বিশেষ সাক্ষাৎকার: আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান

কেউ তাঁর ধর্ম অনুসারে চলতে চাইলে সম্পত্তি হস্তান্তর আইন বাধা হবে না

সম্পত্তি দান করার পর দাতা নিজে জীবিত থাকা পর্যন্ত ওই সম্পত্তি ভোগ করতে পারবেন—এমন বিধান রেখে সম্পত্তি হস্তান্তর–সংক্রান্ত ‘১৮৮২ সালের দ্য ট্রান্সফার অব প্রোপার্টি (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল’ গত রোববার জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে। বিরোধী দলসহ বিভিন্ন ধর্মীয় সংগঠন ও ব্যক্তি আইনটির বিরোধিতা করেছেন। আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান গতকাল সোমবার জাতীয় সংসদের কার্যালয়ে এ নিয়ে প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলেছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সেলিম জাহিদরিয়াদুল করিম

প্রথম আলো:

আইনটি পরিবর্তনের প্রয়োজন হলো কেন।

মো. আসাদুজ্জামান: আইনটা করার মূল উদ্দেশ্য হলো, আমরা দেখছি এই সমাজে বাবা-মা অসহায় হয়ে যাচ্ছেন শেষ বয়সে। সম্পত্তি ছেলেমেয়েরা লিখে নিলেও বাবা-মাকে বের করে দেওয়া হচ্ছে। সেই জায়গা থেকে বাবা-মাকে প্রটেকশনের চিন্তা থেকেই তাঁদের জন্য এই আইনটা করা হয়েছে।

আমরা দেখছি, সমাজে অনেক বাবা-মা সন্তানকে সম্পত্তি দিয়ে দেওয়ার পর তাঁদের বাসা থেকে বের করে দিচ্ছে। অনেকে ক্যানসার আক্রান্ত, তাঁর প্রপার্টি আছে। কিন্তু বাবা-মা তাঁদের সম্পত্তি ভোগও করতে পারছেন না। আজ থেকে বেশ কিছু বছর আগে একটা সমস্যা আমার সামনে এল, একজন অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল মারা যাওয়ার পর সন্তানেরা সম্পত্তি লিখে নিল। এর এক সপ্তাহ পরে তাদের মাকে বাড়ি থেকে বের করে দিল।

এ রকম ছোট ছোট অনেক ঘটনা আছে। এমন ঘটনাও আছে যে কেউ মারা মারার পর অন্য ওয়ারিশরা এসে মামলা-মোকদ্দমা করছেন। ফলে বৃদ্ধ মানুষগুলোর একদিকে যেমন প্রটেকশনের প্রয়োজন, অন্যদিকে মামলা-মোকদ্দমার যে বিভিন্ন অ্যাভিনিউ আছে, সেগুলো নিয়ে আমরা কাজ করার চেষ্টা করছি, কীভাবে মামলা-মোকদ্দমা বন্ধ করা যায়। এই চিন্তা থেকে আইনটা আমরা সংসদে এনেছি।

দান যখন কমপ্লিট হয়ে যাচ্ছে, তখন মালিকটা কিন্তু সে হয়ে যাচ্ছে। মালিকের সম্পত্তি ভোগ করবেন বাবা-মা। এটি ইসলামে পারমিটেড (অনুমোদিত)।
প্রথম আলো:

বিরোধী দল রোববার একটা কথা বলেছে—২০১৩ সালের যে পিতা–মাতার ভরণপোষণ আইন, এটা তো অলরেডি আছে। তাহলে আবার নতুন করে এটা কেন?

আসাদুজ্জামান: এটা নতুন করে দেওয়া হলো। কারণ, ভরণপোষণ আইন যেটা—বাবা-মাকে কোর্টে মামলা করতে হবে। আমাদের সামাজিক যে সংস্কৃতি, বাবা-মা সহজে সন্তানের বিরুদ্ধে মামলা করতে চান না। ফলে বাবা-মাকে শেষজীবনে গিয়ে এ রকম একটা ভালনারেবল পজিশনে আমরা নিতে চাই না। আর ইসলামিক দৃষ্টিভঙ্গিতেও বাবা-মাকে সম্মান করা, তাঁদের দেখভাল করা অন্যতম দায়িত্ব সন্তানের।

