তারা কেমন করে এ আইন বাতিলের পরামর্শ দেয়: সংসদে কান্নাজড়িত কণ্ঠে মীর আহমাদ
গুম প্রতিকার ও প্রতিরোধ অধ্যাদেশ বাতিলের সুপারিশ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন জামায়াতের দলীয় সংসদ সদস্য মীর আহমাদ বিন কাসেম (আরমান)। তিনি বলেন, ১২ তারিখ অধ্যাদেশটি বাতিল হয়ে গেলে ১৩ তারিখ থেকে গুমের সংজ্ঞা থাকবে না। তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘কেমন করে গুমের শিকার ভুক্তভোগী, যে প্রধানমন্ত্রী নিজে নির্যাতনের শিকার, তারা এ আইন বাতিলের পরামর্শ দেয়? ’
পয়েন্ট অব অর্ডারে মীর আহমাদ বিন কাসেম এই প্রশ্ন তোলেন। বেলা সাড়ে তিনটায় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে দিনের কার্যসূচি অনুযায়ী সংসদের অধিবেশন শুরু হয়।
গুমের শিকার হয়ে মীর আহমদ বিন কাসেম আট বছর নিখোঁজ ছিলেন। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর তিনি মুক্ত হয়ে ফিরে আসেন। ঢাকা-১৪ আসন থেকে এবার তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
মীর আহমাদ বিন কাসেম বলেন, ‘আমাদের আবেদন, আইনটি (অধ্যাদেশ) যদি পরিশোধিত করতে চায়, আগে অনুমোদন দিয়ে আইনে পরিণত করুক, পরে সংশোধন করা হোক। যদি সেটা না করা হয়, ১২ তারিখ অধ্যাদেশটি বাতিল হয়ে গেলে ১৩ তারিখ থেকে গুমের সংজ্ঞা থাকবে না।’
পরে আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান জানান, বিলটি আরও যুগোপযোগী করে চলতি অধিবেশন বা পরে সংসদে উত্থাপন করা হবে।
এর আগে মীর আহমাদ বিন কাসেম বলেন, ‘আমি এখানে দাঁড়িয়ে আছি একটি অন্ধকার ঘর থেকে ফিরে এসে, যেখানে আমার মতো আরও শত শত লোককে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। কিন্তু তাদের ফিরে আসার সৌভাগ্য হয়নি। আমি তাদের পরিবারের পক্ষ থেকে একটি বিশেষ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। আমরা সেই অন্ধকার ঘরে মৃত্যুর প্রহর গুনছিলাম। ধরে নিয়েছিলাম, এ অন্ধকার ঘরে আমাদের মৃত্যু হচ্ছে। হয়তো আমাদের হত্যা করবে, এখানেই আমাদের মৃত্যু হবে। কথা বলার কেউ ছিল না। কীটপতঙ্গ-পিঁপড়া-টিকটিকির সঙ্গে কথা বলতাম। বুঝতে পারতাম না বাইরে দিন, নাকি রাত। মনে হচ্ছে জীবন্ত কবর দিয়ে দেওয়া হচ্ছে। মনে করতাম, মৃত্যু হাজার গুণ ভালো। ভাবতাম, আজকে রাতে হত্যা করা হবে।’
মীর আহমাদ বিন কাসেম বলেন, ‘এইভাবে মৃত্যুর প্রহর যখন গুনছিলাম, একদিন রাতে আমাকে টেনেহিঁচড়ে বের করা হচ্ছে। তখন ধরে নিই, আজকেই আমার মৃত্যু হবে। তখন আমি সুরা ইয়াসিন পড়া শুরু করেছিলাম, যাতে মৃত্যুটা সহজ হয়। কিন্তু শুনলাম, কিছু বাচ্চা ছেলে জীবন দিয়ে, চোখ-পা হারিয়ে ফ্যাসিবাদকে বিতাড়িত করে আমাদের আবার দুনিয়ার আলো দেখার সুযোগ করে দিয়েছে।’
ঢাকা-১৪ আসনের এই সংসদ সদস্য বলেন, ‘এ সংসদকে বলতে হয়, মজলুমদের মিলনমেলা। এমন একজনকেও পাবেন না, যারা গত ফ্যাসিস্ট আমলে জুলুমের শিকার হয়নি। গুমের ভুক্তভোগী পরিবারদের পক্ষ থেকে আমরা বলছি, আমি স্তম্ভিত হয়েছি। আমাদের সঙ্গে যে জুলুম করা হয়েছিল, তা যেন বাংলাদেশের মাটিতে না হয়, সে জন্য গুম প্রতিকার ও প্রতিরোধ অধ্যাদেশ ও জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ করা হয়েছিল। বিশেষ কমিটি আইনগুলো বাতিলের সুপারিশ করেছে।’
