রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ও অবৈধ পুঁজি রক্ষায় দেশে মিডিয়ার জন্ম হচ্ছে: পরওয়ার
রাজনৈতিক উদ্দেশ্য কিংবা ব্যবসা ও অবৈধ পুঁজি রক্ষার জন্য দেশে মিডিয়ার (গণমাধ্যম) জন্ম হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। আজ রোববার দুপুরে জাতীয় প্রেসক্লাবে এক সেমিনারে তিনি এ মন্তব্য করেন।
‘তথ্য ও সম্প্রচার খাতের সংস্কার: একটি জনমুখী ও সংস্কারমূলক রোডম্যাপ’ শীর্ষক এ সেমিনারের আয়োজন করে সেন্টার ফর মিডিয়া ইনফরমেশন অ্যান্ড পাবলিক পলিসি।
সেমিনারে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘শুধু দেশের স্বার্থ, আমার স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতা রক্ষার উদ্দেশ্যে বাংলাদেশে মিডিয়া আছে বলে আমার মনে হয় না। প্রত্যেকটার পেছনে একটা পলিটিক্যাল ইনটেনশন (রাজনৈতিক উদ্দেশ্য) আছে, নয়তো বিজনেস করপোরেট (করপোরেট ব্যবসা) ও অবৈধ কালো পুঁজি রক্ষার জন্য তারা মিডিয়ার জন্ম দিয়েছে।’
গণমাধ্যমের ওপর সরকারের একক নিয়ন্ত্রণের কারণে স্বাধীন সাংবাদিকতা নিশ্চিত হয়নি বলেও মন্তব্য করেন জামায়াতের এই নেতা। তিনি বলেন, এ জন্য কেবল তথ্য ও সম্প্রচার খাতের সংস্কার নয়; বরং পুরো রাষ্ট্রীয় কাঠামোরই সংস্কার করতে হবে।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন যুক্তরাষ্ট্রের ইস্টার্ন নিউ মেক্সিকো ইউনিভার্সিটির যোগাযোগ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক খাদিমুল ইসলাম। মূল প্রবন্ধে বলা হয়, গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে সূক্ষ্ম অথচ কার্যকর পদ্ধতি সরাসরি সেন্সরশিপ (বিধিনিষেধ) নয়, বরং তা হলো সাংবাদিকদের স্ব-আরোপিত নিয়ন্ত্রণ (সেলফ সেন্সরশিপ)। সরকারি বিজ্ঞাপনের অসম বণ্টন, করপোরেট বিজ্ঞাপনদাতাদের অন্যায্য শর্ত, মালিকপক্ষের বহুমাত্রিক ব্যবসায়িক স্বার্থ ও তাদের রাজনৈতিক সংযোগ সাংবাদিকদের মধ্যে একধরনের আগাম সেলফ সেন্সরশিপ স্থায়ী সংস্কৃতি তৈরি করেছে।
মূল প্রবন্ধে আরও বলা হয়, বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার খুব বেশি সময় হয়নি। প্রাথমিক পর্যায়েই যদি প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী বা তাঁদের পরিবারের সদস্যদের নিয়ে লেখা, সমালোচনা করা, এমনকি ফেসবুক পোস্ট দেওয়ার কারণে চাকরিচ্যুতি, হয়রানি বা গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটতে থাকে, সেটি মোটেও ভালো লক্ষণ নয়। আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনামলের মতো একই প্রবণতা নতুন সরকারের সময়েও অব্যাহত থাকলে গণমাধ্যম ও মতপ্রকাশের পরিবেশের মৌলিক পরিবর্তন ঘটবে না।
সভাপতির বক্তব্যে জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক আবুল আসাদ বলেন, গণমাধ্যম এখনো জনগণের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠতে পারেনি। কোনো কালেই গণমাধ্যম স্বাধীন ভূমিকা রাখতে পারেনি। মালিক কর্তৃক শোষিত হওয়ার কারণে অনেক সময় সাংবাদিকেরা অপেশাদারির দিকে ঝুঁকে পড়েন। তাই দেশ ও জাতির বৃহৎ স্বার্থে তথ্য ও সম্প্রচার খাতের সংস্কার অনিবার্য।
গ্রিন ওয়াচ বিডির সম্পাদক মোস্তফা কামাল মজুমদার বলেন, কম বেতনের কারণে অনেক সাংবাদিক মূলধারা থেকে হারিয়ে যাচ্ছেন। সাংবাদিকদের জীবনমান উন্নয়নে তথ্য ও সম্প্রচার খাতের সংস্কারে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। স্বাধীন সাংবাদিকতা নিশ্চিত করতে হবে।
সেমিনারে বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) সভাপতি ওবায়দুর রহমান শাহীন বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার বাসস (বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা), পিআইবিসহ (প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ) রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থার সব স্তরে যাদের মহাপরিচালক করেছে, তাদের অনেকেই ফ্যাসিবাদের দোসর। নিয়োগপ্রাপ্ত অনেকে কখনো সাংবাদিকতাই করেননি। এর ফলে তথ্য ও সম্প্রচার খাতে সংস্কার করা যায়নি।
ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) সভাপতি আবু সালেহ আকন বলেন, গণমাধ্যমের মালিকেরা তাঁদের দুর্নীতি ও লুটের সম্পদ রক্ষায় সাংবাদিকদের ভূমিকা রাখতে বাধ্য করেন। সাংবাদিকদের ন্যূনতম বেতন দেওয়া হয়, যা দিয়ে স্বাভাবিক জীবন যাপন করা যায় না। ফলে বাধ্য হয়ে অনেক সাংবাদিক অন্যায়ের পক্ষে অবস্থান নেন। তাই তথ্য ও সম্প্রচার খাতের সংস্কারের জন্য গণমাধ্যমের মালিক ও সাংবাদিকদের মাপকাঠি নির্ধারণ করতে হবে।
সেমিনারে আরও বক্তব্য দেন একুশে টিভির হেড অব নিউজ হারুনুর রশীদ, দৈনিক মানবকণ্ঠের সম্পাদক শহিদুল ইসলাম, ঢাকা মেইলের নির্বাহী সম্পাদক হারুন জামিল, বাংলাদেশ বেতারের সাবেক মহাপরিচালক (ডিজি) মো. সালাহ উদ্দিন, মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক রফিক রুম্মান, আয়োজক সংগঠনের পরিচালক শফিকুল ইসলাম মাসুদ প্রমুখ।