গত ৩১ আগস্ট জাপার সংসদীয় দল রওশনকে বাদ দিয়ে জি এম কাদেরকে বিরোধী দলের নেতা করার সিদ্ধান্ত নেয়। রওশনকে বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়া নিয়ে ১৩ সেপ্টেম্বর টেলিভিশনে এক সাক্ষাৎকার দিয়ে রওশনকে সরানোর জন্য জি এম কাদেরকে দোষারোপ করেন। এর পরদিনই গতকাল তাঁকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।

রওশন এরশাদকে বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়াটির প্রসঙ্গ উল্লেখ করে মসিউর রহমান বলেন, ‘দেখলাম, চুন্নু সাহেব (জাপার মহাসচিব মুজিবুল হক) তাড়াহুড়ো করে একটা রেজল্যুশন লিখে নিয়ে আসলেন। উনি আমাকে বললেন, এটা সই করে আপনি দিয়ে আসেন স্পিকারের কাছে। আমি বললাম, আমি তো এই রেজল্যুশনের সঙ্গে একমত না। উনি একটা অসুস্থ মানুষ, আর কদিন বাঁচবেন, উনি আসুক। বলল না...এটা...।’

পরে মসিউর নিজেই দলের সিদ্ধান্ত স্পিকারের কাছে পৌঁছান। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘তারপর আমার সঙ্গে মহাসচিব গেলেন, সঙ্গে আরও কয়েকজন মহিলা (সংসদ সদস্য) গেলেন। আমি যখন দিলাম, স্পিকারও তখন বললেন, “রাঙ্গা ভাই এটা কী দিলেন! উনি কয়টা দিন থাকত, কী এমন অসুবিধা ছিল। দলটা একটা বাজে অবস্থার মধ্যে পড়ে যাবে না?” আমি বললাম, এখানে কিছু বলার নেই। সবাই সই করে দিয়েছে, আমাকেও সই করে দিতে হবে, এটাই নিয়ম।’

মসিউর রহমানের বক্তব্যের বিষয়ে জানতে চাইলে জাতীয় সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী সন্ধ্যায় প্রথম আলোকে বলেন, তিনি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে চান না। তিনি জাতীয় পার্টির চিঠি পেয়েছেন, সেটা বিবেচনাধীন রয়েছে।

মসিউর রহমান আজ একাই সংবাদ সম্মেলন করেন। এ সময় তাঁর সঙ্গে দলের কেউ ছিলেন না। দীর্ঘ বক্তব্য এবং প্রশ্ন-উত্তরে তিনি নানা বিষয়ে সাংঘর্ষিক বক্তব্য দেন। পদ–পদবি হারানোর পর গতকাল মসিউর জি এম কাদেরকে হুমকি দিয়েছিলেন।

বলেছিলেন, তাঁর (কাদের) সঙ্গে ‘রংপুরে দেখা হবে’। আর এখন বলছেন, তাঁকে শ্রদ্ধা করেন, এখনো তাঁকে চেয়ারম্যান মানেন। একবার বলছেন, রওশন এরশাদকে বিরোধী দলের নেতার পদ থেকে সরানোর সিদ্ধান্তের সঙ্গে তিনি একমত নন। আবার বলছেন, এ বিষয়ে রওশন এরশাদ ও জি এম কাদের মিলে সিদ্ধান্ত নিক। তবে গতকাল অব্যাহতি পাওয়ার পর যে কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিলেন, আজ সে জায়গা থেকে সরে আসার কথা জানান মসিউর।

এখন বিরোধী দলের নেতার পদ পরিবর্তনের বিষয়ে তাঁর অবস্থানটা কী, আগের জায়গায় আছেন কি না, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে মসিউর রহমান বলেন, ‘আছি, আছি সে জায়গায় আছি। আছি মানে আমি বলছি যে এইটা নিয়মতান্ত্রিকভাবে হয়নি। বাকিটা দেখার দায়িত্ব শিরিন শারমিনের, মাননীয় স্পিকারের।’

পরে আরেক প্রশ্নের জবাবে পদ হারানো জাপার এই নেতা বলেন, ‘আমি চাই, রওশন এরশাদ দেশে এলে তাঁরা দেবর-ভাবি মিলে বসে ঠিক করেন আমাদের দিক। আমরা দিতে চাই না। তাঁরা দুজনেই কিন্তু পারদর্শী এ বিষয়গুলো নিয়ে। ২০১৪ সালে, ২০১৮ সালে রওশন এরশাদ, তার আগে থেকে এরশাদ সাহেব ও রওশন এরশাদ নির্বাচনের বিষয়গুলো দেখাশোনা করেন। এরশাদ সাহেব না থাকার কারণে জি এম কাদের সাহেব অবশ্যই রওশন এরশাদের সঙ্গে বসে এগুলো করুন, আমরা চাই এটা।’

রওশন এরশাদকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্তে একমত না হলে সই দিলেন কেন—এমন প্রশ্নের জবাবে মসিউর রহমান বলেন, ‘আমি ওই দিন যদি শক্ত অবস্থান নিতাম, তাহলে নতুন একজন চিফ হুইপ নিয়োগ করে ওনারা তাঁকে দিয়েই রেজল্যুশনটা করাতেন, আমাকে দিয়ে করাতেন না।’

