বাংলাদেশের নির্বাচনে ব্রিটিশ বাংলাদেশি ভোটারদের প্রভাব কতটা
ফ্লুরোসেন্ট আলোয় ঝলমল করা কাচের কাউন্টারগুলোর পেছনে রুপালি ট্রেতে পাশাপাশি রাখা রয়েছে শিঙাড়া, বিরিয়ানি ও হ্যাশ ব্রাউন। ক্যাফেটির সবুজ রঙের পোলো শার্ট পরা দুজন কর্মী দ্রুতগতিতে গ্রিল ও ক্যাশ কাউন্টারের মধ্যে যাতায়াত করছেন, দুপুরের ভিড়ে অর্ডার নিচ্ছেন, আবার ভিড় কমলে রয়েসয়ে চলছেন।
ক্যাসাব্লাঙ্কা ক্যাফের ভেতরে কৃত্রিম চামড়ার চেয়ারের ঘর্ষণের শব্দ, নিচু স্বরের কথাবার্তার সঙ্গে মিশে যায় বাইরে হোয়াইটচ্যাপেল রোডের যানবাহনের কোলাহল, মাঝেমধ্যে ভেসে আসা সাইরেনের আওয়াজও তার সঙ্গে পাল্লা দেয়।
কাজের ফাঁকে কাছের অফিসগুলো থেকে আসা কেউ কেউ মুরগির ঝোল ও ভাতের প্লেট নিয়ে তাড়াহুড়ো করে খাওয়া শেষ করছিলেন, আবার কেউ কেউ ভাজা ডিম, বিনস আর টোস্ট নিয়ে বসে গল্পে মেতে থাকেন পাশের ইস্ট লন্ডন মসজিদে নামাজে যাওয়ার আগপর্যন্ত।
ঘরের মাঝখানে পুরোনো কাঠের একটি টেবিলে বসে খালেদ নূর আদা ও মধুর চায়ের একটি লম্বা গ্লাস হাতে ধরে ছিলেন। তিনি বলেন, কয়েক মাস হলো বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচনই তাঁদের আলোচনার প্রধান বিষয়।
ব্যারিস্টার নূর একজন রাজনৈতিক বিশ্লেষকও। তিনি বলেন, ‘নির্বাচনের ঘোষণা দেওয়ার পর থেকেই এ নিয়ে মানুষের কথা আর থামছেই না।’
বহু প্রতীক্ষিত নির্বাচন
১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে ভোট। শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর এটাই প্রথম জাতীয় নির্বাচন। প্রায় দুই দশকের মধ্যে এটিই প্রথম নির্বাচন, যা প্রকৃত অর্থে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এর আগে টানা কয়েকবার নির্বাচনগুলো হয়েছিল কঠোর ছকে, বিরোধীদের বর্জন ও হাসিনার শাসনামলে দমন–পীড়নের অভিযোগের মধ্যে, যে কারণে বহু ভোটার হতাশ হয়ে ভোটকেন্দ্রেই যাননি। এতে বিদেশে বসবাসকারী বাংলাদেশিদের মধ্যেও ক্ষোভ বেড়েছে। দীর্ঘদিন ধরেই তাঁরা ভোটাধিকার থেকে কার্যত বঞ্চিত ছিলেন।
নির্বাচনের ঘোষণা দেওয়ার পর থেকেই এ নিয়ে মানুষের কথা আর থামছেই না।খালেদ নূর, যুক্তরাজ্য প্রবাসী
বাংলাদেশের রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ ও খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)—এই দুই দলের প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যেই আবর্তিত হয়েছে। শেখ হাসিনার শাসনামলে একদিকে যেমন দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে, অন্যদিকে তেমনি কর্তৃত্ববাদ ও দমন–পীড়নের অভিযোগও ক্রমেই গভীর হয়েছে।
গত এক দশকের বড় অংশজুড়ে কোণঠাসা থাকা বিএনপি এখন খালেদা জিয়ার ছেলে তারেক রহমানের নেতৃত্বে নিজেদের অবস্থান পুনরায় দৃঢ় করার চেষ্টা করছে। সমর্থকদের কাছে ১৭ বছর লন্ডনে নির্বাসনে থাকা তারেক রহমান একদলীয় আধিপত্যের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রতীক, তবে সমালোচকেরা তাঁর অতীত দণ্ডাদেশ ও দুর্নীতির অভিযোগের কথা তুলে ধরেন। গত ডিসেম্বর খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর এটিই প্রথম নির্বাচন, ফলে এই লড়াইয়ে আবেগী ও প্রতীকী গুরুত্ব আরও বেড়েছে।
পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিতে যুক্তরাজ্যে নিবন্ধিত হয়েছেন ৩২ হাজার প্রবাসী। অথচ ২০২১ সালের জনশুমারি অনুযায়ী, ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে প্রায় ৬ লাখ ৪৫ হাজার বাংলাদেশি রয়েছেন।
এদিকে নোবেলবিজয়ী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, যা হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর দায়িত্ব নিয়েছিল, নির্বাচনী রাজনীতি থেকে আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ করে।
এসব পরিবর্তনের মধ্যে বিদেশে বসবাসকারী বাংলাদেশিরাও প্রথমবারের মতো ভোটাধিকার লাভ করেছেন। নূর বলেন, ‘বছর ধরেই আমরা এই মুহূর্তের জন্য প্রচারণা চালাচ্ছিলাম। মানুষ স্বীকৃতি চেয়েছিল।’
তবে ক্যাফের পাশের টেবিলগুলোতে কিছু মানুষ এ বিষয়ে কথা বলতে অস্বীকার করেন। প্রকাশ্যে রাজনৈতিক মতামত জানানো বিষয়ে সতর্ক তাঁরা।
স্থানীয় কাউন্সিলের সাবেক সদস্য নূর বলেন, যুক্তরাজ্যে যাঁরা ভোট দিতে যোগ্য, কিন্তু স্থায়ী বা নিরাপদ অভিবাসন মর্যাদা নেই, তাঁরা এসব বিষয়ে কথা বলতে হুঁশিয়ার থাকছেন।
‘নির্বাচনের দিকে তাঁদের নজর ঠিকই রয়েছে, কিন্তু তার দিকে বেশি মনোযোগ পড়ুক, তা তাঁরা চান না,’ বলেন তিনি।
শুধু নির্বাচনেই সব বদলে যাবে, এমনটা আমি মনে করি না। বাংলাদেশে সঠিক কল্যাণব্যবস্থা নেই, শ্রমিক অধিকার নেই। এই অবস্থায় শুধু চাকরি তৈরির কথা বললে কি পরিবর্তন আসে?নার্গিস আক্তার, যুক্তরাজ্য প্রবাসী
দশকের পর দশক ধরে বিদেশে থাকা বাংলাদেশিরা দেশে বিপুল পরিমাণ রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন। তবু জাতীয় নির্বাচনে তাঁদের কোনো আনুষ্ঠানিক অংশগ্রহণ ছিল না।
অধিকারকর্মীরা যুক্তি দেখাতেন, প্রবাসীদের বাদ দেওয়া অগণতান্ত্রিক ও রাজনৈতিকভাবে পক্ষপাতদুষ্ট, বিশেষ করে যেহেতু অনেক প্রবাসী রাজনৈতিক সহিংসতা বা দমন–পীড়নের কারণে দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন।
দীর্ঘ সময় দাবি জানিয়ে আসার পর নির্বাচন কমিশন প্রবাসী ভোটারদের নিবন্ধনের আওতায় এনেছে, ফলে বিদেশে থাকা বাংলাদেশিরা এবারই প্রথম দেশের নির্বাচনে ভোট দিতে পারছেন। যুক্তরাজ্যে ৩২ হাজারের বেশি বাংলাদেশি নাগরিক ভোটার হিসেবে নিবন্ধিত হয়েছেন। বিশাল প্রবাসী জনগোষ্ঠীর আকারের তুলনায় সংখ্যাটি কম। ২০২১ সালের জনশুমারি অনুযায়ী, ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে প্রায় ৬ লাখ ৪৫ হাজার মানুষ নিজেদের বাংলাদেশি বা ব্রিটিশ বাংলাদেশি হিসেবে চিহ্নিত করেন, যার মধ্যে সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা হলো ইস্ট লন্ডন।
শুধু টাওয়ার হ্যামলেটসেই প্রায় ৩৫ শতাংশ বাসিন্দা বাংলাদেশি। এ ছাড়া নিউহ্যাম, বার্কিং ও ড্যাজেনহ্যামে বড় সংখ্যক বাংলাদেশি রয়েছে। এই অসাম্য প্রবাসী সমাজের একটি মূল দ্বন্দ্বকে প্রকাশ করে: সাংস্কৃতিক পরিচয় সর্বদা নাগরিকত্ব বা ভোট দেওয়ার যোগ্যতার সঙ্গে মিল খায় না। এই জনসংখ্যাগত বৈশিষ্ট্যগুলো বোঝায়, কেন বাংলাদেশের ঘটনা ইস্ট লন্ডনের দৈনন্দিন জীবনে এত প্রভাব ফেলে, কিন্তু এগুলো রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে না।
পোস্টাল ভোটের সীমিত প্রচার, এনআইডি কার্ড সংগ্রহ, হাইকমিশনে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে বায়োমেট্রিক নিবন্ধন, এরপর মোবাইল অ্যাপ—এই জটিলতার কারণে অনেকের ভোট দেওয়ার আগ্রহ কমে গেছে।
কিছু বিশ্লেষক মনে করেন, কাছাকাছি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনে প্রবাসী বাংলাদেশিরাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। বাংলাদেশের নির্বাচনী কর্তৃপক্ষের অনুমান, কিছু নির্বাচনী আসনে বিদেশে থাকা ভোটারদের ভোট ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে।
বাস্তবে ভোটাধিকার শুধু সেই বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য, যাঁদের জাতীয় পরিচয়পত্র আছে। অনেক ব্রিটিশ বাংলাদেশি, বিশেষ করে যাঁরা যুক্তরাজ্যে জন্মগ্রহণ করেছেন, বাংলাদেশকে গভীরভাবে নিজের সঙ্গে সংযুক্ত মনে করেন, কিন্তু নাগরিকত্ব–সংক্রান্ত কোনো কাগজপত্র তাঁদের নেই বলে তাঁরা ভোটের বাইরে থাকেন।
ব্রিটেনে ১০০ বছরের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশিদের বসবাস। তবে ব্যাপক অভিবাসন শুরু হয় কেবল ২০ শতকের মাঝামাঝি সময়ে। ১৯৫০ ও ১৯৬০-এর দশকে তখনকার পূর্ব পাকিস্তানে অর্থনৈতিক কষ্টের সঙ্গে যুক্তরাজ্যের শ্রম ঘাটতির প্রভাবে লন্ডন ও বার্মিংহাম বাংলাভাষী পুরুষদের টেনে এনেছিল। তাঁদের বেশির ভাগ এসেছিলেন সিলেট থেকে।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ আরেকটি অভিবাসনের ঢেউ আনে, কারণ মানুষ রাজনৈতিক অস্থিরতা থেকে পালিয়ে বিদেশে কাজের সন্ধান করতে চাইতে থাকে। পরে পরিবার পুনর্মিলনের ধারা শুরু হয়, যা পরবর্তী দশকগুলোতে টাওয়ার হ্যামলেটসের মতো এলাকায় নতুন প্রতিবেশ গড়ে তোলে।
এই ইতিহাসগুলো বোঝাতে সাহায্য করে কেন বাংলাদেশের ঘটনা এখানে দৈনন্দিন জীবনে এত প্রভাব ফেলে। তবে এগুলো রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে না।
নথিপত্রের জটিলতা বাড়িয়েছে অনাগ্রহ
দিনের শুরুতে হোয়াইটচ্যাপেল রোড মার্কেটে উজ্জ্বল রঙের জালাবিয়ার একটি র্যাকে দুই তরুণী পোশাক দেখছিলেন, সেলাই কতটা ভালো, তা পরখ করছিলেন তারা। নির্বাচন নিয়ে জানতে চাইলে একজন বললেন, বয়স্ক আত্মীয়দের এ নিয়ে কথা বলতে শুনেছেন, কিন্তু তিনি আগ্রহ পাচ্ছেন না।
‘এতে আমাদের কী আসে যায়? আমরা তো এখানেই থাকি,’ বলেন তিনি। তাঁর মতে, ব্রিটেনের রাজনীতিই তাঁদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে লেবার পার্টির সংকট ও রিফর্ম পার্টির উত্থান।
নূর জানান, তরুণ ব্রিটিশ বাংলাদেশিদের মধ্যে এমন অনাগ্রহ খুবই সাধারণ। বছরের পর বছর বিতর্কিত নির্বাচন অনেককে আশাবাদী করার পাশাপাশি সতর্কও করে তুলেছে। পাশাপাশি নানা বাস্তব জটিলতায় অনেকেই ভোট দিতে আগ্রহ হারিয়েছেন।
নূর বলেন, ‘ভোট দিতে হলে জাতীয় পরিচয়পত্র, বায়োমেট্রিকস, এরপর মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে আরেক ধাপ ডিজিটাল প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়। অনেকের জন্য, বিশেষ করে বয়স্ক ভোটারদের জন্য এটা বেশ জটিল।’
যুক্তরাজ্যের বাইরে চিত্র ভিন্ন। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, উপসাগরীয় দেশগুলোতে অংশগ্রহণ অনেক বেশি। সৌদি আরবে নিবন্ধিত হয়েছে ২ লাখ ৩৯ হাজারের বেশি, আর কাতারে প্রায় ৭৬ হাজার। সেখানে যুক্তরাজ্যে ৩২ হাজার।
টাওয়ার হ্যামলেটসে নিজের অফিসে ফিরে নূর বলেন, এই পার্থক্য বাস্তব অবস্থার প্রতিফলন। উপসাগরীয় দেশগুলোতে প্রবাসীরা সাধারণত অবিবাহিত পুরুষ, যাঁদের পরিবার দেশে থাকে এবং যাঁদের রাজনৈতিক ও সামাজিক অধিকার সীমিত। ফলে স্বাভাবিকভাবকেই বাংলাদেশের সঙ্গে তাঁদের সম্পর্ক থাকে। বিপরীতে যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত অনেক বাংলাদেশি পরিবার, কর্মজীবন ও সন্তানদের নিয়ে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। তাঁদের দৈনন্দিন উদ্বেগ মূলত এখানকার জীবন ঘিরেই।
পূর্ব লন্ডনের নানা কথোপকথনে এই বিভাজন স্পষ্ট। একদিকে দেশের ঘটনাপ্রবাহে আগ্রহী বয়স্করা, অন্যদিকে যুক্তরাজ্যে বেড়ে ওঠা তরুণ প্রজন্ম।
অনেকে জানান, তাঁরা ভোটার হিসেবে নিবন্ধিত হয়েছেন। এদের অনেকেই কয়েক দশক আগে ব্রিটেনে এসেছেন এবং এখনো বাংলাদেশি পাসপোর্ট ধরে রেখেছেন। তাঁদের কাছে নির্বাচন মানে স্মৃতির ভার—মুক্তিযুদ্ধ, সামরিক শাসনের বছরগুলো, আর সেই নির্বাচনগুলো, যা কখনো ছিল ভয়ংকর, কখনো অর্থহীন।
মসজিদের কাছে একটি রাস্তায় একটি দোকানের ওপরে সরু, জীর্ণ সিঁড়ি বেয়ে উঠলে ‘বাংলা সংলাপ’ নামে একটি দ্বিভাষিক সাপ্তাহিক পত্রিকার ছোট অফিস। সম্পাদক মোশাহিদ আলী পাঠকদের পাঠানো বার্তা স্ক্রল করছিলেন। তিনি বলেন, ‘মানুষ ভোটাধিকার পেয়ে উচ্ছ্বসিত।’ ‘কিন্তু পুরো প্রক্রিয়াটাই অস্পষ্ট ও জটিল,’ যোগ করেন তিনি।
অনেকে কর্তৃপক্ষের সীমিত প্রচারের অভিযোগ করেছেন। আবার এনআইডি কার্ড, হাইকমিশনে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে বায়োমেট্রিক নিবন্ধন, এরপর মোবাইল অ্যাপ—এই একের পর এক জটিলতায় অনেকের আগ্রহ কমে গেছে।
কেউ কেউ ডাকযোগে ভোট দেওয়ার বিষয়টি জানতেই দেরি করেছেন। একজন জানান, শেষ সময়ের কয়েক দিন আগে এনআইডির জন্য আবেদন করেছিলেন, কিন্তু নিবন্ধন বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর তাঁর কার্ড এসে পৌঁছায়।
প্রযুক্তিগত জটিলতাও বয়স্কদের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ‘সবকিছু এখন অ্যাপে, কোথাও সমস্যা হলে কাকে জিজ্ঞেস করব?’ বলেন প্রবীণ এক ব্যক্তি।
৪৪ বছর বয়সী কমিউনিটি স্বেচ্ছাসেবক চিকিৎসক মিজানুর খান বলেন, তিনি ভোট দিতে চেয়েছিলেন, কিন্তু সময়মতো নিবন্ধন করতে পারেননি। এখন বাংলাদেশে গিয়ে সরাসরি ভোট দেওয়ার কথা ভাবছেন।
সচেতনতামূলক কর্মসূচি যথেষ্ট ছিল না বলে মিজানুর খানের মূল্যায়ন। সেই সঙ্গে বলেন, ‘তবে আসল বিষয় হলো সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন। ওটা যদি করতে পারে, তাহলে বাংলাদেশের একটা সুযোগ আছে।’
এ বিষয়ে লন্ডনে বাংলাদেশ হাইকমিশনে যোগাযোগ করা হলেও তাঁরা কোনো মন্তব্য করেননি।
সব যোগ্য ভোটারই যে ভোট দিয়েছেন, তা নয়। হোয়াইটচ্যাপেল মার্কেটের একটি বৈদ্যুতিক পণ্যের দোকানে ২৩ বছর বয়সী ছাত্র রাদওয়ান আহমেদ জানান, তাঁর এনআইডি থাকলেও তিনি নির্বাচন বর্জন করেছেন। তাঁর মতে, আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা ভোটের বৈধতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
আবার চল্লিশের কোঠায় থাকা এক ব্যক্তি বলেন, নির্বাচন অনেক আগেই হওয়া উচিত ছিল। তাঁর মতে, বাংলাদেশ বহুদিন ধরে দুটি দল আর পরিবার দ্বারা শাসিত হচ্ছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এই ব্যক্তি বলেন, ‘এখন যদি পরিবর্তন না আসে, তাহলে আর কখন আসবে?’
বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে এবারই প্রথম জামায়াতে ইসলামী শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। তারা শেখ হাসিনাবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ছাত্রনেতাদের গড়া জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সঙ্গে জোট গড়েছে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে ব্রিটেনের গুরুত্ব স্পষ্ট দুই শিবিরের প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বদের উপস্থিতিতে। তারেক রহমানের দীর্ঘদিনের লন্ডনবাস অনেকের কাছে ক্ষোভেরও কারণ। তাঁর যুক্তরাজ্যে অবস্থান তাঁকে মানুষের আস্থা এনে দেয়নি বলে মন্তব্য করেন অনেকে।
অন্যদিকে যুক্তরাজ্যে আওয়ামী লীগের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি রয়েছেন, তাঁদের মধ্যে লেবার এমপি ও শেখ হাসিনার ভাতিজি টিউলিপ সিদ্দিক অন্যতম। সম্প্রতি বাংলাদেশি আদালত তাঁকে দুই বছরের কারাদণ্ড ও এক লাখ টাকা জরিমানা করেন, যা যুক্তরাজ্যভিত্তিক আইনজীবী ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে সমালোচনা করেছে।
এ ছাড়া টাওয়ার হ্যামলেটসের কাউন্সিলর সাবিনা খান ও ওহিদ আহমেদসহ কয়েকজন ব্রিটিশ-বাংলাদেশি রাজনীতিবিদও বাংলাদেশে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে নেমেছিলেন, যা বিতর্ক তৈরি করেছে।
এক নারী প্রশ্ন তোলেন, ‘ওরা এত বছর এখানে থেকে বাংলাদেশের রাজনীতি কতটা বোঝে?’
তবে আল–জাজিরার সঙ্গে কথা বলা অধিকাংশ মানুষের কাছেই চাকরি, পরিবার, নিরাপত্তা আর ব্রিটেনে দৈনন্দিন জীবন বাংলাদেশের উচ্চপর্যায়ের রাজনীতির চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
মিশ্র প্রতিক্রিয়া
কয়েক মাইল দূরে, আইল অব ডগসের বাংলাদেশি অ্যাসোসিয়েশন ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে চায়ের আড্ডায় বসে থাকা মানুষদের কথায়ও সেই দ্বিধা ফুটে ওঠে।
জরুরি সেবায় কর্মরত ৪৪ বছর বয়সী মুহাম্মদ সাইফুল মিয়া বলেন, তাঁর এনআইডি না থাকায় তিনি ভোট দিতে পারেননি, তবে নির্বাচনের খবরাখবর তিনি রাখছেন। তিনি বলেন, ‘নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ, কারণ আমার পরিবার সেখানেই।’
৫৮ বছর বয়সী জাহানারা বেগম বলেন, তিনি ডাকযোগে ভোট দিয়ে খুব খুশি। তিন বছর আগে ব্রিটেনে আসা সাবেক এই শিক্ষক বলেন, বহু বছর পর তাঁর মনে হয়েছে ভোটের কোনো অর্থ আছে।
‘আমার চার সন্তান সেখানে, আমি শান্তি চাই, ওদের নিরাপত্তা চাই,’ বলেন জাহানারা।
তবে জাহানারার বান্ধবী রোমিনা খাতুনের মেয়ে নার্গিস আখতার ভোট দেননি। লন্ডনে বড় হওয়া নার্গিসের মতে, ‘শুধু নির্বাচনেই সব বদলে যাবে, এমনটা আমি মনে করি না। বাংলাদেশে সঠিক কল্যাণব্যবস্থা নেই, শ্রমিক অধিকার নেই। এই অবস্থায় শুধু চাকরি তৈরির কথা বললে কি পরিবর্তন আসে?’