পরে পয়েন্ট অর্ডারে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘যাঁরা গুম হয়েছেন, তাঁদের কেউ আমার স্বজন-ভাই-বোন-আত্মীয়-প্রতিবেশী-বাংলাদেশের মানুষ। তাঁদের কেউ আমার জিয়া পরিবারের সদস্য। বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ের প্রতিবেশী।’
মন্ত্রী বলেন, ‘ওনারা (বিরোধী দল) যেটা নিয়ে হইচই করছেন, ওনারা সেটা (আইন) বোধ হয় ভালো করে দেখেননি। মানবাধিকার কমিশন এবং গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ যেভাবে করা হয়েছে, সেটা (আইনে) করা হলে গুমের শিকার সদস্যদের প্রতি অবিচার করা হবে। কারণ, আমরা একই সঙ্গে আইসিটি অ্যাক্টে গুমের সংজ্ঞা অন্তর্ভুক্ত করেছি। সেখানে বিচার ও তদন্ত হবে। আবার গুম আইনে ভিন্ন একটি তদন্তের কথা বলেছি। সেখানে (আইসিটি অ্যাক্টে) গুমের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। কিন্তু গুমের আইনে ১০ বছর পর্যন্ত সাজা রাখা হয়েছে।’
মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশের বিষয়ে মন্ত্রী আসাদুজ্জামান বলেন, ‘অধ্যাদেশটি রাখা হলে তদন্তের নামে যে সময়সীমা রাখা হয়েছে, বাংলাদেশের মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার মানুষজন এতে অতিরিক্ত হয়রানির শিকার হবেন। যে কারণে আমরা বলেছি, এ দুটো আইন আরও বেশি যুগোপযোগী, জনকল্যাণমুখী, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে এ সেশনের মাঝামাঝি বা পরবর্তীতে অংশীজনের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে সুনির্দিষ্টভাবে বিল আনব, যাতে অপরাধীরা কোনোভাবে ছাড়া না পায়। কারণ, ব্যারিস্টার আরমান আমার ভাই, স্বজন, সহকর্মী। উনি দীর্ঘদিন ধরে যেভাবে গুমের শিকার হয়েছিলেন, সেইভাবে বাংলাদেশের সাত শর বেশি মানুষ গুমের শিকার হয়েছিলেন।’
এ সময় আইনমন্ত্রী সহকর্মী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের গুম হওয়ার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, তিনি (সালাহউদ্দিন আহমদ) যেভাবে গুমের শিকার হয়েছিলেন, মৃত্যুর প্রহর গুনেছিলেন প্রতিদিন। তাঁকে যেভাবে পার্শ্ববর্তী দেশে ডাম্পিং করা হয়েছিল, যেভাবে বিচারের মুখোমুখি হয়েছিলেন, যেভাবে বাংলাদেশে ফেরত এসেছেন। এটা মনে করার কারণ নেই, গুমের সঙ্গে জড়িত অপরাধীরা আইনের ফাঁক দিয়ে বের হতে পারবেন।
মন্ত্রী বলেন, ‘সে কারণে গুমের আইনে যে সাজা ও তদন্তের প্রস্তাব করা হয়েছিল, আইসিটি আইনের গুমের সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে, দুটো যেন সাংঘর্ষিক না হয়, সে জন্য আইনগুলো যাচাই-বাছাই করা দরকার। আমি আশা করব, যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ায় আরমানসহ যাঁরা ভুক্তভোগী, তাঁরা সদস্য হিসেবে থাকবেন।’