বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের কালপর্বে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠা তোফায়েল আহমেদ চিরবিদায় নিলেন। প্রায় দেড় দশক ধরেই দলীয় রাজনীতিতে কোণঠাসা হয়ে ছিলেন তিনি; আর তাঁর মৃত্যুর সময় আওয়ামী লীগের কার্যক্রমও রয়েছে নিষিদ্ধ। অথচ এই তোফায়েল আহমেদই ডাকসুর ভিপি হয়ে ছাত্রনেতা হিসেবে বিপুল জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন গত শতকে। মাত্র ২৭ বছর বয়সে এমপি হয়েছিলেন, পেয়েছিলেন বঙ্গবন্ধুর সাহচর্য। পরে আওয়ামী লীগে ছিলেন গুরুত্বপূর্ণ নেতা। মন্ত্রীও হয়েছিলেন একাধিকবার।
দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সোমবার তোফায়েল আহমেদ ইন্তেকাল করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। তাঁর বয়স হয়েছিল ৮২ বছর। পরিবারের সদস্য ও ঘনিষ্ঠজনেরা জানান, ২০২৪ সালের শুরু থেকেই গুরুতর অসুস্থ ছিলেন তোফায়েল আহমেদ। একপর্যায়ে বাসা থেকে বের হওয়া প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। হাসপাতাল ও চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানেই জীবনের শেষ দিনগুলো কেটেছে তাঁর।
তোফায়েল আহমেদের জন্ম ১৯৪৩ সালের ২২ অক্টোবর, ভোলা সদর উপজেলার দক্ষিণ দিঘলদী ইউনিয়নের কোড়ালিয়া গ্রামে। ছাত্রজীবনেই রাজনীতিতে হাতেখড়ি নেন তিনি, যোগ দেন ছাত্রলীগে (বর্তমানে নিষিদ্ধ)। ১৯৬৯ সালে তিনি ছাত্রলীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৬৯ সালের গণ–অভ্যুত্থানের সময় তিনি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের সহসভাপতি (ভিপি)।
১৯৭০ সালের ৭ জুন তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে আওয়ামী লীগে (এখন কার্যক্রমনিষিদ্ধ) যোগ দেন। রাজনৈতিক জীবনে তিনি আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্যসহ নানা দায়িত্ব পালন করেন। সর্বশেষ তিনি ছিলেন দলের উপদেষ্টা পরিষদে। তিনি ৯ বার সংসদ সদস্য হয়েছেন। একাধিকবার মন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
এক-এগারোর সময় তোফায়েল আহমেদসহ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা আওয়ামী লীগের ভেতরে ‘সংস্কারপন্থী’ হিসেবে পরিচিতি পান। দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনার বিরাগভাজন হওয়ার পর তাঁকে সভাপতিমণ্ডলী থেকে সরিয়ে দিয়ে আলংকারিক ফোরাম উপদেষ্টা পরিষদে নেওয়া হয়। এরপর দলে আর গুরুত্ব ফিরে পাননি তিনি।
ডাকসুর ভিপি থেকে অভ্যুত্থানের নেতৃত্বে
তোফায়েল আহমেদ ১৯৬৪ সালে বিএসসি পাস করেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকাবিজ্ঞান বিভাগ থেকে এমএসসি পাস করেন। কলেজজীবনেই ছাত্রলীগের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হন তিনি। বরিশালের ব্রজমোহন কলেজে পড়া অবস্থায় সেখানকার ছাত্র সংসদের ক্রীড়া সম্পাদক এবং কলেজের হোস্টেল অশ্বিনীকুমার হলের সহসভাপতি পদে নির্বাচিত হন ১৯৬২ সালে।
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে ১৯৬৪ সালে ইকবাল হল (বর্তমানে শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) ছাত্র সংসদের ক্রীড়া সম্পাদক এবং ১৯৬৬-৬৭ সালে ইকবাল হল ছাত্র সংসদের সহসভাপতি (ভিপি) হন। বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রামের নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের ছয় দফার সঙ্গে ছাত্রদের দাবি যুক্ত করে ১১ দফা দাবিতে ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়নের দুই অংশসহ চারটি ছাত্রসংগঠন তখন সংগ্রাম পরিষদ গঠন করে আন্দোলনে নেমেছিল। ডাকসুর ভিপি হিসেবে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়কের দায়িত্ব পালন করেন তোফায়েল আহমেদ।
সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আন্দোলনের ধারাবাহিক কর্মসূচি ১৯৬৯ সালের জানুয়ারিতে গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নেয়। তোফায়েল আহমেদ হয়ে ওঠেন সেই গণ-অভ্যুত্থানের অন্যতম প্রধান নেতা। সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে তাঁর পরিচিতি।
সেই গণ-অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে পাকিস্তান সরকার ১৯৬৯ সালে শেখ মুজিবুর রহমানসহ আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার সব আসামিকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। ওই বছরই ২৩ ফেব্রুয়ারি ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ঢাকার তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে) এক জনসভার আয়োজন করেছিল। ওই জনসভা থেকে শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। আর সেই ঘোষণা দিয়েছিলেন তোফায়েল আহমেদ।
মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক থেকে বঙ্গবন্ধুর সচিব
১৯৭০ সালে আওয়ামী লীগে যোগ দেন তোফায়েল আহমেদ। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে মাত্র ২৭ বছর বয়সে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি সংগঠকের ভূমিকা নেন। ‘মুজিব বাহিনী’র অঞ্চলভিত্তিক দায়িত্বপ্রাপ্ত চার প্রধানের একজন তিনি। বরিশাল, পটুয়াখালী, খুলনা, ফরিদপুর, যশোর, কুষ্টিয়া ও পাবনা নিয়ে গঠিত মুজিব বাহিনীর পশ্চিমাঞ্চল ছিল তাঁর দায়িত্বে।
১৯৭২ সালের ১৪ জানুয়ারি প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায় তোফায়েল আহমেদকে রাজনৈতিক সচিব হিসেবে নিয়োগ দেন বঙ্গবন্ধু। ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ (বাকশাল) গঠিত হলে বাকশালের যুব সংগঠন ‘জাতীয় যুবলীগ’–এর সাধারণ সম্পাদক হন তিনি।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পরপরই তোফায়েল আহমেদকে গৃহবন্দী করা হয়। ওই বছরের সেপ্টেম্বরে গ্রেপ্তার হয়ে টানা ৩৩ মাস জেল খেটেছেন। ১৯৭৮ সালে কুষ্টিয়া কারাগারে অন্তরিণ থাকা অবস্থায় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক পদে নির্বাচিত হন তোফায়েল। যদিও পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর ‘নিষ্ক্রিয়তা’র জন্য তোফায়েল আহমেদ পরবর্তী সময়ে শেখ হাসিনার সমালোচনার মুখে পড়েন।
কারামুক্ত হয়ে আওয়ামী লীগকে সংগঠিত করার কাজে যুক্ত হন তোফায়েল আহমেদ।
১৯৯৬ সালের জুন মাসে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে প্রথমে শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পান তোফায়েল আহমেদ। পরে শুধু বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন। ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে একতরফা নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত শেখ হাসিনার সরকারে আবার বাণিজ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন তিনি।
১৯৭০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ৫৩ বছরে ৯ বার সংসদ সদস্য হন তোফায়েল আহমেদ। সর্বশেষ ২০২৪ সালের একতরফা জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও সংসদ সদস্য হয়েছিলেন তিনি। ওই বছরের আগস্টে গণ–অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর সংসদ বিলুপ্ত হলে তোফায়েল আহমেদেরও সংসদ সদস্য পদের অবসান ঘটে।
পাওয়া না–পাওয়ার হতাশা
বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর ১৯৮১ সালে বিদেশে থাকা অবস্থায় তাঁর মেয়ে শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনা এবং দলের দায়িত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে তোফায়েল আহমেদও ভূমিকা রাখেন। এর পর থেকে চার দশকের বেশি সময় ধরে দলের সভাপতি শেখ হাসিনা। দলের ভেতর আলোচনা এমনই যে সভাপতির পদ বঙ্গবন্ধু পরিবারের বাইরে যাবে না। তাই সাধারণ সম্পাদক পদ নিয়েই প্রতিযোগিতা ছিল অন্য নেতাদের মধ্যে। এই পদপ্রত্যাশীদের মধে৵ অন্যতম ছিলেন তোফায়েল আহমেদ; কিন্তু পাননি। ফলে তাঁর ভেতর একধরনের হতাশা কাজ করত, এমনটাই মনে করতেন দলের অন্য নেতারা।
তবে ১৯৯২ সালে দলের গুরুত্বপূর্ণ ফোরাম সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য হন তোফায়েল আহমেদ। এরপর টানা ১৬ বছর ছিলেন এ পদে। কিন্তু এক-এগারোর সেনা–সমর্থিত সরকারের সময় ‘সংস্কারপন্থী’ হিসেবে পরিচিত হওয়ার পর কোণঠাসা হয়ে পড়েন দলে।
এরপর ২০০৮ সালের দলীয় সম্মেলনে তোফায়েল আহমেদসহ জ্যেষ্ঠ নেতাদের বড় অংশকে নীতিনির্ধারণী পদ সভাপতিমণ্ডলী থেকে বাদ দেওয়া হয়। তাঁদের জায়গা হয় অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ উপদেষ্টা পরিষদে। এমনকি ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করলে সেই মন্ত্রিসভায় জায়গা হয়নি তোফায়েল আহমেদের। অবশ্য ২০১৩ সালে বিরোধী দলের উত্তাল আন্দোলনের মধ্যে নির্বাচনকালীন সরকারে তোফায়েল আহমেদকে মন্ত্রী করা হয়। ২০১৪ সালের একতরফা বা বিনা ভোটের নির্বাচনের পর তিনি পাঁচ বছর মন্ত্রিসভায় ছিলেন। এরপর ২০১৮ ও ২০২৪ সালে শেখ হাসিনার মন্ত্রিসভায় তোফায়েলের জায়গা হয়নি।