১১–দলীয় ঐক্যের লংমার্চ
মাতারবাড়ী সমুদ্রবন্দর নিয়ে লুকোচুরি হচ্ছে কি না, জাতি জানতে চায়: শফিকুর রহমান
বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান বলেছেন, আরেকটি অনিবার্য বিপ্লব দরজায় টোকা দিচ্ছে। সেই বিপ্লবের জন্য দেশবাসীকে প্রস্তুত থাকতে আহ্বান জানান তিনি।
আজ শনিবার সকালে রাজধানীর জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের দক্ষিণ গেটে ঢাকা থেকে খুলনা বিভাগ অভিমুখী ১১–দলীয় ঐক্যের লংমার্চের উদ্বোধনী সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে শফিকুর রহমান এ কথা বলেন। তবে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, সদস্যসচিব আখতার হোসেন বা অন্য কোনো নেতা সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন না।
সমাবেশে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর নিয়ে কোনো লুকোচুরি হচ্ছে কি না, সে প্রশ্ন তোলেন শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, 'দুই দিন আগে চার দিনের সফর শেষ করে প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশে ফিরেছেন। কী জন্য গিয়েছিলেন, কী করে এসেছেন—জাতির সামনে তাঁকে এটা খোলাসা করতে হবে। বিশেষ করে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর নিয়ে কোনো লুকোচুরি হচ্ছে কি না, জাতি তা পরিষ্কার জানতে চায়। কানেকটিভিটির নামে বাংলাদেশকে কারও কাছে ইজারা দেওয়া চলবে না।'
বিরোধীদলীয় নেতা আরও বলেন, 'অতীতে যারা দাসত্ব স্বীকার করেছিল, তাদের পরিণতি তারা এখন ভোগ করছে। তাদের তো দিদি-দাদা ছিল, আপনাদের কে আছে? জনগণের সাথে প্রতারণা করে পার পাবেন না।'
শফিকুর রহমানের বক্তব্যের পর সকাল সাড়ে আটটার দিকে বায়তুল মোকাররমের দক্ষিণ গেট থেকে লংমার্চের গাড়িবহর যাত্রা শুরু করে। এই বহর হানিফ ফ্লাইওভার হয়ে ঢাকা-মাওয়া মহাসড়ক ধরে ফরিদপুরের ভাঙ্গা, গোপালগঞ্জ, খুলনা, রূপসা সেতু পার হয়ে যশোর ও কুষ্টিয়ার দিকে যাবে। প্রায় ৪২৫ কিলোমিটারের এই যাত্রাপথে ১৯টি জেলা অতিক্রম করা হবে। পথে একাধিক পথসভা হবে।
ঘোষণা অনুযায়ী, ঢাকা থেকে মাওয়া হয়ে মাদারীপুর–শরীয়তপুরের মাঝামাঝি নাওডোবা দিয়ে খুলনা বিভাগের দিকে যাবে লংমার্চের গাড়িবহর। পথে নাওডোবা, বাগেরহাটের কাটাখালী, খুলনার বাবরী চত্বর ও স্বাধীনতা চত্বর, যশোরের মুড়লি মোড় এবং ঝিনাইদহ–চুয়াডাঙ্গা বাসস্ট্যান্ড এলাকায় পথসভা করার পরিকল্পনা রয়েছে। এরপর কুষ্টিয়ার শহীদ আবরার ফাহাদ স্টেডিয়ামে সমাপনী সমাবেশ হবে।
ঢাকায় সমাবেশে জামায়াত আমির বলেন, বিরোধী দল সাত দফা দাবিতে লংমার্চ করছে। এর মধ্যে মূল দফা হচ্ছে গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন। এ রায় বাস্তবায়ন না হওয়ার কারণেই বাকি ছয় দফা জন্ম নিয়েছে। যদি একটা দফা বাস্তবায়ন হতো, বাকি ছয় দফা মাথা তুলে দাঁড়াতে পারত না। কোনো চাঁদাবাজ, কোনো দখলদার, কোনো দুর্নীতিবাজ, কোনো মাদকসম্রাট মাথা তুলে দাঁড়াতে পারত না।
বিএনপি জাতিকে হতাশ করেছে উল্লেখ করে জামায়াত আমির বলেন, বিএনপি জাতির সঙ্গে ঐতিহাসিক প্রতারণা করেছে। কথা দিয়ে কথা ভঙ্গ করেছে। জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে মিথ্যাচার করেছে। জনগণের রায়কে উপহাস করেছে। তারা বিএনপিকে বলেছিলেন, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না করলে এর জন্য তাদের উচ্চমূল্য দিতে হবে। তারা সম্ভবত সেদিকেই এগোচ্ছে।
আগামী ৯ নভেম্বর সংসদ অধিবেশন শুরু হওয়ার আগেই গণভোটের রায় বাস্তবায়নের ঘোষণা দিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান বিরোধীদলীয় নেতা।
সমাবেশে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বলেন, জেলা পরিষদ, সিটি করপোরেশন, পৌরসভাসহ সব অফিস বিএনপির অফিসে পরিণত হয়েছে। সেখান থেকে সরকারি টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে, মানুষের ভিটা দখল করছে। প্রধানমন্ত্রীকে বুঝতে হবে, দিন শেষে সব দোষ তাঁর কাঁধে আসবে।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক বলেন, দেশের সব সংকটের মূলে রয়েছে সংবিধান সংস্কার না করা, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না করা। সরকার নানাভাবে জনগণের রায়কে অসম্মান করে যাচ্ছে।
উদ্বোধনী সমাবেশে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, সরকার সাংবিধানিক সব পদে দলীয় লোক বসাতে চায়। জুলাই সনদ মানলে সেটি তারা পারবে না। এ জন্য তারা জনগণের সঙ্গে গাদ্দারি করছে। বিরোধী দলের লংমার্চে মাধ্যমে জনমত গঠন করা হচ্ছে। জনগণ তাদের লাল কার্ড দেখাবে, গাদ্দারি করতে দেবে না।
উদ্বোধনী সমাবেশে বক্তব্য দেন, জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ, এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু, বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান (ইরান), বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির ভারপ্রাপ্ত আমির আবদুল কাইয়ুম সুবহানী, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির চেয়ারম্যান আনোয়ারুল ইসলাম, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) মুখপাত্র রাশেদ প্রধান, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের মহাসচিব মুফতি ফখরুল ইসলাম, ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আমির নূরুল ইসলাম বুলবুল, ঢাকা মহানগর উত্তরের আমির সেলিম উদ্দিন, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম, ডাকসু ভিপি মো. আবু সাদিক (সাদিক কায়েম) প্রমুখ।
দাবি
গণভোটের রায় বাস্তবায়ন এবং জুলাই জাতীয় সনদ অনুযায়ী, সংবিধান সংস্কারের দাবি সামনে রেখে এই লংমার্চ করছে ১১–দলীয় ঐক্য। তাদের অন্য দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত গণহত্যার বিচার, বিদ্যুৎ–জ্বালানি–গ্যাস ও সারের সংকট নিরসন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি, দুর্নীতি–চাঁদাবাজি ও দখলদারি বন্ধ এবং প্রশাসনের সর্বস্তরে দলীয়করণ বন্ধ করা।
এর আগে গত ৫ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম ও ১৯ সেপ্টেম্বর রংপুর অভিমুখে লংমার্চ করেছিল ১১–দলীয় ঐক্য। খুলনা বিভাগের পর ২১ নভেম্বর সিলেট অভিমুখে লংমার্চ করবে ১১–দলীয় ঐক্য।