তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন যেকোনো মূল্যে: তারেক রহমান

প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমান। আজ মঙ্গলবার সংসদ অধিবেশনেছবি: পিআইডি

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, জাতীয় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বর্তমান সরকার যেকোনো মূল্যে তিস্তা ব্যারাজ মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করবে।

আজ সোমবার জাতীয় সংসদে ২০২৬–২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে এ কথাগুলো বলেন প্রধানমন্ত্রী। জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোয় জনমত গঠনে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করতেও তিনি বিরোধী দলের প্রতি আহ্বান রেখেছেন।

তিস্তায় অগ্রাধিকার দেওয়ার পাশাপাশি পানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে সরকারের পরিকল্পনাও সংসদে তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।

তারেক রহমান বলেন, সরকার পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণেরও উদ্যোগ নিয়েছে। এই ব্যারাজ নির্মাণের মাধ্যমে বর্ষা মৌসুমে যে অতিরিক্ত পানি আসে, সেটা ধরে রেখে শুষ্ক মৌসুমে ব্যবহার করা হবে।

বাজেট ‘জীবনবান্ধব’

প্রস্তাবিত বাজেটকে ‘জীবনবান্ধব বাজেট’ আখ্যা দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তাঁরা সর্বোচ্চ বিবেক–বুদ্ধি–জ্ঞান দিয়ে এমন বাজেট দেওয়ার চেষ্টা করেছেন, যেটা সব শ্রেণি–পেশার মানুষের জীবনে কিছুটা হলেও স্বস্তি দিতে পারে।

তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপির সরকারের প্রথম বাজেট ১১ জুন সংসদে উপস্থাপিত হয়। ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বার্ষিক ব্যয়ের এই ফর্দ নিয়ে সংসদ সদস্যদের আলোচনা চলে। আজ এই আলোচনা শেষ হয় সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের মধ্য দিয়ে।

সমাপনী ভাষণে প্রধানমন্ত্রী মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানো, পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা এবং কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও জ্বালানি খাতে অগ্রাধিকার এবং সামাজিক সুরক্ষা জোরদার করার কথা তুলে ধরেন।

নিত্যপ্রয়োজনীয় ৬১ পণ্যের ওপর কর প্রত্যাহার করার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এবারের বাজেট উপস্থাপনের আগে–পরে কোনো পণ্যের দাম বাড়েনি। জনগণের প্রতি যে দায়িত্ব, তার কিছুটা হলেও সরকার পূরণ করতে পেরেছে, তাদের স্বস্তি দিতে পেরেছে।

বক্তব্যে কৃষকদের ঋণ মওকুফের পাশাপাশি কৃষক কার্ড, ফ্যামিলি কার্ড, প্রবাসী কার্ডসহ সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।

বাজেটে তিন বিষয়ে জোর

নিজের সরকারের বাজেটের প্রধান তিনটি লক্ষ্য এবং অর্থনৈতিক দুরবস্থা পুনরুদ্ধারে তিন ধাপে অর্থনৈতিক কৌশল বাস্তবায়নের পরিকল্পনা তুলে ধরেন তারেক রহমান।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই বাজেটের একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হচ্ছে অর্থনীতিকে মুষ্টিমেয় সুবিধাভোগীর কবল থেকে বের করে নিয়ে এসে সাধারণ নাগরিকের এতে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এবং এর মাধ্যমে একটি ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক মর্যাদাপূর্ণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা।

সরকারপ্রধান জানান, এবারের বাজেটে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তিনটি বিষয়ে সরকার জোর দিতে চাইছে। সেগুলো হলো দরিদ্র মানুষের সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা; অর্থনীতিতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং বিনিয়োগ, উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের চাকা বেগবান করা।

অর্থনীতির পুনরুদ্ধার তিন ধাপে

অর্থনৈতিক দুরবস্থা পুনরুদ্ধারে সরকারের পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।

তারেক রহমান জানান, সরকার তিন ধাপে অর্থনৈতিক কৌশল বাস্তবায়ন করতে চায়। প্রথম ধাপে অর্থনীতির অবনতি রোধ, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনাকে শক্তিশালী ও খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। একটি রাজনৈতিক সরকার হিসেবে মূল লক্ষ্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা বৃদ্ধি করা।

সংসদ অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমান
ছবি: পিআইডি

দ্বিতীয় ধাপে সরকার চায় রাজস্ব সংস্কার, ব্যাংকিং খাতের পুনর্গঠন, বিনিয়োগ পরিবেশের উন্নয়ন, রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং কর্মসংস্থান সম্প্রসারণ করতে।

প্রধানমন্ত্রীর পরিকল্পনা অনুযায়ী, তৃতীয় ধাপে উৎপাদনশীল উদ্ভাবননির্ভর, প্রতিযোগিতামূলক, অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির ভিতকে সুদৃঢ় করা হবে।

তারেক রহমান বলেন, তাঁরা বাংলাদেশকে এমনভাবে গড়ে তুলতে চান, যেখানে তরুণেরা চাকরির জন্য বছরের পর বছর অপেক্ষা করবেন না; বরং মেধা ও দক্ষতা দিয়ে নিজেই নিজের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারবেন। এ কারণে দেশীয় শিল্প বিকাশের জন্য প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।

