স্পিকার ও রাষ্ট্রপতি পদে কারা, বিএনপিতে আলোচনা
বর্তমান রাষ্ট্রপতির মেয়াদ এখনো রয়ে গেছে। নতুন রাষ্ট্রপতি হিসেবে বেশি আলোচনা খন্দকার মোশাররফকে নিয়ে।
স্পিকার পদে আলোচনায় ওসমান ফারুক, হাফিজ উদ্দিন আহমদ ও জয়নুল আবেদীনের নাম।
সংসদ উপনেতার বিষয়টি এখনো স্পষ্ট নয়। সংবিধানে এর বিধান না থাকলেও অতীতে উপনেতা করা হয়েছে।
তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপির নতুন সরকারের বয়স ১৫ দিন পার হলো। বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি সিদ্ধান্ত—রাষ্ট্রপতি ও জাতীয় সংসদের স্পিকার পদে কে আসছেন। এ নিয়ে দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নানা আলোচনা-পর্যালোচনা চলছে।
দলীয় একাধিক সূত্র জানিয়েছে, রাষ্ট্র ও সংসদের শীর্ষ পদগুলোতে অভিজ্ঞ ও রাজনৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য মুখ বসাতে চাইছে দলটি। বিএনপির ভেতরে আলোচনা রয়েছে কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবীর নাম।
রাষ্ট্রপতি হওয়ার মতো বিএনপিতে তিন-চারজন আছেন। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এখনই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আলোচনা কেন? সংবিধান অনুযায়ী, বর্তমান রাষ্ট্রপতির মেয়াদ তো শেষ হয়নি।
রাষ্ট্রপতি কে হচ্ছেন
বিএনপির দায়িত্বশীল সূত্রগুলো বলছে, রাষ্ট্রপতি পদে দলের জ্যেষ্ঠ নেতা খন্দকার মোশাররফ হোসেনের নাম গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নামও আলোচনায় ছিল।
তবে খন্দকার মোশাররফ হোসেনের নামই বেশি আলোচনায়। তিনি দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সক্রিয় এবং মন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। দলীয় রাজনীতিতে জ্যেষ্ঠতা ও অভিজ্ঞতার কারণে রাষ্ট্রপতি পদে তাঁকে নিয়ে বেশি আলোচনা রয়েছে বলে জানা গেছে।
সম্ভাব্য রাষ্ট্রপতি হিসেবে কাদের নাম বিবেচনায়—জানতে চাইলে বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এখনই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আলোচনা কেন—সে প্রশ্ন তোলেন। তিনি গতকাল মঙ্গলবার রাতে প্রথম আলোকে বলেন, ‘রাষ্ট্রপতি হওয়ার মতো বিএনপিতে তিন-চারজন আছেন। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এখনই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আলোচনা কেন? সংবিধান অনুযায়ী, বর্তমান রাষ্ট্রপতির মেয়াদ তো শেষ হয়নি।’
তবে বিএনপির নেতাদের অনেকে মনে করেন, শেখ হাসিনা সরকারের নির্বাচিত এই রাষ্ট্রপতিকে সরিয়ে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করা দরকার। এমনকি বিরোধী দলের দিক থেকেও বর্তমান রাষ্ট্রপতিকে সরানোর দাবি উঠেছে।
সংসদীয় রীতি অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রীই সংসদ নেতা হন। এ ছাড়া সংসদ উপনেতা নির্বাচন করে সরকারি দল।
সংসদ উপনেতা নির্বাচনের বিষয়ে জানতে চাইলে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, বর্তমান সংবিধানে সংসদ উপনেতা নির্বাচনের বিধান নেই।
তবে অতীতের সংসদ উপনেতা করার নজির রয়েছে। বিএনপির নেতাদের কারও কারও মতে, এর প্রয়োজনীয়তাও রয়েছে।
১২ মার্চ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের অধিবেশন বসছে। ওই অধিবেশনের শুরুতে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন করতে হবে।
স্পিকার পদে আলোচিত মুখ
জাতীয় সংসদের স্পিকার হিসেবে আলোচনায় যাঁদের নাম রয়েছে, তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ওসমান ফারুক ও বর্তমান মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ। দুজনেরই সংসদীয় কার্যপ্রণালির বিষয়ে অভিজ্ঞতা ও গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। এর বাইরে সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জয়নুল আবেদীনের নামও আলোচনায় রয়েছে।
এর মধ্যে বীর মুক্তিযোদ্ধা হাফিজ উদ্দিন আহমদ ছয়বার নির্বাচিত সংসদ সদস্য। তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা রয়েছে। সংসদ পরিচালনার ক্ষেত্রে ভারসাম্যপূর্ণ ব্যক্তিত্ব হিসেবে হাফিজ উদ্দিন আহমদ ও ওসমান ফারুক—দুজনের নামই সামনে আসছে।
