জামায়াতের পাশাপাশি আওয়ামী লীগকেও নিজেদের ভূমিকার হিসাব মেলাতে হবে: ড্যানিলোভিচ

জামায়াতে ইসলামীর ইতিহাস ও রাজনীতি নিয়ে আবদুর রাজ্জাকের বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে ভার্চ্যুয়ালি বক্তব্য দেন জন ড্যানিলোভিচ। লেকশোর হোটেল, গুলশান, ১৮ সেপ্টেম্বরছবি: মীর হোসেন

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর পাশাপাশি অন্যান্য রাজনৈতিক দল ও সামগ্রিক সমাজেরও আত্মসমালোচনা ও আত্ম-অনুসন্ধান প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকায় নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক উপরাষ্ট্রদূত জন এফ ড্যানিলোভিচ।

সাবেক এই মার্কিন কূটনীতিক বলেছেন, এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগও এর বাইরে নয়। সাম্প্রতিক ও নিকট অতীতের ইতিহাসে নিজেদের ভূমিকার সঙ্গে দলটিরও হিসাব মেলানো প্রয়োজন।

আজ শুক্রবার সকালে রাজধানীর গুলশানের একটি হোটেলে প্রয়াত ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাকের ‘বাংলাদেশ জামায়াত-ই-ইসলামী: ইটস হিস্ট্রি অ্যান্ড পলিটিকস’ শীর্ষক বইয়ের প্রকাশনা অনুষ্ঠানে ভার্চ্যুয়ালি যুক্ত হয়ে এ কথা বলেন জন ড্যানিলোভিচ। অনুষ্ঠানটির আয়োজন করেছে ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড (ইউপিএল)।

আবদুর রাজ্জাকের বইটিকে বাংলাদেশ নিয়ে গবেষণা ও অধ্যয়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান হিসেবে উল্লেখ করেন ড্যানিলোভিচ। তাঁর মতে, বাংলাদেশ ও জামায়াতে ইসলামীকে বোঝার চেষ্টা করছেন—এমন কূটনীতিকসহ অন্যদের জন্য বইটি ইতিহাস ও রাজনৈতিক চিন্তাভাবনা বোঝার মূল্যবান উৎস হতে পারে।

ড্যানিলোভিচ বলেন, বইটি প্রকাশের আগেই অনেকে সেটিতে কী থাকতে পারে, সে বিষয়ে নিজেদের মতামত তৈরি করে ফেলেছিলেন। এমনকি বইটি নিয়ে মন্তব্য করা কয়েকজন তা পড়েননি বলেই তাঁর ধারণা।

মার্কিন এই কূটনীতিক বলেন, ‘সবার প্রতি আমার প্রথম অনুরোধ, বইটি সত্যিই পড়ুন, এটি নিয়ে চিন্তা করুন। এরপর আলোচনা করুন। আর এই আলোচনা শুধু জামায়াতে ইসলামীর সদস্যদের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ নয়, অন্যান্য রাজনৈতিক দলের জন্যও তা গুরুত্বপূর্ণ।’

ড্যানিলোভিচ বলেন, ‘জামায়াতে ইসলামীর ভেতরে যে ধরনের আত্মসমালোচনা ও আত্ম-অনুসন্ধান প্রয়োজন, অন্যান্য রাজনৈতিক দল এবং সামগ্রিক সমাজের মধ্যেও একই ধরনের আত্মসমালোচনা ও আত্ম-অনুসন্ধান প্রয়োজন। এর মধ্যে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগও রয়েছে। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ও নিকট অতীতের ইতিহাসে নিজেদের ভূমিকার সঙ্গে তাদেরও হিসাব মেলাতে হবে বলে আমি মনে করি।’

আবদুর রাজ্জাককে বন্ধু হিসেবে উল্লেখ করে ড্যানিলোভিচ বলেন, কূটনীতিক হিসেবে তাঁর দুটি প্রধান দায়িত্ব ছিল। একটি হলো যে সরকারের প্রতিনিধিত্ব করেন, সেই সরকারের অবস্থান সংশ্লিষ্ট দেশের সরকারি কর্মকর্তা ও জনগণের কাছে তুলে ধরা। অন্যটি হলো যে দেশে দায়িত্ব পালন করছেন, সেই দেশকে বোঝা।

