপেক্ষা করছে, এমন একটা ‘সমঝোতা’ কারও সঙ্গে হয়েছে। দলের নেতারা ফোনে কথা বলার সময় এমনটা ধারণা দিয়ে থাকেন। তবে কার সঙ্গে কী সমঝোতা, তা স্পষ্ট নয়।  

আওয়ামী লীগের কৌশল সম্পর্কে দলটির নেতারা বলছেন, প্রথমে মূল লক্ষ্য ছিল অন্তর্বর্তী সরকারকে বিদায় করা। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর মূল দাবি হয়, আওয়ামী লীগ ছাড়া কোনো নির্বাচন নয়। আওয়ামী লীগ নির্বাচনে থাকছে না, এটা নিশ্চিত হয়ে যাওয়ার পর ভোটারদের ভোট বর্জনের উদ্বুদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয় দলটি।

গত কয়েক দিনে আওয়ামী লীগের সাবেক মন্ত্রী-সংসদ সদস্যরা নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকার মানুষদের সঙ্গে ভিডিও কলে, বার্তা পাঠিয়ে ভোটকেন্দ্রে না যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। দলটির সভাপতি শেখ হাসিনাও ভিডিওকলে কেন্দ্রে না যেতে অনুরোধ করেছেন। ফেসবুকে দলটির নেতা-কর্মীরা ‘নো বোট, নো ভোট’ লেখা ফটোকার্ড ছাড়ছেন।

অসংখ্য নেতা-কর্মীর নামে মামলা, বিপুল সংখ্যায় গ্রেপ্তার এবং জামিন পাওয়ার ক্ষেত্রে বাধার কারণে কঠিন সময় পার করছে আওয়ামী লীগ। নেতাদের একটি অংশ মনে করছে, নতুন সরকার এলে হয়তো অবস্থার কিছুটা পরিবর্তন হতে পারে। এই বিবেচনা থেকে অপেক্ষার নীতি নিয়েছে দলটি।

আহ্বানের পরও ভোটার যাবেন

জুলাই অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে দফায় দফায় আগুন দেওয়া হয়। এখন ভবনটিতে প্রবেশের মতো পরিবেশ নেই। ভবঘুরেদের বিচরণ, নোংরা আবর্জনায় ভরা। ধানমন্ডিতে দলীয় সভাপতির একটি কার্যালয় আছে। এ ছাড়া ধানমন্ডি এলাকায় আরও কিছু ভবনে আওয়ামী লীগের নানা কার্যক্রম হতো। এসব ভবনেও আগুন দেওয়া হয়। এমনকি জেলা পর্যায়ের কার্যালয়গুলোও পোড়ানো হয়েছে অথবা ভাঙচুর করা হয়েছে।

৮১ সদস্যের আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির কেউ প্রকাশ্যে নেই। অধিকাংশ আত্মগোপনে, কেউ কেউ কারাগারে। কেন্দ্রীয় নেতার বাইরে সাবেক, মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও স্থানীয় দলীয় জনপ্রতিনিধিদেরও প্রকাশ্যে দেখা যায় না।

এ পরিস্থিতিতে দলটির একাধিক নেতা ও সাবেক মন্ত্রী-এমপিরা মনে করছেন, দলের অধিকাংশ কর্মী-সমর্থক ভোট দিতে যাবেন না। তবে কেউ কেউ ভয়ভীতির কারণে, কেউ লোভে পড়ে ভোটকেন্দ্রে যাবেন। আবার সমর্থকদের মধ্যে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণি দলের অনুরোধে তেমন সাড়া দেবেন না। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ভোটাররাও নিজ নিজ এলাকার পরিবেশ-পরিস্থিতি দেখে সিদ্ধান্ত নেবেন।

আওয়ামী লীগ নেতাদের ধারণা, সমর্থকদের মধ্যে যাঁরা ভোট দিতে যাবেন, তাঁরা গণভোটে ‘না’–এর পক্ষে রায় দেবেন। আবার বিএনপি ও জামায়াতের বাইরে বিকল্প প্রার্থী বা স্বতন্ত্র ও সংখ্যালঘু প্রার্থীরা আওয়ামী লীগের ভোট বেশি পেতে পারেন।