জনস্বার্থ তোয়াক্কা না করে এভাবে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি সরকারের দেউলিয়াত্বের বহিঃপ্রকাশ: এবি পার্টি
আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেছেন, বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, পরিবহন ও আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির বাস্তবতা রয়েছে। তবে সেই চাপ একসঙ্গে জনগণের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার পরিবর্তে ধাপে ধাপে, ভারসাম্যপূর্ণভাবে মূল্য সমন্বয় করা যেত। কিন্তু জনস্বার্থের তোয়াক্কা না করে ৭ মাসে তিনবার জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি সরকারের দেউলিয়াত্বের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে।
‘জ্বালানি তেলের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি: জনস্বার্থ ও অর্থনীতির ওপর প্রভাব’ শীর্ষক এক সংবাদ সম্মেলনে দলটির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান এ কথা বলেন। আজ বৃহস্পতিবার রাজধানীর বিজয়নগরে এবি পার্টির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এ সংবাদ সম্মেলন করা হয়। এবি পার্টির সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
মজিবুর রহমান বলেন, সরকার ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রল ও অকটেনের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়িয়েছে। এর মধ্যে ডিজেলের দাম ১১৫ থেকে ১৩৫ টাকা করা হয়েছে। কৃষি, সেচ, গণপরিবহন ও পণ্য পরিবহনে ডিজেলের ব্যবহার বেশি। তাই এই মূল্যবৃদ্ধির বহুমাত্রিক প্রভাব পড়বে কৃষক, শ্রমিক, পরিবহন খাত ও সাধারণ ভোক্তার ওপর। আন্তর্জাতিক বাজারের বাস্তবতা সরকারকে মোকাবিলা করতে হবে। কিন্তু সেই চাপ একবারে জনগণের ওপর চাপিয়ে দিতে হবে, এমন কোনো নীতি নেই। হঠাৎ করে দাম বাড়ানো নয়; বরং দরকার পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ধীরে ধীরে দাম সমন্বয় করা।
ডিজেলের দাম বাড়ায় সেচপাম্প, পাওয়ার টিলার, হারভেস্টারসহ অন্যান্য কৃষিযন্ত্রের পরিচালন ব্যয় বাড়বে বলে মন্তব্য করেন এবি পার্টির চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, ফলে কৃষিপণ্যের উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয়ও বাড়তে পারে। সামনে বোরো মৌসুম হওয়ায় এর প্রভাব আরও গুরুত্বপূর্ণ। আগস্টে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ ছিল। জাতীয় মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ। এমন পরিস্থিতিতে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতার ওপর আরও চাপ তৈরি করবে।
মজিবুর রহমান বলেন, জ্বালানির দাম বাড়লে বাস ও পণ্যবাহী যানবাহনের পরিচালন ব্যয় বাড়ে। এর প্রভাব পরিবহন ব্যয় থেকে পাইকারি–খুচরা বাজারে গিয়ে শেষ পর্যন্ত সাধারণ ভোক্তার ওপর পড়ে। শুধু প্রতি লিটারে ২০ টাকা বাড়ানো হয়েছে, এভাবে দেখলে বাস্তব অর্থনীতির পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না। জ্বালানির দাম বাড়ে, পরিবহন খরচ বাড়ে, এরপর পণ্যের দাম বাড়ে।
জ্বালানির প্রভাব নিয়ে মূল বক্তব্যে দলটির ছায়া সরকারবিষয়ক সম্পাদক আব্বাস ইসলাম খান নোমান বলেন, সরকার জানিয়েছে, মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত ছয় মাসে বেশি দামে জ্বালানি কিনে কম দামে বিক্রি করায় বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) প্রায় ২২ হাজার ৮৭৬ কোটি টাকা লোকসান করেছে। এই চাপ বাস্তব হলেও আন্তর্জাতিক বাজারদর, ফ্রেইট, ইনস্যুরেন্স, এক্সচেঞ্জ রেট, ট্যাক্স, হ্যান্ডেলিং, ডিস্ট্রিবিউশন কস্ট ও বিপিসির প্রকৃত ব্যয়ের পূর্ণাঙ্গ হিসাব জনগণের সামনে প্রকাশ করা প্রয়োজন।
সংকটকালে আমদানি শুল্ক ও কর সাময়িকভাবে সমন্বয়, বিপিসির দক্ষতা বৃদ্ধি, অপচয় ও জ্বালানি চুরি বন্ধের বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়া উচিত বলে মত দেন আব্বাস ইসলাম খান।
এ পরিস্থিতিতে সরকারের প্রতি ১১টি দাবি জানিয়েছে এবি পার্টি। এর মধ্যে রয়েছে কৃষি, সেচ, গণপরিবহন ও পণ্য পরিবহনে ব্যবহৃত ডিজেলের ওপর চাপ কমাতে পৃথক মূল্যনীতি গ্রহণ। একবারে বড় মূল্যবৃদ্ধির পরিবর্তে ধাপে ধাপে মূল্য সমন্বয়। আন্তর্জাতিক বাজার, ফ্রেইট, এক্সচেঞ্জ রেট, ইমপোর্ট কস্ট ও করের ভিত্তিতে স্বচ্ছ ও ফর্মুলা-বেজড প্রাইসিং মেকানিজম কার্যকর করা। দাম কমলে তার সুফল জনগণকে দেওয়া। সংকটকালে আমদানি শুল্ক ও কর সাময়িকভাবে সমন্বয়ের বিষয় বিবেচনা। প্রকৃত কৃষক ও কৃষিযন্ত্রের জন্য টার্গেটেড ডিজেল সাপোর্ট চালু করা।
দলটির দাবির মধ্যে আরও রয়েছে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির সুযোগে অযৌক্তিক পরিবহন ভাড়া বৃদ্ধি ঠেকাতে কার্যকর ভাড়া সমন্বয় ব্যবস্থা। বিপিসির আমদানি, সংরক্ষণ, পরিবহন, বিতরণ, প্রকিউরমেন্ট, সিস্টেম লস ও জ্বালানি চুরির ওপর স্বাধীন পূর্ণাঙ্গ অডিট। সীমান্তপথে জ্বালানি পাচার বন্ধে ডিজিটাল ট্র্যাকিং ও চোরাচালান সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা। সংকট মোকাবিলায় স্ট্র্যাটেজিক ফুয়েল ইমার্জেন্সি ফান্ড গঠন। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির অডিট ও সমন্বয়ের মাধ্যমে নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা। দীর্ঘ মেয়াদে দেশীয় জ্বালানি অনুসন্ধান, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও জ্বালানি দক্ষতায় বিনিয়োগ বাড়ানো।
সংবাদ সম্মেলনে দলের নেতাদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন যোবায়ের আহমেদ ভূইয়া, আবদুল্লাহ আল মামুন রানা, মো. আলতাফ হোসাইন, শাহাদাতুল্লাহ টুটুল, আবদুল হালিম খোকন ও সেলিম খান।