শিবির নেতা জিসানের ঘটনা নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বিবৃতি, সংসদে হইচই
ছাত্রশিবিরের বহিষ্কৃত কেন্দ্রীয় নেতা জিসান মিয়া প্রধানের ‘নিখোঁজ হওয়ার’ দাবির বিষয়ে জাতীয় সংসদে বিবৃতি দিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, এক নারীকে বিয়ে না করার টালবাহানায় জিসান নিজেই আত্মগোপন করেছিলেন।
আজ রোববার ৩০০ বিধিতে দেওয়া স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এ–সংক্রান্ত বিবৃতিকে কেন্দ্র করে জাতীয় সংসদে সরকারি দল ও বিরোধী দলের মধ্যে সাময়িক উত্তেজনা তৈরি হয়। বিরোধী দল অভিযোগ করে বলেছে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যে মনে হচ্ছে ‘একটি প্লট তৈরি’ করা হচ্ছে।
বিকেলে সংসদের বৈঠকের শুরুতে বিবৃতি দিতে দাঁড়ান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। শুরুতে তিনি সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদের গ্রেপ্তারের বিষয়ে বিবৃতি দেন। এরপর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরেকটি বিষয়ে বিবৃতি দেওয়ার অনুমতি চান। ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল অনুমতি দিলে তিনি ‘বাংলাদেশ ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সহকারী আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক মো. জিসান মিয়া প্রধানের ঘটনার সংক্ষিপ্ত বিবরণী’ শিরোনামে বিবৃতি সংসদে তুলে ধরেন।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, অনেকে ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে জিসানের নিখোঁজের বিষয়টি অন্যভাবে বর্ণনা করে সরকারকে দায়ী করতে চেয়েছিল, তাই প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটনের পর তিনি বিষয়টি সংসদের মাধ্যমে প্রকাশ করছেন।
জিসানের গ্রেপ্তারের বিষয় তুলে ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, পাঁচ–ছয় মাস আগে ফেসবুকে এক নারীর সঙ্গে জিসান মিয়া প্রধানের পরিচয় এবং প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। কুমিল্লা জেলা পুলিশের তথ্যমতে, বিভিন্ন সময়ে জিসান মেয়েটিকে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে একাধিকবার ধর্ষণ করলে মেয়েটি অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ে। একপর্যায়ে জিসান ভিকটিম মেয়েটিকে জোরপূর্বক ভ্রূণ নষ্ট করার জন্য চাপ সৃষ্টি করতে থাকেন এবং ভ্রূণ নষ্ট না করলে ভিকটিমকে মেরে ফেলার হুমকি দেন। একপর্যায়ে ভিকটিম জীবনের ভয়ে ভ্রূণ নষ্ট করতে রাজি হন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, জিসান মিয়া তাঁর পূর্বপরিচিত ও ঘনিষ্ঠ সিকান্দর আলীর ওষুধের দোকান থেকে ভ্রূণ নষ্ট করার ট্যাবলেট ক্রয় করে ভিকটিম মেয়েটিকে খাওয়ায়। ভ্রূণ নষ্ট হওয়ায় ওষুধ সেবনের ফলে ভিকটিমের প্রচণ্ড রক্তক্ষরণ শুরু হলে ভিকটিম নিজেই জিসানকে বিষয়টি জানায়। তখন জিসান পুনরায় একজনের মাধ্যমে একই ফার্মেসি থেকে ওষুধ সংগ্রহ করে ভিকটিমের বাড়িতে পৌঁছে দেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ওষুধের পর রক্তক্ষরণ বন্ধ হলে ভিকটিম জিসানকে বিয়ের জন্য চাপ সৃষ্টি করে। এক পর্যায়ে জিসান ১২ জুন শুক্রবার বিয়ে করতে সম্মতি জ্ঞাপন করেন। ১১ জুন রাত সাড়ে ৮টায় বিয়ে না করার টালবাহানায় জিসান নিজেই আত্মগোপন করেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের পর ফ্লোর নেন সংসদে বিরোধীদলীয় উপনেতা সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের। তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দুটি বিবৃতি দেওয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
এ সময় ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল বলেন, কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী ৩০০ বিধিতে দেওয়া বিবৃতি নিয়ে কোনো প্রশ্ন তোলা যায় না।
এরপর বিরোধী দলের সদস্যরা হইচই শুরু করেন। ডেপুটি স্পিকার তখন বিরোধীদলীয় উপনেতাকে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেন।
আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের ডেপুটি স্পিকারের উদ্দেশে বলেন, ‘স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পরবর্তী পর্যায়ে যে সাবজেক্টটা (বিষয়) বলেছেন, আপনার এটা এলাও করা (অনুমতি দেওয়া) উচিত হয়নি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পরবর্তী পর্যায়ে কোনো একটি দলকে লক্ষ্য করে একটি বিতর্কিত বিষয়ে পার্লামেন্টে এভাবে বক্তব্য রাখা বোধ হয় বাংলাদেশের পার্লামেন্টের ইতিহাসে এই প্রথম। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী একটি দলকে কনডেমড (নিন্দা) করার জন্য ইনটেনশনালি (ইচ্ছাকৃত) এটা এখানে উপস্থাপন করেছেন।’
বিরোধীদলীয় উপনেতা এ সময় জানতে চান, জিসান এখন কোথায় আছে? তিনি দাবি করেন, কুমিল্লা পুলিশ জিসানের সঙ্গে কাউকে বলতে দিচ্ছে না। যে মেয়ের কথা বলা হয়েছে, তাঁর সঙ্গেও কাউকে কথা বলতে দেওয়া হচ্ছে না।
আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের বলেন, ‘স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যে মনে হচ্ছে যে, উনারা একটা প্লট তৈরি করার জন্যই পুলিশ এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী একই লাইনে আলোচনা করে এই কাজটি করছেন।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে তাঁর বক্তব্য প্রত্যাহার করা বা তাঁর বক্তব্য এক্সপাঞ্জ করার দাবি জানান বিরোধীদলীয় উপনেতা। এ সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দাঁড়িয়ে কিছু বলতে চান। অন্যদিকে বিরোধী দলের প্রায় সব সদস্য আসন ছেড়ে দাঁড়িয়ে যান। সংসদে হইচই শুরু হয়। বিরোধীদলীয় উপনেতা মাইক ছাড়াই বক্তব্য দিতে থাকেন।
এ সময় ডেপুটি স্পিকার সংসদ সদস্যদের বারবার বসার আহ্বান জানান। সবাইকে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, এখানে সংসদীয় রীতিনীতির বাইরে কিছু থাকলে পরে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।