নির্বাচনে কেউ মেকানিজম করার চিন্তা করলে পালাতে বাধ্য হবে: জামায়াত আমির

বক্তব্য দিচ্ছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান। আজ সোমবার সন্ধ্যায় রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলনকেন্দ্রেছবি: প্রথম আলো

আগামী নির্বাচনে কেউ কোনো ধরনের ‘মেকানিজম’ (কারসাজি) করার চিন্তা করলে তারা পালাতে বাধ্য হবে বলে মন্তব্য করেছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান। আজ সোমবার সন্ধ্যায় রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলনকেন্দ্রে এক অনুষ্ঠানে জামায়াত আমির এ মন্তব্য করেন। সশস্ত্র বাহিনীর সাবেক সদস্যদের নিয়ে ‘ইন রিকগনিশন অব সার্ভিস অ্যান্ড স্যাক্রিফাইস: আ স্যালুট টু আওয়ার ডিসটিংগুইশড ভেটেরানস’ শীর্ষক এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে জামায়াতে ইসলামী।

অনুষ্ঠানে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমরা ওই বিগত তিন নির্বাচন বা চার নির্বাচনের মতো কোনো নির্বাচন দেখতে চাই না। আমরা বোঝাপড়ার কোনো নির্বাচন একেবারেই দেখতে চাই না। বোঝাপড়া কোনো অথরিটির সঙ্গে হবে না, বোঝাপড়া হবে রাজনৈতিক দলগুলোর ভোটারদের সঙ্গে সরাসরি, অন্য কারও সঙ্গে নয়। আমরা সেই নির্বাচনটা দেখতে চাচ্ছি।’

শফিকুর রহমান বলেন, ‘যদি আমরা, এই আমরা সবাই মিলে সচেতন দেশবাসী আমরা যদি সচেতন থাকি, আমাদের বিশ্বাস, যদি কেউ কোনো ধরনের মেকানিজম করার চিন্তা মাথায় এসেও থাকে, তারা পালাতে বাধ্য হবে ইনশা আল্লাহ।’

জাতীয় জীবনে আগামী নির্বাচনের গুরুত্ব সীমাহীন উল্লেখ করে জামায়াত আমির বলেন, ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচন কোনো ফরম্যাটেই পড়ে না। এখন যাঁদের বয়স ৩৫ থেকে ৩৬ বছর, তাঁরা জীবনে একটা ভোটও দেওয়ার সুযোগ পায়নি। জামায়াত এমন একটা নির্বাচন চায়, যেখানে প্রত্যেকটি ভোটার স্বস্তির সঙ্গে ভোটকেন্দ্রে যেতে পারবেন। কোনো চ্যালেঞ্জ, প্রশ্ন জাগ্রত হবে না। যদি সেই পরিবেশ নিশ্চিত করা যায়, তাহলে এই নির্বাচন হবে সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য।

জামায়াত আগামী নির্বাচনকে একটা ‘আইকনিক’ নির্বাচন হিসেবে দেখতে চায় উল্লেখ করে শফিকুর রহমান বলেন, নির্বাচন বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টা, নির্বাচন কমিশন যা বলেছে, সেটি শুধু কথায় নয়, কাজে দেখতে চায় জামায়াত। এ জন্য প্রতিটি ভোটিং বুথকে সুরক্ষিত করতে হবে। এর জন্য প্রতিটি বুথে সিসিটিভি ক্যামেরার প্রয়োজন হবে। কিন্তু সরকার ও নির্বাচন কমিশনের এ বিষয়ে অনিচ্ছা দেখা যাচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে শফিকুর রহমান আরও বলেন, দেশ থেকে ২৮ লাখ কোটি টাকা বিদেশে পাচার করা হয়েছে। এর বাইরে আরও যে পরিমাণ লুট করা হয়েছে, তার হিসাব জানা নেই। দেশ সেদিক থেকে গরিব নয়। চুরি–দুর্নীতি বন্ধ করলে দেশ সামনের দিকে এগিয়ে যাবে। এখানে পাঁচ শ কোটি, এক হাজার কোটি টাকা লাগলেও এটা (প্রতিটি বুথে সিসিটিভি ক্যামেরা) অবশ্যই করা উচিত। কারণ, সুশাসনের পূর্বশর্ত হচ্ছে সুষ্ঠু নির্বাচন। সে ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর স্বল্পতা থাকলেও এটি সেই অভাব পূরণ করে দেবে।

অনুষ্ঠান মঞ্চে জামায়াতে ইসলামীর অন্যান্য নেতাদের সঙ্গে দলটির আমির শফিকুর রহমান। আজ সোমবার সন্ধ্যায় রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলনকেন্দ্রে
ছবি: প্রথম আলো

সরকার ও নির্বাচন কমিশনকে ভোট দেওয়ার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে উল্লেখ করে জামায়াত আমির বলেন, জনগণ যাঁকে পছন্দ তাঁকে ভোট দেবেন। কিন্তু তাঁর পছন্দের ভোট দেওয়ার পরিবেশ নিশ্চিত করে দিতে হবে সরকার ও নির্বাচন কমিশনকে। এখন পর্যন্ত সেটি হয়নি। তবে এটা করতে হবে। কেউ যদি করতে না পারেন, তাঁর সরে যাওয়া উচিত। যিনি পারবেন, তিনি এসে করবেন। কিন্তু দায়িত্ব নিয়ে না করা শুধু অবহেলা নয়, এটা দায়িত্বের ভায়োলেশন (লঙ্ঘন)।

জিয়াউর রহমানের মাধ্যমে স্বাধীনতার ঘোষণার প্রসঙ্গ টেনে উপস্থিত সশস্ত্র বাহিনীর সাবেক সদস্যদের উদ্দেশে শফিকুর রহমান বলেন, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে কোনো সিভিলিয়ানের মুখ দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণাটা প্রচারিত হয়নি, হয়েছে আপনাদের মুখ দিয়ে। আপনাদেরকে স্যালুট। এ বিষয়ে একবারই ইতিহাস রচনা হয়েছে। এটা অক্ষুণ্ন থাকবে, যে যত চেষ্টা করুক। অনেকে এই বিষয়টাকে অগ্রাহ্য করতে চান, ম্লান করতে চান। এটা আনজাস্ট (অন্যায়), এটা হয় না। অবশ্যই এ দায়িত্ব ছিল রাজনীতিবিদদের। তাঁরা এ দায়িত্ব পালন করলে সেনাবাহিনীর একজন অফিসারকে এগিয়ে আসার প্রয়োজন হতো না। তাঁরা এ দায়িত্ব পালন করেননি বলেই সেনাবাহিনীর একজন অফিসার এই মহান দায়িত্ব পালন করেছেন। জাতির জন্য তাঁর এই অবদান কেউ অস্বীকার করলে আসলেই নিজেকে ভুলে যাওয়ার শামিল হবে।

জামায়াত আমির বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় নেতৃত্বদানকারী জেনারেল আতাউল গনি ওসমানিকে জাতির মানসপট থেকে ভুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। তাঁর স্বীকৃতিও দেওয়া হচ্ছে না। স্বাধীনতার পতাকা প্রথম উত্তোলন করেছিলেন আ স ম আবদুর রব, তাঁর নামটাও ঠিকমতো আসে না। যাঁর যেখানে অবদান, তাঁর স্বীকৃতি না দিলে ভবিষ্যতে দেশে কোনো বীরের জন্ম হবে না। বীরদের অবশ্যই স্বীকৃতি দিতে হবে।

অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন কর্নেল (অব.) মো. জাকারিয়া হোসেন। স্বাগত বক্তব্য দেন জামায়াতের ঢাকা–১৬ আসনের প্রার্থী আবদুল বাতেন। উপস্থিত ছিলেন জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল হালিম, প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য মোবারক হোসাইন প্রমুখ। অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন মেজর জেনারেল (অব.) মাহাবুব উল আলম, মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান, মেজর (অব.) সরোয়ার হোসেন, অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা হাসিনুর রহমান প্রমুখ। এ ছাড়া সাড়ে তিন শ থেকে চার শ জন সশস্ত্র বাহিনীর সাবেক সদস্য অনুষ্ঠানে অংশ নেন।