এখানে দেখেন, দুইটা জিনিস আছে আইনের মধ্যে। একটা হলো কর্পাস, যেটাকে আমরা বলি সত্য বা ওনারশিপ। ওনারশিপ কিন্তু সন্তানের কাছে দিয়ে দেওয়া হচ্ছে, যিনি গ্রহীতা। আরেকটা ইউসোফ্রাক্ট। ইউসোফ্রাক্টের আভিধানিক অর্থ হলো, অন্যের সম্পত্তি ভোগ করা। অর্থাৎ দান যখন কমপ্লিট হয়ে যাচ্ছে, তখন মালিকটা কিন্তু সে হয়ে যাচ্ছে। মালিকের সম্পত্তি ভোগ করবেন বাবা-মা। এটি ইসলামে পারমিটেড (অনুমোদিত)।

বৃদ্ধ মানুষগুলোর একদিকে যেমন প্রটেকশনের প্রয়োজন, অন্যদিকে মামলা-মোকদ্দমার যে বিভিন্ন অ্যাভিনিউ আছে, সেগুলো নিয়ে আমরা কাজ করার চেষ্টা করছি, কীভাবে মামলা-মোকদ্দমা বন্ধ করা যায়। এই চিন্তা থেকে আইনটা আমরা সংসদে এনেছি।
প্রথম আলো:

আইনমন্ত্রী হিসেবে আপনার কাছে এই বিলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন কোনটি এবং সাধারণ মানুষের জীবনে এর সরাসরি প্রভাব কী?

আরও পড়ুন

আসাদুজ্জামান: আমি তো অনেক মানুষের ফোন পাচ্ছি, এসএমএস পাচ্ছি। তাঁরা বলছেন যে এটি একটি যুগান্তকারী আইন। এই আইন বাংলাদেশের অসহায় বৃদ্ধ বাবা-মায়ের সুরক্ষার জন্য যেভাবে করা হয়েছে, তা যুগান্তকারী আইন হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। এটি প্রগতিশীল আইন। এমনকি আমাকে এসএমএস পাঠিয়েছেন জামায়াতপন্থী আইনজীবী শিশির মনিরও।

এই আইন বাংলাদেশের অসহায় বৃদ্ধ বাবা-মায়ের সুরক্ষার জন্য যেভাবে করা হয়েছে, তা যুগান্তকারী আইন হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। এটি প্রগতিশীল আইন। এমনকি আমাকে এসএমএস পাঠিয়েছেন জামায়াতপন্থী আইনজীবী শিশির মনিরও।
প্রথম আলো:

কী পাঠালেন?

আসাদুজ্জামান: উনি পাঠালেন যে উনি ব্যক্তিগতভাবে এই আইনের মধ্যে কোনো ভুল দেখেন না।

প্রথম আলো:

কিন্তু বিরোধী দল তো রোববার সংসদে এই বিল নিয়ে বিতর্ক তুলেছে যে এটা কোরআন-সুন্নাহবিরোধী। তারা বলছে, ইসলামিক যে উত্তরাধিকার আইন, ওয়াসিয়ত, হেবা—এগুলো সবই ইফেক্টেড হবে।

আসাদুজ্জামান: সুনির্দিষ্টভাবে ১২২-এর চার ধারায় সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা আছে। অন্যান্য আইনে যে হেবা বা গিফট বা অন্য যেকোনো ফরম্যাটই থাক না কেন, সেটা এই আইন দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত বা বাধাগ্রস্ত হবে না।

ইয়েস, সে কারণে এটা করা। এটা বাংলাদেশিদের জন্য প্রযোজ্য হবে। বাংলাদেশের সম্পত্তি–সংক্রান্ত বিষয়ে প্রযোজ্য হবে।
প্রথম আলো:

বাংলাদেশে মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টানসহ নানা ধর্মের মানুষের বসবাস। আইনটি সব ধরনের মানুষের জন্য প্রযোজ্য হবে?

আসাদুজ্জামান: ইয়েস, সে কারণে এটা করা। এটা বাংলাদেশিদের জন্য প্রযোজ্য হবে। বাংলাদেশের সম্পত্তি–সংক্রান্ত বিষয়ে প্রযোজ্য হবে।

আরও পড়ুন
প্রথম আলো:

বিভিন্ন ধর্মের সম্পত্তি ও উত্তরাধিকার আইন আলাদা। সবার ক্ষেত্রে প্রয়োগের জন্য সাংঘর্ষিক পরিস্থিতি তৈরি হবে না?