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জয়নুল আবেদীন প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। তবে আইন পেশায় দীর্ঘ সম্পৃক্ততা এবং সংবিধান ও সংসদীয় বিধিবিধান বিষয়ে দক্ষতার কারণে তিনিও আলোচনায় আছেন বলে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র বলছে, বিএনপি এখনই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের দিকে যাচ্ছে না। ১২ মার্চ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের অধিবেশন বসছে। তার আগে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচনের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
স্পিকার নির্বাচনের বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, স্পিকার হওয়ার মতো যোগ্য বেশ কয়েকজন নেতা বিএনপিতে আছেন, যেমন খন্দকার মোশাররফ হোসেন, আবদুল মঈন খান ও জয়নুল আবেদীন।
১২ মার্চ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের অধিবেশন বসছে। ওই অধিবেশনের শুরুতে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন করতে হবে। এরই মধ্যে বিএনপির পক্ষ থেকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ গত সোমবার সাংবাদিকদের বলেছেন, জুলাই জাতীয় সনদের সমঝোতার প্রতি সম্মান জানিয়ে সংসদের ডেপুটি স্পিকার পদে বিরোধী দল থেকে একজনকে নেওয়া হবে। এ জন্য প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে নাম প্রস্তাব করতে বলা হয়েছে।
সাংবিধানিক বিধান ও কার্যপ্রণালি
সংবিধান অনুযায়ী, সাধারণ নির্বাচনের পর সংসদের প্রথম বৈঠকে সংসদ সদস্যদের মধ্য থেকে একজন স্পিকার ও একজন ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হবেন। এ দুই পদের যে কোনোটি শূন্য হলে সাত দিনের মধ্যে অথবা ওই সময়ে সংসদ বৈঠকরত না থাকলে পরবর্তী প্রথম বৈঠকে তা পূরণ করতে হবে।
জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী, নির্বাচনের জন্য নির্ধারিত সময়ের অন্তত এক ঘণ্টা আগে যে কোনো সদস্য অন্য কোনো সদস্যকে স্পিকার হিসেবে নির্বাচিত করার জন্য সংসদ সচিবালয়ের সচিবকে সম্বোধন করে লিখিত প্রস্তাব দিতে পারেন। প্রস্তাবটি তৃতীয় একজন সদস্য কর্তৃক সমর্থিত হতে হয়। যাঁর নাম প্রস্তাব করা হবে, তিনি নির্বাচিত হলে স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে সম্মত—এমন একটি বিবৃতি নোটিশের সঙ্গে যুক্ত করতে হয়।
কোনো সদস্য নিজের নাম প্রস্তাব বা সমর্থন করতে পারেন না। নিজের নির্বাচনের সময় সভাপতিত্বও করতে পারেন না। যথাযথভাবে উত্থাপিত ও সমর্থিত প্রস্তাবগুলো উত্থাপনের ক্রমানুসারে ভোটে দেওয়া হয় এবং প্রয়োজনে বিভক্তি-ভোটের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত হয়। কোনো প্রস্তাব গৃহীত হয়ে গেলে অবশিষ্ট প্রস্তাবগুলো আর ভোটে দেওয়া হয় না। একই পদ্ধতিতে ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন করা হয়।
নির্বাচিত স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারকে শপথ পড়ান রাষ্ট্রপতি। সাধারণত জাতীয় সংসদ ভবনে অবস্থিত রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ে এ শপথ অনুষ্ঠিত হয়। নতুন স্পিকার শপথ নেওয়ার পর তাঁর সভাপতিত্বে ডেপুটি স্পিকারের নির্বাচনও হতে পারে।
রাষ্ট্রপতিও সংসদ সদস্যদের ভোটে পরোক্ষভাবে নির্বাচিত হন। ফলে সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলে এ পদেও সরকারি দলের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত হয়ে ওঠে। গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসেন জয়ী হয়ে সরকার গঠন করেছে।
সিদ্ধান্তের অপেক্ষা
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র বলছে, বিএনপি এখনই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের দিকে যাচ্ছে না। ১২ মার্চ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের অধিবেশন বসছে। তার আগে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচনের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। ইতিমধ্যে সংসদের চিফ হুইপ ও হুইপ নির্বাচন করেছে বিএনপি। দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরামের বৈঠকে রাষ্ট্রপতি ও স্পিকার পদে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে। অভিজ্ঞতা, জ্যেষ্ঠতা, রাজনৈতিক কৌশল—সব মিলিয়ে রাষ্ট্র ও সংসদের শীর্ষ পদে শেষ পর্যন্ত কারা আসছেন; রাজনৈতিক অঙ্গনে সেটা এখন আলোচ্য বিষয়।