দলীয় সভার কার্যবিবরণীতে স্বাক্ষর করে পরে কেন এ বিষয়ে প্রশ্ন তুললেন, সে বিষয়ে ব্যাখ্যা দিয়ে মসিউর রহমান বলেন, ‘রওশন এরশাদকে আমি নিজের মায়ের চেয়েও বেশি শ্রদ্ধা করি। রওশন এরশাদ যখন আমাকে বললেন যে তুমি চিঠি দিয়ে সবাইকে (দলীয় সংসদ সদস্য) ডেকে এনেছ, তুমি তাঁদের সই নিয়েছ, তুমিই রেজল্যুলেশন লিখে সে রেজল্যুশন স্পিকারের কাছে জমা দিয়েছ। তখন আমি খুব কষ্ট পেলাম। আমি বললাম, এটা তো আসল ঘটনা না। তখন আমি বলেছি, আমি বাস্তবতাটা টেলিভিশনে বলে দেব।’

দল থেকে অব্যাহতির বিষয়ে মসিউর রহমান বলেন, ‘আমি থাকি বা না থাকি, আমি বহিষ্কার হই বা দল না করি—আই ডোন্ট বদার। আই অ্যাম নট আনহ্যাপি। আমি দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি পেয়েছি, একটু ঘুরতে পারব এখন। আগে তো যেতে পারতাম না কোথাও। গেলে দলের লোকজন আসত, এখন হয়তো একটু ঘুরতে পারব।’

অব্যাহতির আদেশের পর রংপুরে জাপার দুই অংশের নেতা-কর্মীদের সংঘর্ষের কথা উল্লেখ করেন মসিউর রহমান। তিনি বলেন, কালকে রাতে দুই পক্ষে মারামারি হয়েছে।... মহানগর ও জেলা কমিটির মধ্যে একটা হাতাহাতি-মারামারিও হয়ে গেছে। আহত হয়েছে, মেডিকেল গেছে। এরপর থানায় যাবে, নিহত হবে, মার্ডার কেস হবে। এভাবে চললে দলের গতিটা কী হবে।

মারামারির উসকানি তো আপনার কাছ থেকেই গেছে, আপনি চেয়ারম্যানকে চ্যালেঞ্জও করেছেন—এমন প্রশ্নের জবাবে মসিউর রহমান বলেন, ‘করেছিলাম, চ্যালেঞ্জ কালকেই আমি প্রত্যাহার করে নিয়েছি। আমি আজ সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে সমস্ত কর্মীকে নিষেধ করে দিচ্ছি, কেউ যেন আন্দোলন বা কোনো রকম কিছু করতে না যায়। আর সে রকম কিছু হবে না। আমি আপনাদের কথা দিতে পারি। আমি কালকে একটু রাগান্বিত ছিলাম। আমি অস্বীকার করি না। রাগ হওয়া স্বাভাবিক, আমি ২৭ বছর একটা দল করব, সে দল কোনো কারণ দর্শানো ছাড়াই আমাকে বাদ দিয়ে দেবে, কারও অনুমতি নিয়ে তো দল করতে আসিনি। একটা ন্যূনতম সৌজন্যবোধ তো থাকতে হয়।’

মসিউর বলেন, ‘দলটা যদি সুষ্ঠুভাবে চলে তাহলে আমি জাতীয় পার্টিতে থাকব। না হয় আমি জাতীয় পার্টিতে থাকব না। স্বাভাবিক গতিতে যদি দলকে চলতে দেওয়া না হয়, গঠনতন্ত্রে গণতান্ত্রিক ধারার বাধাগুলো যদি পরিবর্তন না হয়, আমি এই দল করব না এবং এর সঙ্গে বলছি অন্য কোনো দলও আর করব না।’

পরে এক প্রশ্নের জবাবে মসিউর রহমান বলেন, ‘হ্যাঁ, আমি অব্যাহতির আদেশ প্রত্যাহার চাই। তবে না দিলেও আমার কোনো দুঃখ নেই।’

জি এম কাদেরের নাম উল্লেখ না করে মসিউর রহমান বলেন, ‘তিনি সম্পর্কে আমার আত্মীয়। আমি তাঁকে অনেক শ্রদ্ধা করি, কিন্তু তিনি কেন এটা (অব্যাহতি) করলেন, আমি বুঝতে পারলাম না। এই দুঃখটা প্রকাশ করার জন্য এবং আমি যে অন্যায় করিনি—এ কথাটা বলার জন্য আজকে শুধু এখানে এসেছি।’

জাতীয় পার্টি গণতান্ত্রিক ধারায় চলছে না বলে দাবি করে জাপার সাবেক এই মহাসচিব বলেন, এবার যদি ভাগ হয়, জাতীয় পার্টি আটবার ভাঙবে। এবার ভাঙলে দল আর থাকবে না। তিনি বলেন, ‘পৃথিবীর অনেক দেশেই কিন্তু দুটির বেশি দল নেই এবং সে দেশগুলো অনেক ভালো চলে। আমার মনে হয় যে আগামী দিনে এই দুটি দল ছাড়া আর কোনো দল থাকবে না। কোন দুটি দল আমি তা বলব না। কিন্তু সেই দুটির মধ্যে আমরা নেই। সুতরাং দলটা যদি এভাবে পরিচালিত হতেই থাকে, তাহলে একটা স্বেচ্ছাচারিতার মধ্যে দলটা চলে যাবে।’

তাহলে কি জাতীয় পার্টি স্বৈরতান্ত্রিক দল? এমন প্রশ্নে জবাবে মসিউর রহমান বলেন, ‘স্বৈরতান্ত্রিক আমি বলব না, আমি বলব দলটি গণতান্ত্রিক না। ওনার (জি এম কাদের) সঙ্গে কিছু লোক আছে, যারা মৌমাছির মতো ঘোরে। সারা দিন ওনাকে কুপরামর্শ দিতে থাকে, উনি হয়তো রাগ করে এ ধরনের ঘটনা করে ফেলেন। আমি ওনার দোষ দেই না কোনো সময়ই। আমি উনাকে চেয়ারম্যান মানি এবং এখন পর্যন্ত মানি।’

রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন