‘একজন বাবা অথবা মা সব ধরনের সুযোগ-সুবিধার আগে যেটা চায়, সেটা হলো তার সন্তানের হত্যার বিচার। দৃশ্যমান বিচার ছাড়া কোনোভাবেই ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার বিলুপ্তি সম্ভব নয়।’ আজ মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে এ কথা বলেন সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য রোকেয়া বেগম।
রোকেয়া বেগম বলেন, জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের শহীদ পরিবারগুলোর প্রধান দাবি হলো প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত করা এবং বিচারপ্রক্রিয়ার অগ্রগতি নিয়মিতভাবে সংসদে জানানো।
বক্তব্যের শুরুতে নিজের ছেলে জাবির ইব্রাহিমের স্মৃতিচারণা করে রোকেয়া বেগম বলেন, ‘৫ আগস্ট আমার ছোট্ট জাবির ইব্রাহিম গুলিবিদ্ধ হয় এবং অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে শাহাদাত বরণ করে। আমি যখন ওকে দেখছিলাম, তখন দেখছিলাম ও সাদা ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। একটা ফোঁটা রক্তও ওর ভেতরে ছিল না। পুরো রক্ত এই জমিনে পড়ে গিয়েছিল।’
এই সংসদ সদস্য বলেন, ‘আমার ছেলের মতো অসংখ্য শহীদের রক্ত ও বীর সন্তানের অঙ্গহানির আর্তনাদে ভাসছে এই জাতীয় সংসদ। দীর্ঘ ১৭ বছর পর নানা জুলুম-নির্যাতনের পর এই রক্তস্নাত জাতীয় সংসদে আবার বাজেট আলোচনা চলছে। জুলাই না এলে এটা সম্ভব হতো না।’
রোকেয়া বেগম বলেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে জুলাই শহীদ পরিবারের জন্য মাসিক ভাতা, আহত যোদ্ধাদের জন্য শ্রেণিভিত্তিক ভাতা এবং আবাসন সহায়তায় ৩০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। তবে বিচার নিশ্চিত করাই শহীদ পরিবারের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা।
সংসদে রোকেয়া বেগম তুলে ধরেন, ২১ জুন প্রশ্নোত্তর পর্বে আইনমন্ত্রী জানিয়েছিলেন যে জুলাইয়ের মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ৮০টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ৭টির রায় হয়েছে, ২২টির সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়েছে।
রোকেয়া বেগম বলেন, প্রায় দুই বছরে সাতটি মামলার রায় হয়েছে। এ থেকেই বোঝা যায় বিচারপ্রক্রিয়া কতটা ধীরগতির। তিনি আরও বলেন, এসব মামলায় মোট আসামির সংখ্যা ৪৬৩। এর মধ্যে ১৭৪ জন গ্রেপ্তার হলেও ২৮৮ জন এখনো পলাতক।
এই ২৮৮ জনকে গ্রেপ্তারের অগ্রগতি কী—এমন প্রশ্ন তুলে স্পিকারের মাধ্যমে আইনমন্ত্রীর কাছে প্রতি অধিবেশনে শহীদদের বিচারিক কার্যক্রমের হালনাগাদ তথ্য সংসদে উপস্থাপনের দাবি জানান রোকেয়া বেগম।
জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের শহীদদের স্বীকৃতির বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন জুলাই শহীদের এই মা। তিনি বলেন, ‘জুলাই বিপ্লবের শহীদের সংখ্যা হাজারের বেশি ছিল। কিন্তু আমরা এখন পর্যন্ত গেজেটভুক্ত করতে পেরেছি মাত্র ৮৩৪ জনকে। আরও প্রায় ৫০ জন শহীদের নাম এখনো তালিকাভুক্ত হয়নি।’ সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে বাকি শহীদ ও আহত যোদ্ধাদের গেজেটভুক্ত করার জন্য প্রয়োজনীয় বরাদ্দ রাখারও আহ্বান জানান তিনি।
আহত জুলাই যোদ্ধাদের শ্রেণিবিন্যাস নিয়েও প্রশ্ন তোলেন রোকেয়া বেগম। তিনি বলেন, ‘যে আন্দোলনে একজন যোদ্ধার হাত চলে গেছে, সে কীভাবে “গ” ক্যাটাগরিতে থাকতে পারে?’ এ বিষয়ে সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানান তিনি। এই সংসদ সদস্য বলেন, বর্তমানে ৮৩৪ জন শহীদ ও ১৪ হাজার ৪০৭ জন আহত যোদ্ধা স্বীকৃত। এই সংখ্যাগুলো শুধু পরিসংখ্যান নয়, প্রতিটির পেছনে আছে একটি বিপর্যস্ত পরিবার।
জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের কার্যক্রমের প্রশংসা করে জাবির ইব্রাহিমের মা বলেন, প্রতিষ্ঠানটি এ পর্যন্ত ৮৩১টি শহীদ পরিবার ও ৬২৭ জন আহত যোদ্ধাকে ১২০ কোটি টাকা সহায়তা দিয়েছে এবং একটি আন্তর্জাতিক অডিট প্রতিবেদনে এর স্বচ্ছতা প্রমাণিত হয়েছে। তবে তিন মাস ধরে ফাউন্ডেশনের কর্মীরা বেতন ও ঈদ বোনাস পাননি বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
এ সময় রোকেয়া বেগম সংসদে তিনটি দাবি তুলে ধরেন—ফাউন্ডেশনের জন্য পৃথক আর্থিক কোডের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ নিশ্চিত করা, শহীদ পরিবার ও আহত যোদ্ধাদের জন্য সরকারের প্রতিশ্রুত অবশিষ্ট ২৬৩ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া এবং মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় অথবা সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে ফাউন্ডেশনটিকে আনুষ্ঠানিক সহযোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বাস্তব জীবনে জুলাই যোদ্ধাদের বিরুদ্ধে হুমকি, নির্যাতন এবং স্মৃতিস্তম্ভে হামলার অভিযোগ তুলে রোকেয়া বেগম বলেন, ‘জুলাইকে মুছে ফেলতে পলাতক ফ্যাসিস্টের বাহিনী বাস্তবে ও সামাজিক মাধ্যমে অতিমাত্রায় তৎপর।’ এ কারণে তিনি জুলাই যোদ্ধাদের জন্য রাজনৈতিক সুরক্ষার বিষয়ে আইনমন্ত্রীর সুস্পষ্ট অবস্থান জানতে চান।
আইনি সুরক্ষাই রাজনৈতিক সুরক্ষা: আইনমন্ত্রী
রোকেয়া বেগমের বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে সংসদে ৩০০ বিধিতে বিবৃতি দেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। তিনি বলেন, ‘যিনি শহীদ মাতা বক্তৃতা দিয়েছেন, তাঁর প্রতিটি বক্তব্যই আমাদের চেতনায়, আমাদের রক্তে, আমাদের বিপ্লবে, আমাদের সংগ্রামের প্রেরণার মূল চেতনা।’
জুলাই যোদ্ধাদের আইনি ও রাজনৈতিক সুরক্ষার প্রসঙ্গে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘প্রতিটি আইন একটি রাজনৈতিক দলিল। প্রতিটি আইন সরকারের একটি পাবলিক পলিসি। সরকারের পক্ষ থেকে যে সুরক্ষা দেওয়া সম্ভব, সেটা আইনি কাঠামোর মধ্যেই সম্ভব।’
আইনমন্ত্রী আরও বলেন, ‘আমার সরকার, আমাদের সরকার, বিএনপির সরকার, জুলাই যোদ্ধাদের সরকার, জুলাই চেতনার সরকার সেই আইনি কাঠামোর মধ্যেই জুলাই যোদ্ধাদের সুরক্ষা দিয়েছে এবং সেটাই রাজনৈতিক সুরক্ষা হিসেবে বিবেচিত হবে।’
আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান আরও বলেন, ‘এর বাইরে যদি কোনো রাজনৈতিক সুরক্ষার প্রয়োজন হয়, তিনি যদি সুনির্দিষ্টভাবে বলেন, সেটাও আমরা আইনি কাঠামোর মধ্যে এনে সেই সুরক্ষা দিতে প্রস্তুত আছি।’