আসাদুজ্জামান: কোনো সাংঘর্ষিক পরিস্থিতি তৈরি হবে না। কেউ যদি তাঁর ধর্ম অনুসারে চলতে চান, সেখানে আইন বাধা হবে না। এটা যাঁর ইচ্ছা করতে পারবেন। একটা অপশন রাখা হয়েছে। সেটাও ওই চার ধারায় আমরা উল্লেখ করে দিয়েছি।

প্রথম আলো:

আপনারা কি আইন করার আগে কোনো পর্যায়ে ইসলামি স্কলারদের মতামত নিয়েছেন বা কথা বলেছেন?

আসাদুজ্জামান: আমরা ইনফরমালি (অনানুষ্ঠানিকভাবে) কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলেছি। এমনকি আমি জামায়াতের যাঁর নাম বললাম, শিশির মনির—হি ইজ আ গুড লইয়ার। আমি ওনার সঙ্গেও কথা বলেছি। তিনিও বলেছেন যে এখানে আমি কোনো ভুল দেখছি না।

আমরা ইনফরমালি (অনানুষ্ঠানিকভাবে) কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলেছি। এমনকি আমি জামায়াতের যাঁর নাম বললাম, শিশির মনির—হি ইজ আ গুড লইয়ার। আমি ওনার সঙ্গেও কথা বলেছি। তিনিও বলেছেন যে এখানে আমি কোনো ভুল দেখছি না।
প্রথম আলো:

আপনি সংসদে বলেছেন, এই আইনে মুসলিম আইনকে স্পর্শ করা হয়নি। আইনে মুসলিমদের জন্য প্রচলিত হেবা ও দানের মধ্যে পার্থক্য কী হবে? হেবা কি থাকবে?

আসাদুজ্জামান: হেবা থাকবে। অবশ্যই থাকবে। সেটা আইনের মধ্যেই বলে দিয়েছি। আইনের ১২২ (এ)-এর চার—সেখানে সুস্পষ্টভাবে বলে দেওয়া হয়েছে। শুধু হেবা না, অন্য ধর্মের যে পারসোনাল ল আছে, সেখানেও টাচ করবে না। সব সংরক্ষিত।

প্রথম আলো:

বিরোধী দল এই আইনের বিরোধিতা করছে, হেফাজতে ইসলামসহ অন্যান্য ধর্মীয় সংগঠনও প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে। আইনটি নিয়ে কি ধর্মীয় চাপ অনুভব করছেন?

আসাদুজ্জামান: আমি সেটা (চাপ) দেখি না। তাঁরা তাঁদের ব্যাখ্যা দিয়েছেন। আমি মনে করছি যে এটা তাঁদের ভুল ব্যাখ্যা। তাঁরা একদিকে বলছেন এ আইনটি ইসলামবিরোধী। আবার আরেক দিকে বলছেন অ্যামেন্ডমেন্ট এনে ওখানে একটা সংশোধনী দেন—১৯৩৭ সালের আইনও এখানে প্রযোজ্য হবে।

আমরা আইনের এই পয়েন্টের ওপর সারা বিশ্বে কোথায় কী আইন আছে—এই পয়েন্টের ওপর মালয়েশিয়ান রেফারেন্স দিয়েছি, আমরা জর্ডানের রেফারেন্স দিয়েছি, সৌদি আরবের রেফারেন্স দিয়েছি, ইউএইর রেফারেন্স দিয়েছি, আমরা প্রিভি কাউন্সিলের রেফারেন্স দিয়েছি, ইন্ডিয়ান সুপ্রিম কোর্টের রেফারেন্স দিয়েছি, পাকিস্তান কোর্টের রেফারেন্স দিয়েছি। এটা আমরা ক্লিয়ার করেছি।
প্রথম আলো:

কিন্তু বিরোধী দল রোববার বলেছে যে সরকারের তরফ থেকে ভুল ব্যাখ্যা করা হচ্ছে।

আসাদুজ্জামান: আমি এটা মনে করি না। আমরা উইথ রেফারেন্স বলেছি, আমরা আইনের এই পয়েন্টের ওপর সারা বিশ্বে কোথায় কী আইন আছে—এই পয়েন্টের ওপর মালয়েশিয়ান রেফারেন্স দিয়েছি, আমরা জর্ডানের রেফারেন্স দিয়েছি, সৌদি আরবের রেফারেন্স দিয়েছি, ইউএইর রেফারেন্স দিয়েছি, আমরা প্রিভি কাউন্সিলের রেফারেন্স দিয়েছি, ইন্ডিয়ান সুপ্রিম কোর্টের রেফারেন্স দিয়েছি, পাকিস্তান কোর্টের রেফারেন্স দিয়েছি। এটা আমরা ক্লিয়ার করেছি।

প্রথম আলো:

ধরা যাক, একজন বাবা তাঁর বাড়ি ছেলেকে দান করলেন। কিন্তু নতুন আইনের অধীনে বাবা জীবিত থাকা অবস্থায় বাড়িটি ব্যবহার করবেন। তাহলে আইনগত মালিক কে—বাবা নাকি ছেলে?

আসাদুজ্জামান: ছেলে। যে মুহূর্তে দান করে দেওয়া হলো, সেই মুহূর্ত থেকে ছেলে মালিক।

প্রথম আলো:

এখন যদি ভোগাধিকার না দেন ছেলে, তাহলে কী হবে?

আসাদুজ্জামান: সেখানে একটা অপশন রেখেছি। জেলা জজের কাছে সরাসরি একটা পিটিশন উনি করতে পারবেন।

প্রথম আলো:

তো তাহলে ভরণপোষণ আইনে যেভাবে কোর্টে যেতে হচ্ছে, এখানেও তো তাহলে…

আসাদুজ্জামান: এটা খুব রেয়ার (কদাচিৎ) হবে। কারণ, এই আইনটা এতটা স্পষ্ট করা হয়েছে যে এখানে কোনো ছেলে আর ওই সুযোগ নিতে পারবে না।

প্রথম আলো:

দাতা কি পরে তাঁর দেওয়া সম্পত্তি বিক্রি, বন্ধক বা অন্য কারও কাছে হস্তান্তর করতে পারবেন? পারলে গ্রহীতার অধিকার কোথায় থাকবে?

আসাদুজ্জামান: পারবেন না। উনি শুধু ভোগ করতে পারবেন। এখানেই হেবার সঙ্গে পার্থক্যের জায়গাটা।

প্রথম আলো:

এই আইনের সুযোগ নিয়ে উত্তরাধিকার আইনকে পাশ কাটিয়ে জীবিত অবস্থায় সম্পত্তি বণ্টনের নতুন কৌশল নিতে পারবেন—এমন আশঙ্কা আছে?

আসাদুজ্জামান: সেটা আপাতত দেখছি না।

সেটা তো হেবাতেও আছে। বাবা যদি মনে করেন, তাঁর সমস্ত সম্পত্তি একজন ছেলেকে দান করে দেবেন—হেবাতেও তো সেটা পারবেন।
প্রথম আলো:

একজন বাবা তাঁর সব সম্পত্তি একজন সন্তানকে দান করে দিলেন এবং নিজের জীবনকালীন ভোগাধিকার রেখে দিলে অন্য সন্তানের উত্তরাধিকার পাওয়ার সুযোগ থাকবে?

আসাদুজ্জামান: সেটা তো হেবাতেও আছে। বাবা যদি মনে করেন, তাঁর সমস্ত সম্পত্তি একজন ছেলেকে দান করে দেবেন—হেবাতেও তো সেটা পারবেন।

প্রথম আলো:

এটা কি ইসলামিক আইনের সঙ্গে, মানে আমাদের যে উত্তরাধিকার আইন যেভাবে আছে, ওটার সঙ্গে কন্ট্রাডিক্ট করবে?

আসাদুজ্জামান: কোনো কন্ট্রাডিক্ট করে না। আমরা উদাহরণ হিসেবে বলেছি, ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইনে কয়েকটা পরিবর্তন এনেছিল। যুগান্তকারী পরিবর্তন। ধরেন, আমার সন্তান একটা আছে। আমার সন্তান মারা গেল আমার আগে। আমি যদি আগে মারা যেতাম, আমার ওই সন্তান ইসলামিক ল অনুসারে উত্তরাধিকার হতো। কিন্তু সে যদি আগে মারা যায়, তার সন্তানেরা, নাবালক সন্তানেরা কিন্তু আমার অংশ পাবে না। আমার থেকে তার বাবা যেটা পেত, সেটা পাবে না। ১৯৬১ সালে এসে বলল—না, ওই সন্তান যে অংশটা পেত, তার সন্তানেরা ওই অংশটা পাবে।

তারপর ধরেন, ইসলামিক ল অনুসারে মুখে তিন তালাক বললে ডিভোর্স হয়ে যাচ্ছে। ১৯৬১ সালের আইনে বলল—না, তিন তালাক বললেই ডিভোর্স হবে না।

তৃতীয়ত হলো, স্বামী–স্ত্রী ডিভোর্স হয়ে গেল। তাঁরা আবার বিয়ে করতে গেলে হিল্লা বিয়ের একটা বিধান ছিল। ১৯৬১ সালের আইনে বলল—না, হিল্লা বিয়ে বলে কিছু থাকবে না। তালাক চূড়ান্ত হয়ে গেছে। পরবর্তী সময়ে যদি মনে করেন, তাঁরা নতুন করে বিয়ে করতে পারবেন।

এইটা ভুল কথা। বিরোধী দলের এক এমপি আজকে (সোমবার) আমাকে একটা মতামত পাঠিয়েছেন একজন স্কলারের। সেই মতামত হলো, হেবার ওপরে শর্ত বসানো যাবে না। আমিও বলছি, হেবার ওপর শর্ত বসানো যাবে না। সে কারণে আমি হেবাকে আনটাচ রাখছি। এটা ইসলামিক ল—আমি সেখানে হাত দিইনি।
প্রথম আলো:

আইনটি যদি মুসলিমদের ক্ষেত্রে সমভাবে প্রযোজ্য হয়, তাহলে মুসলিম উত্তরাধিকার আইনের সঙ্গে সম্ভাব্য বিরোধ এড়াতে বিলে কোনো বিশেষ সুরক্ষা রাখা হয়েছে কি না।

আসাদুজ্জামান: হয়েছে।

প্রথম আলো:

সেটা কী।

আসাদুজ্জামান: ওই যে ১২২(এ)-এর চার ধারা, সেখানে বলা আছে, ওই সমস্ত আইনকে কোনোভাবেই এই আইন বাধাগ্রস্ত করবে না।

প্রথম আলো:

বিরোধীদের অভিযোগ, সামাজিক সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে শরিয়াহ বিধানকে পাশ কাটানো হচ্ছে।

আসাদুজ্জামান: এইটা ভুল কথা। বিরোধী দলের এক এমপি আজকে (সোমবার) আমাকে একটা মতামত পাঠিয়েছেন একজন স্কলারের। সেই মতামত হলো, হেবার ওপরে শর্ত বসানো যাবে না। আমিও বলছি, হেবার ওপর শর্ত বসানো যাবে না। সে কারণে আমি হেবাকে আনটাচ রাখছি। এটা ইসলামিক ল—আমি সেখানে হাত দিইনি।

প্রথম আলো:

এখন এই যে জিনিসটা দেবে সম্পত্তি, একটা হচ্ছে প্রচলিত হেবাতে দেয়। এটা দেওয়ার পদ্ধতিটা কী হবে?

আসাদুজ্জামান: রেজিস্ট্রি করে দিতে হবে, যেভাবে হেবাতে দেওয়া হয়।

প্রথম আলো:

এটার নাম কী হবে, এই রেজিস্ট্রিটা?

আসাদুজ্জামান: ওইটা দান। ইংরেজিতে যেটাকে গিফট বলা হয়েছে।

প্রথম আলো:

নতুন বিধান দিয়ে আদালতে সম্পত্তি–সংক্রান্ত মামলা আরও বাড়তে পারে—এ আশঙ্কাও করছেন কেউ কেউ।

আসাদুজ্জামান: এটা (সম্পত্তি–সংক্রান্ত মামলা) আরও কমবে।

প্রথম আলো:

সম্পত্তি–সংক্রান্ত মামলার সংখ্যা কমবে—এর কোনো ব্যাখ্যা আছে, কীভাবে কমবে?

আসাদুজ্জামান: কারণ, এটা যখন বলা থাকবে, ক্লিয়ারলি যে জীবনস্বত্ব ভোগ করবেন, সেখানে সন্তানেরা যখন এটাকে ওইভাবে দেখবেন, তাঁরা এটা নিয়ে যখন ডিসপিউট করবেন না, তখন তাঁর ওনারশিপটা যেহেতু আগেই ডিসাইডেড—এটা নিয়ে কোনোভাবেই মামলা সংখ্যা বাড়বে না। আদালতে যেতে নিরুৎসাহিত হবেন।

প্রথম আলো:

এই আইনটিতে বিশ্বের অন্যান্য দেশের কোনো রেফারেন্স আনা হয়েছে?

আসাদুজ্জামান: বিশ্বের অন্যান্য দেশের রেফারেন্স আমরা এনেছি। আমরা বলেছি, এ ধরনের সেপারেট গিফট, হেবার বাইরে যে এ ধরনের গিফটের বিধান বিশ্বের বিভিন্ন মুসলিম দেশে আছে। যেমন সৌদি আরবে দেখিয়েছি, মালয়েশিয়ায় দেখিয়েছি, ইউএইর ক্ষেত্রে দেখিয়েছি। এমনকি প্রিভি কাউন্সিল ১৯২২ সালে দিয়েছে। সেটা এ ধরনের আইনও নয়, হেবার ওপরেই বলেছে যে হেবার সময় হেবাতে যদি ইউসোফ্রাক্ট রাইট রাখে, তাহলে সেটা অবৈধ হবে না।

বিরোধী দলকে বলব, আপনারা আইনটা ভালো করে পড়েন, ভালো করে বোঝেন এবং বাবা-মায়ের প্রতি সন্তানের যে দায়িত্ব, সে দায়িত্ব যে দিন দিন খুব ক্ষয়িষ্ণু ধারায় যাচ্ছে, সেটা থেকে বাবা-মাকে বিশেষ করে রক্ষা করার জন্য এইটা নিয়ে আপনারা যে ব্যাখ্যা দিচ্ছেন, ভুল ব্যাখ্যা দিচ্ছেন—সেখান থেকে ফিরে আসেন।
প্রথম আলো:

এই আইনের বিরোধিতাকারী বা ইসলামিক স্কলারদের উদ্দেশে কিছু বলবেন?

আসাদুজ্জামান: বিরোধী দলকে বলব, আপনারা আইনটা ভালো করে পড়েন, ভালো করে বোঝেন এবং বাবা-মায়ের প্রতি সন্তানের যে দায়িত্ব, সে দায়িত্ব যে দিন দিন খুব ক্ষয়িষ্ণু ধারায় যাচ্ছে, সেটা থেকে বাবা-মাকে বিশেষ করে রক্ষা করার জন্য এইটা নিয়ে আপনারা যে ব্যাখ্যা দিচ্ছেন, ভুল ব্যাখ্যা দিচ্ছেন—সেখান থেকে ফিরে আসেন।

ইসলামিক স্কলারদের উদ্দেশে আমার কথা খুবই স্পষ্ট। আপনারা যেটা বলছেন, হেবাকে টাচ করা হয়েছে—আমি বলছি যে হেবাকে টাচ করা হয়নি। আপনারা ১২২-এর উপধারা চারটা ভালো করে দেখেন। সেখানে হেবা এবং ইসলামিক বা অন্য ধর্মের যে হস্তান্তরের পদ্ধতি বা অন্য আইনেও যদি অন্য কোনো পদ্ধতি থাকে, তাদের কোনোটাকে এটা ইফেক্ট (ক্ষতিগ্রস্ত) করবে না, টাচ করবে না।

প্রথম আলো:

আপনি কি মনে করেন, এ আইনের কিছু পরিবর্তন বা সংযোজন প্রয়োজন?

আসাদুজ্জামান: আপাতত আমি দেখছি না। ভবিষ্যতে প্র্যাকটিক্যাল ফিল্ডে গেলে যদি কোনো সমস্যা দেখা দেয়, তখন দেখা যাবে।

প্রথম আলো:

বিরোধী দল থেকেও যদি কোনো প্রস্তাব আসে, এ ক্ষেত্রে সেটাকে রাখার সুযোগ আছে?

আসাদুজ্জামান: পজিটিভ কিছু এলে যদি মনে হয় যে আইনসংগতভাবে দেখার সুযোগ আছে, নিশ্চয়ই সেটা বিবেচনায় নেওয়া হবে।

প্রথম আলো:

সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

মো. আসাদুজ্জামান: প্রথম আলোকেও ধন্যবাদ।