চলচ্চিত্র, নাটক, সংগীতের মতো শিল্প ও খেলাধুলাকে ‘ক্রিয়েটিভ ইকোনমি’ আখ্যা দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই খাতগুলোকে অর্থনীতির মূল ধারায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

‘সংকটকে অজুহাত বানানো হবে না’

একটি ভঙ্গুর অর্থনীতি নিয়ে বর্তমান সরকারের যাত্রা শুরুর কথা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দুর্নীতি, লুটপাট, অব্যবস্থাপনা, অর্থ পাচার, ভুল নীতির কারণে দেশের অর্থনৈতিক খাত বলা যায় সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস হয়ে গেছে। বড় কিছু প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল, যেগুলো এখন জাতির ওপর বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তারেক রহমান বলেন, এই সংকট আছে। তাঁরা সংকটকে অস্বীকার করতে চান না। তাঁরা সংকটকে অজুহাতও বানাতে চান না। তাঁরা জনগণকে সঙ্গে নিয়ে রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং কার্যকর নীতির মাধ্যমে সফলভাবে সংকট মোকাবিলা করবেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের স্বার্থ রক্ষায় সরকারের প্রথম দর্শন হলো ‘সবার আগে বাংলাদেশ’। জনগণের স্বার্থ রক্ষায় দর্শন হলো ‘সবার জন্য বাংলাদেশ’।

পাচার হওয়া সম্পদ ‘ফেরানো হবে’

সরকারপ্রধান বলেন, অর্থনৈতিক খাত ও ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে সরকার সব উদ্যোগ নিয়েছে। বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরাতে ১৩টি দেশের সঙ্গে ২৩ ‘মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্ট রিকোয়েস্ট’ করা হয়েছে। সম্পদ ফেরাতে ৬০টির বেশি নন–ডিসক্লোজার অ্যাগ্রিমেন্ট স্বাক্ষর হয়েছে।

তারেক রহমান বলেন, দেশ ও আন্তর্জাতিক আইনকানুনের মধ্যে থেকে যত দ্রুত এবং যত বেশি সম্ভব সম্পদ দেশে ফিরিয়ে আনা হবে।

জ্বালানি প্রসঙ্গ

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের সময় এমন একটি জ্বালানি খাত পেয়েছে, যেখানে সীমাহীন দুর্নীতি হয়েছে। জনগণের অর্থ অপচয় করা হয়েছে দীর্ঘদিনের ভুল পরিকল্পনার কারণে। উদ্দেশ্যমূলক চুক্তি এবং দেশীয় কোম্পানি বাপেক্সকে অবহেলা করে বিভিন্ন বিদেশি কোম্পানিকে সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এটা করা হয়েছিল ক্ষমতা ধরে রাখার স্বার্থে।

জ্বালানি খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে নানা উদ্যোগের কথা তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, জ্বালানির উৎস বহুমুখীকরণ, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, নবায়নযোগ্য শক্তি সম্প্রসারণ ও জ্বালানি দক্ষতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।

প্রতিরক্ষা

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার বিশ্বাস করে, জাতীয় নিরাপত্তা শুধু সীমান্ত রক্ষার বিষয় নয়; এটি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, জনগণের নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা এবং সর্বোপরি সাইবার নিরাপত্তা ও কৌশলগত সক্ষমতা—এ সবকিছুর সমন্বয়। বর্তমান সরকার একটি প্রতিরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার কাজে হাত দিয়েছে। প্রতিরক্ষাশিল্পের সক্ষমতা বৃদ্ধি, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাপনা আধুনিকীকরণের জন্য উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বিরোধী দলের প্রতি আহ্বান

বিরোধী দলের উদ্দেশ্যে সংসদ নেতা তারেক রহমান বলেন, ‘জুলাই সনদকে সামনে রেখে সংসদের ভেতরে সংবিধান সংশোধনসহ বিভিন্ন ইস্যুতে যেমন ঐক্যবদ্ধভাবে আমরা কাজ করতে পারি, তেমনি সংসদের বাইরেও জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে জনমত গঠনসহ সংস্কারমূলক কর্মসূচি গ্রহণ করে দেশকে আমরা সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারি। আমাদের সেই ধরনের দায়িত্বশীল আচরণই হবে এ দেশের ভবিষ্যৎ পথরেখা।’

দেশবাসীকে আশ্বস্ত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এই সরকার, এই সংসদ জনগণের। আমরা জনগণের আকাঙ্ক্ষাকে সম্মান করি। জনগণের কষ্ট আমরা অবশ্যই বুঝি। জনগণের সম্পদ রক্ষাকে আমরা পবিত্র দায়িত্ব মনে করি।’

তারেক রহমান বলেন, ‘আমরা এমন একটি বাংলাদেশকে গড়ে তুলতে চাই, এমন একটি বাংলাদেশকে পেতে চাই, যেখানে উন্নয়ন হবে ন্যায্যতাভিত্তিক, অর্থনীতি হবে অন্তর্ভুক্তিমূলক। রাষ্ট্র হবে জবাবদিহিমূলক এবং নাগরিকের জীবন হবে নিরাপদ মর্যাদাপূর্ণ ও সম্ভাবনাময়।’