ইসলামী আন্দোলনেও আসছে ‘ছাত্রী উইং’
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর সাংগঠনিক বিস্তার ও নারী ভোটারদের মধ্যে প্রভাব বাড়াতে নতুন কৌশল নিয়েছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। এর অংশ হিসেবে এবার আলাদা ‘ছাত্রী উইং’ গঠনের প্রস্তুতি নিচ্ছে দলটি। ঈদুল আজহার পর নতুন এই ইউনিটের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসতে পারে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।
দলটির নেতারা বলছেন, নারী শিক্ষার্থীদের মধ্যে সাংগঠনিক ভিত্তি শক্তিশালী করা, ইসলামী মূল্যবোধভিত্তিক রাজনীতির বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া এবং ভবিষ্যৎ নারী নেতৃত্ব তৈরি করাই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।
ইসলামী আন্দোলনের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব ও মুখপাত্র গাজী আতাউর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, নারীদের মধ্যে সাংগঠনিক কার্যক্রম থাকলেও আগে আলাদা সংগঠন করার চিন্তা ছিল না। তবে পরিবর্তিত বাস্তবতায় নারী শিক্ষার্থীদের জন্য পৃথক প্ল্যাটফর্ম তৈরির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
নির্বাচনের মূল্যায়ন থেকে নতুন ভাবনা
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী তাদের কেন্দ্রীয়, সহযোগী ও পেশাজীবী সংগঠনের পাশাপাশি মহিলা বিভাগ ও ছাত্রী সংস্থাকে সক্রিয়ভাবে কাজে লাগিয়েছিল। রাজনীতি–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, নারী ভোটার ও তরুণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে জামায়াতের সাংগঠনিক উপস্থিতি বাড়াতে এ উদ্যোগ কিছুটা কার্যকরও হয়েছিল।
দলটির নেতারা বলছেন, নারী শিক্ষার্থীদের মধ্যে সাংগঠনিক ভিত্তি শক্তিশালী করা, ইসলামী মূল্যবোধভিত্তিক রাজনীতির বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া এবং ভবিষ্যৎ নারী নেতৃত্ব তৈরি করাই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।
ইসলামী আন্দোলনের অভ্যন্তরীণ আলোচনায় এ বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন।
জাতীয় সংসদ নির্বাচনে হাতপাখা প্রতীক নিয়ে এককভাবে অংশ নেয় ইসলামী আন্দোলন। শুরুতে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১–দলীয় ঐক্যে ছিল দলটি, নির্বাচনের আগে তারা সেখান থেকে সরে আসে। নির্বাচনে দলটি মোট ভোটের ২ দশমিক ৭০ শতাংশ পায় এবং একটি আসনে জয়ী হয়।
কেন আলাদা ছাত্রী সংগঠন
চরমোনাই পীরের হাতে ১৯৮৭ সালে প্রতিষ্ঠার পর দীর্ঘ সময় ধরে ইসলামী আন্দোলনের কোনো নারী ইউনিট ছিল না। তবে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে গত বছরের ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবসে ৩৪ সদস্যের কেন্দ্রীয় মহিলা ইউনিট গঠন করে দলটি।
নারীদের নিয়ে সাংগঠনিক কার্যক্রম থাকলেও আগে আলাদা সংগঠন করার চিন্তা ছিল না। তবে পরিবর্তিত বাস্তবতায় নারী শিক্ষার্থীদের জন্য পৃথক প্ল্যাটফর্ম তৈরির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।গাজী আতাউর রহমান, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব ও মুখপাত্র, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ
দলীয় পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, প্রচলিত মহিলা ইউনিটের মাধ্যমে নারী শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রত্যাশিত মাত্রায় সাংগঠনিক কার্যক্রম বিস্তৃত করা সম্ভব হচ্ছে না। প্রজন্মগত ব্যবধান ও সাংগঠনিক সীমাবদ্ধতাকেও এর কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণেও নারীদের অংশগ্রহণ ও নারী ভোটারদের উপস্থিতি বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা উঠে আসে। সেখান থেকেই আলাদা ছাত্রী সংগঠনের ধারণা সামনে আসে।
