‘মানুষের মন বোঝা শক্ত’

দাকোপ ও বটিয়াঘাটা—এই দুই উপজেলা নিয়ে খুলনা-১ আসন। ভোটাররা এখনো নীরব ও সতর্ক।

প্রতীকী ছবি

দাকোপ খেয়াঘাট থেকে রিকশাভ্যানে বাজুয়া-দিগরাজ খেয়াঘাট পৌঁছাতে সময় লাগল প্রায় এক ঘণ্টা। মাঝে পড়ে সাহেবের আবাদ, ছিটাবুনিয়া, মাদিয়া, ধোপাদি, বাজুয়ার মতো ছোট ছোট গ্রাম। গ্রামগুলো ছবির মতো। শীতের ধান উঠানে ওঠা প্রায় শেষ। কারও উঠানে আধুনিক যন্ত্রে ধানমাড়াইয়ের দৃশ্য চোখে পড়ে। এই যন্ত্রগুলোর বিকট শব্দ ছবির মতো গ্রামের নিস্তব্ধতা যেন খান খান করে ভেঙে দিচ্ছে। কোনো কোনো মাঠে তরমুজ চাষের প্রস্তুতি চলছে। প্রায় সাত কিলোমিটার রাস্তায় আরও অনেক কিছু চোখে পড়ল। যদিও নির্বাচনী আয়োজনের তেমন কিছু চোখে পড়ল না। নির্বাচন নিয়ে মানুষের কথা জানতে এই যাত্রা ছিল গত বৃহস্পতিবার।

শুরুতে রাস্তার অবস্থা বেশ খারাপ। ২০১৭ সালে এই রাস্তার ইট দাকোপ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান চুরি করে বিক্রি করেছিলেন—এমন অভিযোগে সংবাদ ছাপা হয়েছিল প্রথম আলোতে। এখানকার নির্বাচনের খবর কী? এটা ছিল ভ্যানচালকের কাছে এই প্রতিবেদকের প্রথম প্রশ্ন।

এখানে ইলেকশনের খবর কী?’ এই প্রশ্নের পর এবার যুবক এই প্রতিবেদকের পেশা জানতে চাইলেন। জানার পর বললেন, ‘ইলেকশান এখনো জমেনি। এত আগে পরিস্থিতি ঠিক বলা যাবে না।’

নির্বাচন এলে ভোটারের কদর বাড়ে। একটি ভোটের কারণে সমাজের যেকোনো স্তরের ভোটারও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হয়ে ওঠেন। ভ্যানচালকও এখন তাঁর গুরুত্ব বুঝতে পারছেন। ভাড়ার সঙ্গে বাড়তি যুক্ত হচ্ছে মর্যাদা। অনেকটা দার্শনিকের মতো করে বললেন, ‘মানুষের মন বোঝা শক্ত।’

ভ্যানচালকের কথাও ছিল শক্ত। কিছুই বোঝা গেল না। বেশি মানুষ কোন দিকে কাত, বিএনপি-জামায়াত নাকি কমিউনিস্ট পার্টির দিকে? এমন প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সময় চালক ভ্যানটি থামালেন নাকি রাস্তার গর্তের কারণে থেমে গেল, বোঝা গেল না। উত্তরও কান অবধি পৌঁছাল না। শুধু এটুকু বোঝা গেল, কী দরকার এসব আলোচনায়, এর চেয়ে ভালো চুপ করে থাকা।

এখানে (রামপাল-মোংলা) বিএনপি আর জামায়াতের মধ্যেই লড়াইটা হবে। যে দল ভালো কথা বলবে, মানুষ সেই দলে ভোট দেবে।
ভ্যানচালক

অঞ্চলটি খুলনা-১ আসনে। দাকোপ ও বটিয়াঘাটা—এই দুই উপজেলা নিয়ে আসনটি। এই আসন দেশের মানুষের দৃষ্টি কেড়েছে মূলত জামায়াতের প্রার্থীর কারণে। জামায়াত এখানে একজন হিন্দু ব্যবসায়ীকে তাদের প্রার্থী করেছে। এই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে মূলত বিএনপি, জামায়াত ও কমিউনিস্ট পার্টির প্রার্থীর মধ্যে।

এসে পড়ল ধোপাদি গ্রাম। একজন যুবক ভ্যানে উঠলেন, গন্তব্য বাজুয়া বাজার। কী কাজ করেন? উত্তরে যুবকটি বললেন, একটি এনজিওতে কাজ করেন। এনজিওটি ক্ষুদ্রঋণ দেয় গ্রামের মানুষকে। ‘এখানে ইলেকশনের খবর কী?’ এই প্রশ্নের পর এবার যুবক এই প্রতিবেদকের পেশা জানতে চাইলেন। জানার পর বললেন, ‘ইলেকশান এখনো জমেনি। এত আগে পরিস্থিতি ঠিক বলা যাবে না।’