বাংলাদেশকে বুঝতে বিভিন্ন পটভূমি ও দৃষ্টিভঙ্গির মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের প্রয়োজন ছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ ক্ষেত্রে আবদুর রাজ্জাকসহ অনেক বন্ধুর কাছে তাঁর পেশাগত ও ব্যক্তিগতভাবে গভীর ঋণ রয়েছে।

আরও পড়ুন

ড্যানিলোভিচ বলেন, আবদুর রাজ্জাক শুধু তাঁকে বাংলাদেশ বুঝতে সাহায্য করেননি; বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা, আইনজীবী সমাজ এবং তিনি যে রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিত্ব করতেন, সেই জামায়াতে ইসলামী সম্পর্কেও তাঁকে বুঝতে সহায়তা করেছেন।

বছরের পর বছর আবদুর রাজ্জাকের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিগত সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল উল্লেখ করে ড্যানিলোভিচ বলেন, কূটনৈতিক চাকরি শেষ হওয়ার পরও সেই সম্পর্ক অব্যাহত ছিল। তবে তাঁদের সম্পর্কের ক্ষেত্রে দুজনই নিজেদের অবস্থান সম্পর্কে সচেতন ছিলেন—তিনি মার্কিন সরকারের প্রতিনিধি এবং রাজ্জাক তাঁর রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি।

আবদুর রাজ্জাকের বইটির সততা ও অকপটতাকে এর ‘স্বস্তিদায়ক ও ব্যতিক্রমী’ দিক হিসেবে উল্লেখ করেন ড্যানিলোভিচ। তিনি বলেন, বইটিতে অতীতের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ নিয়েও খোলামেলা আলোচনা রয়েছে।

আরও পড়ুন

বাংলাদেশ নিয়ে লেখা অন্য কিছু বইয়ের প্রসঙ্গ টেনে ড্যানিলোভিচ বলেন, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী মওদুদ আহমদের বইগুলো থেকেও তিনি অনেক কিছু শিখেছেন। আবার এমন কিছু বইও পড়েছেন, যেগুলোর কথা পরে তাঁর মনে থাকেনি। কিছু বইয়ে লেখকের নির্দিষ্ট রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বা এজেন্ডাও স্পষ্ট ছিল।

ড্যানিলোভিচ বলেন, বইটি পড়ে তাঁর সবচেয়ে ভালো লেগেছে যে আবদুর রাজ্জাক বরাবরের মতোই একজন দক্ষ পেশাজীবীর পরিচয় দিয়েছেন। আবদুর রাজ্জাক তাঁর নিজের দৃষ্টিকোণ থেকে ঘটনাগুলো তুলে ধরেছেন, সেগুলোকে যথাযথ প্রেক্ষাপটে স্থাপন করেছেন এবং বৃহত্তর বক্তব্যের সঙ্গে যুক্ত করেছেন।

আরও পড়ুন

আবদুর রাজ্জাকের বইয়ে তাঁর নিজের নামও রয়েছে বলে জানান ড্যানিলোভিচ। তিনি বলেন, তিনি এখনো নিজের স্মৃতিকথা লেখেননি। তবে ভবিষ্যতে নিজের দিক থেকে ঘটনাগুলো তুলে ধরার সুযোগ হতে পারে।

অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে আবদুর রাজ্জাকের বইটির মোড়ক উন্মোচন করা হয়। আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান ছাড়াও বইটির ওপর আলোচনায় অংশ নেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী, অধ্যাপক আলী রীয়াজ ও দ্য ডেইলি স্টার-এর কনসালটিং এডিটর কামাল আহমেদ।

অনুষ্ঠানে আবদুর রাজ্জাকের দুই ছেলে ছাড়াও তাঁর শুভানুধ্যায়ী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।