জকসুতে শিবিরের জয়ের চার কারণ

  • এর আগে ডাকসু, জাকসু, রাকসু ও চাকসু নির্বাচনের প্রভাব জকসুতে পড়েছে।

  • ছাত্রশিবির প্যানেলের জয়ের পেছনে অন্যতম কারণ কৌশলী প্যানেল গঠন।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ছবি: বিশ্ববিদ্যালয়ের ফেসবুক

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জকসু) নির্বাচনেও জয় পেল ইসলামী ছাত্রশিবির। সহসভাপতি (ভিপি), সাধারণ সম্পাদক (জিএস), সহসাধারণ সম্পাদকসহ (এজিএস) ২১টি পদের মধ্যে ১৬টিতেই জয় পেয়েছেন ছাত্রসংগঠনটির সমর্থিত ‘অদম্য জবিয়ান ঐক্য’ প্যানেলের প্রার্থীরা।

এর আগে গত বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ চারটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ও হল সংসদের বেশির ভাগ পদে বিজয়ী হয়েছিলেন ছাত্রশিবিরের প্যানেলের প্রার্থীরা।

ছাত্রশিবিরের নেতা–কর্মী ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ছাত্রশিবিরের এই জয়ের পেছনে অন্তত চারটি বিষয় কাজ করেছে।

অনেকে মনে করছেন, এর আগে ডাকসু (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ), জাকসু (জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ), রাকসু (রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ) ও চাকসুর (চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ) ছাত্র ও হল সংসদ নির্বাচনে সাধারণ শিক্ষার্থীরা যেভাবে প্যানেলভিত্তিক ভোট দিয়েছেন, তার প্রভাব জকসুতে পড়েছে।

ছাত্রদলের ভেতরে বিভাজন রয়েছে। বাম-সমর্থিত জোটের প্রার্থীরা সাড়া পাননি। জাতীয় ছাত্রশক্তি–সমর্থিত প্যানেল ভোট টানতে ব্যর্থ হয়েছে।
আরও পড়ুন
ইসলামী ছাত্রশিবির-সমর্থিত ‘অদম্য জবিয়ান ঐক্য’ প্যানেল থেকে ভিপি নির্বাচিত রিয়াজুল ইসলাম (মাঝে), জিএস নির্বাচিত আবদুল আলীম আরিফ (বাঁয়ে) ও এজিএস নির্বাচিত মাসুদ রানা (ডানে)। বুধবার দিবাগত রাত ১টায় জকসু নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর
ছবি: দীপু মালাকার

আরেক অংশের ভাষ্য, নিয়মিত সাংগঠনিক সভা, পাঠচক্র এবং শিক্ষার্থীদের একাডেমিক ও ব্যক্তিগত সমস্যা নিয়ে কাজ করার মধ্য দিয়ে শিবির একটি ডেডিকেটেড বা নিশ্চিত ভোটব্যাংক গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন শিক্ষার্থী প্রথম আলোকে বলেন, ‘সব শিক্ষার্থীকে সমান গুরুত্ব দিয়ে ভোট চাওয়ার কারণে ক্যাম্পাসে একটি ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি হয়েছে।’

বিজয়ী প্রার্থীদের কারও কারও মতে, ছাত্রশিবির প্যানেলের জয়ের পেছনে অন্যতম কারণ কৌশলী প্যানেল গঠন। প্যানেলে ইনকিলাব মঞ্চ ও আপ বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্ত শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি জুলাই আন্দোলনের পরিচিত মুখদের জায়গা দেওয়া হয়েছে।

আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক পদে জয়ী নওশীন নাওয়ার জয়া জুলাই আন্দোলনের সময় সক্রিয় ছিলেন। তিনি মনে করেন, সরাসরি শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত নন—এমন স্বতন্ত্র প্রার্থী এবং জুলাই আন্দোলনের পরিচিত মুখদের অন্তর্ভুক্তি শিক্ষার্থীদের কাছে শিবিরের গ্রহণযোগ্যতা বাড়িয়েছে। এ ছাড়া একাডেমিক পরিবেশ উন্নয়ন এবং বিভিন্ন সামাজিক ও মানবিক কাজে সক্রিয় থাকা বিশেষ করে নারী ভোটারদের মধ্যে বড় প্রভাব ফেলেছে।

আরও পড়ুন
জকসু নির্বাচনের ফলাফল কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণকক্ষ থেকে ঘোষণা করা হয়
ছবি: প্রথম আলো

বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বিজয়ী প্রার্থীদের প্রায় সবাই জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিলেন। ভিপি পদে ৫ হাজার ৫৫৮ ভোট পেয়ে জয় পেয়েছেন রিয়াজুল ইসলাম। এ পদে তাঁর সঙ্গে ছাত্রদল ও ছাত্র অধিকার পরিষদ–সমর্থিত প্যানেলের এ কে এম রাকিবের হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হয়েছে। রাকিব ভোট পেয়েছেন ৪ হাজার ৬৮৮টি। অবশ্য তিনিও জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের পরিচিত মুখ।

জিএস পদে শিবির–সমর্থিত প্যানেলের আবদুল আলিম আরিফ ভোট পেয়েছেন ৫ হাজার ৪৭৫টি। তিনিও জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে সক্রিয় ছিলেন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছাত্রদল–ছাত্র অধিকার সমর্থিত প্যানেলের খাদিজাতুল কুবরা। তিনি বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট মামলায় কারাবন্দী ছিলেন। তবে আলিমের অর্ধেকের কম ভোট পেয়েছেন তিনি।

এজিএস পদে জয়ী মাসুদ রানা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ ও গণতন্ত্র সম্পাদক পদে জয়ী নুরনবী জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের সময় গুমের শিকার হয়েছিলেন।

আরও পড়ুন

‘গ্রুপিংয়ে’ হারল ছাত্রদল

সাধারণ শিক্ষার্থী ও ছাত্রদলের নেতা–কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ছাত্রদলের ভেতরে দীর্ঘদিন ধরেই সক্রিয় ও নিষ্ক্রিয় অংশের বিভাজন রয়েছে। গ্রুপভিত্তিক সাংগঠনিক শক্তি ও নির্বাচনী সমন্বয়ের ঘাটতির কারণে শেষ মুহূর্তে ছাত্র অধিকার পরিষদের সঙ্গে জোট করতে বাধ্য হয় ছাত্রদল। সে ক্ষেত্রে ভিপির মতো গুরুত্বপূর্ণ পদ জোটসঙ্গীদের ছেড়ে দিতে হয়।

অন্যদিকে জিএস পদে খাদিজাতুল কুবরাকে মনোনয়ন দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েও দলের ভেতরে প্রশ্ন ওঠে। প্যানেল ঘোষণার ঠিক আগে তাঁকে দলে পদ দেওয়ায় এবং দীর্ঘদিন রাজনীতি করা ত্যাগী নেতাদের বাদ দিয়ে তাঁকে মনোনয়ন দেওয়ায় অনেক নেতা–কর্মী মনঃক্ষুণ্ণ হন বলে জানান সংগঠনের একাধিক নেতা।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
ছবি: বিশ্ববিদ্যালয়ের ফেসবুক

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের একজন যুগ্ম আহ্বায়ক প্রথম আলোকে বলেন, ‘দলের অভ্যন্তরীণ বিভাজনই এই হারের বড় কারণ। নিজ গ্রুপের প্রার্থী না থাকলে দলীয় প্রার্থীকে ভোট না দেওয়ার প্রবণতা দেখা গেছে। দীর্ঘদিন আন্দোলন–সংগ্রামে যুক্ত শিক্ষার্থীদের বাদ দেওয়ায় যোগ্য প্রার্থী নির্বাচিত হয়নি।’

অন্যদিকে বাম–সমর্থিত জোটের প্যানেলে জিএস পদে ইভান তাহসিভ ছাড়া অন্য প্রার্থীরা উল্লেখযোগ্য সাড়া পাননি। জাতীয় ছাত্রশক্তি সমর্থিত প্যানেলও শিক্ষার্থীদের ভোট টানতে ব্যর্থ হয়েছে।