শুরুতে রাস্তার অবস্থা বেশ খারাপ। ২০১৭ সালে এই রাস্তার ইট দাকোপ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান চুরি করে বিক্রি করেছিলেন—এমন অভিযোগে সংবাদ ছাপা হয়েছিল প্রথম আলোতে। এখানকার নির্বাচনের খবর কী? এটা ছিল ভ্যানচালকের কাছে এই প্রতিবেদকের প্রথম প্রশ্ন।

একসময় থামে ভ্যান। খেয়াঘাট এসে গেছে। এপারে বাজুয়া বাজার, খুলনা জেলা। ওপারে দিগরাজ, বাগেরহাট জেলা। বিশাল পশুর নদের দুই পারকে এক সুতায় জুড়েছে খেয়ানৌকা। নৌকায় ভিড়, ঠেলাঠেলি। জায়গা হলো একজন কাঁকড়া ব্যবসায়ীর পাশে। কাঁকড়া নিয়ে যাচ্ছেন দিগরাজ, সেই কাঁকড়া যাবে ঢাকা, সেখান থেকে বিদেশে। অনেক কথার মধ্যে প্রশ্ন ছিল, ইলেকশন কেমন হবে? উত্তরে কাঁকড়া ব্যবসায়ী বললেন, ‘দাকোপের ভোটাররা জাঁতাকলে পড়েছে। একদিকে বিএনপি, অন্যদিকে জামায়াত। জামায়াত আবার প্রার্থী দেছে হিন্দু। এক নতুন খেলা।’

খেয়া কূলে ভেড়ে। দিগরাজ বাসস্ট্যান্ড থেকে মোংলা বন্দর, আবার ভ্যান। এবার শুরুতেই দিগরাজ কলেজের একজন শিক্ষক ভ্রমণসঙ্গী। ওই শিক্ষক মনে করেন, দেশের অবস্থা বেশি ভালো না। নির্বাচনে বিএনপির কাছে জামায়াত দাঁড়াতে পারবে না। না দাকোপ-বটিয়াঘাটায়, না রামপাল-মোংলায়। তবে ওই শিক্ষকের মতে, দাকোপ-বটিয়াঘাটায় এবার কমিউনিস্ট পার্টির কিছুটা সম্ভাবনা ছিল, ক্রমে তা ম্লান হচ্ছে।

ভিন্ন গন্তব্যে চলে যান ওই শিক্ষক। তবে ভ্যানচালক বললেন, এবার প্রথম ভোট দেবেন, নতুন দলকে ভোট দেবেন।

এরপর মোংলা শহরে একজন ভ্যানচালকের সঙ্গে এই প্রতিবেদকের কথা হয়। তিনি বলেন, এখানে (রামপাল-মোংলা) বিএনপি আর জামায়াতের মধ্যেই লড়াইটা হবে। যে দল ভালো কথা বলবে, মানুষ সেই দলে ভোট দেবে।

অনেক কথার মধ্যে প্রশ্ন ছিল, ইলেকশন কেমন হবে? উত্তরে কাঁকড়া ব্যবসায়ী বললেন, ‘দাকোপের ভোটাররা জাঁতাকলে পড়েছে। একদিকে বিএনপি, অন্যদিকে জামায়াত। জামায়াত আবার প্রার্থী দেছে হিন্দু। এক নতুন খেলা।’

সন্ধ্যায় মোংলার কাইনমারি গ্রামে একটি ছোট চায়ের দোকানে মানুষের সঙ্গে কথা হয়। অনেকটা জোর করে নির্বাচনের কথা পাড়া। দোকানিসহ মানুষ ছিলেন আটজন। আলোচনায় অংশ নিলেন দুজন। দুজনের বয়সই ষাটের ওপরে। সেন্ট পলস হাইস্কুলের প্রাক্তন ছাত্র।

দুজন আবার বন্ধু। দুজনেরই নির্বাচন নিয়ে আগ্রহ আছে। তবে নিজেদের মতামত দিতে তেমন আগ্রহী নন। ঢাকায় কী হচ্ছে, সারা দেশে কী হচ্ছে, জানতে চান তাঁরা। প্রথম আলোর কার্যালয়ে আক্রমণ কেন হলো, সে প্রশ্নও ছিল। তাঁদের একজন বললেন, রামপাল-মোংলায় বিএনপির ভোট বেশি। অন্যজন বলেন, জামায়াত গোছানো বেশি, তারা ইতিমধ্যে সব মহিলা ভোটারের কাছে পৌঁছে গেছে। ঘণ্টাখানেক এ কথা-সে কথা বলার শেষে প্রথম বন্ধু বললেন, নির্বাচন হবে না।

প্রতিবেদকের প্রশ্ন ছিল, কী আলামত দেখে আপনার মনে হলো নির্বাচন হবে না? উত্তরে তিনি বললেন, ‘ইউটিউব দেখে’।