দলীয় সূত্রগুলো বলছে, সংগঠনটির কাঠামো, নেতৃত্ব নির্বাচন ও কার্যক্রম নিয়ে ইতিমধ্যে ভেতরে আলোচনা শুরু হয়েছে। সম্প্রতি কেন্দ্রীয় মাসিক সভায় এ বিষয়ে প্রাথমিক আলোচনা হয়েছে। আগামী ১৮ মে অনুষ্ঠিতব্য সভায় বিস্তারিত সিদ্ধান্ত হতে পারে। ঈদুল আজহার পর সংগঠনটির আনুষ্ঠানিক আত্মপ্রকাশের পরিকল্পনা আছে।
মাঠের রাজনীতি নাকি দাওয়াহ
সূত্র জানায়, নারী শিক্ষার্থীদের সংগঠন কেমন হবে—তা নিয়ে দলের মধ্যে ‘সুস্থ তর্ক’ হয়েছে। বিশেষ করে, সংগঠনটি মাঠের রাজনীতিতে পুরুষদের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে অংশ নেবে, নাকি মূলত দাওয়াহ ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে সীমাবদ্ধ থাকবে, এসব প্রশ্ন নিয়ে আলোচনা হয়।
দলীয় পরিকল্পনা অনুযায়ী, ইসলামী ছাত্র আন্দোলনের মতোই ছাত্রী উইংও ইসলামী আন্দোলনের নিয়ন্ত্রণে একটি স্বতন্ত্র ইউনিট হিসেবে পরিচালিত হবে। আহ্বায়ক, সদস্যসচিব ও বিভাগীয় পর্যায়ের সদস্যদের নিয়ে এই সংগঠনের যাত্রা শুরু হতে পারে।
তবে শেষ পর্যন্ত দলের আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করিমের অনুমোদনের পর উদ্যোগটি এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে শীর্ষ নেতারা নীতিগতভাবে একমত হন।
দলটির নেতারা মনে করেন, ইসলামপন্থী দলগুলোকে ঘিরে নারী ইস্যুতে দীর্ঘদিন ধরে যে নেতিবাচক ধারণা রয়েছে, নতুন এই উদ্যোগের মাধ্যমে তা ভাঙার চেষ্টা করা হবে। নারী শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংগঠনের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোও তাদের অন্যতম লক্ষ্য।
নেতৃত্বে কারা আসতে পারেন
দলীয় পরিকল্পনা অনুযায়ী, ইসলামী ছাত্র আন্দোলনের মতোই ছাত্রী উইংও ইসলামী আন্দোলনের নিয়ন্ত্রণে একটি স্বতন্ত্র ইউনিট হিসেবে পরিচালিত হবে। আহ্বায়ক, সদস্যসচিব ও বিভাগীয় পর্যায়ের সদস্যদের নিয়ে এই সংগঠনের যাত্রা শুরু হতে পারে।
দলীয় সূত্রগুলো বলছে, আলেমা, চিকিৎসক ও শিক্ষকদের নেতৃত্বে আনার বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি শিক্ষার সব শাখা ও পেশা থেকেই নারী বিভাগের নেতৃত্ব বাছাইয়ের পরিকল্পনা আছে।
১৯৮৭ সালে প্রতিষ্ঠার পর দীর্ঘ সময় ধরে ইসলামী আন্দোলনের কোনো নারী ইউনিট ছিল না। তবে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে গত বছরের ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবসে ৩৪ সদস্যের কেন্দ্রীয় মহিলা ইউনিট গঠন করে দলটি।
ইসলামী আন্দোলনের নেতারা বলছেন, নারী শিক্ষার্থীদের ‘রাজনৈতিক কর্মী বাহিনী’ হিসেবে নয়, বরং জ্ঞান, দক্ষতা, দাওয়াহ, সমাজকল্যাণ ও নেটওয়ার্কভিত্তিক কার্যক্রমে সংগঠিত করার পরিকল্পনা আছে দলটির। প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও থানা শহরভিত্তিক সাংগঠনিক কাঠামো তৈরির পাশাপাশি ডিজিটাল নেটওয়ার্কিংয়েও গুরুত্ব দেওয়া হবে।
দলটির কেন্দ্রীয় নেতাদের ভাষ্য, ইসলামী আন্দোলনের সহযোগী সংগঠনগুলো রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভূমিকা রাখে। নতুন ছাত্রী সংগঠনও ভবিষ্যতে সেই ভূমিকা পালন করবে। নির্বাচনকেন্দ্রিক কার্যক্রমেও সংগঠনটির সম্পৃক্ততা থাকবে।
দলের মুখপাত্র গাজী আতাউর রহমান বলেন, ছাত্রী উইংয়ের নিজস্ব গঠনতন্ত্র, নীতিমালা ও সাংগঠনিক কার্যক্রম থাকবে। তবে এটি মূল সংগঠনের অধীনেই পরিচালিত হবে। তাঁর ভাষ্য, এই উদ্যোগ শুধু নির্বাচনকেন্দ্রিক নয়, বরং নারীদের নৈতিক, সামাজিকভাবে সক্রিয় ও সাংগঠনিকভাবে দক্ষ করে তোলার লক্ষ্যেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
রাজনীতি–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, নারী ভোটার ও তরুণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রভাব বাড়ানোর কৌশল হিসেবেই ছাত্রী উইং গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে ইসলামী আন্দোলন। তবে দেশের ক্যাম্পাস রাজনীতিতে নতুন এই সংগঠন কতটা কার্যকর প্রভাব ফেলতে পারবে, তা নির্ভর করবে মাঠপর্যায়ের বিস্তার, সাংগঠনিক সক্ষমতা এবং বাস্তব কর্মকাণ্ডের ওপর।