কিছু মৌলিক সংস্কার প্রস্তাবে মতপার্থক্য রয়ে গেছে

জুলাই জাতীয় সনদ স্বাক্ষরের এক বছর পূর্তি আজ শনিবার। রাষ্ট্রের বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাঠামোগত সংস্কারে ‘রাজনৈতিক সমঝোতার দলিল’ হিসেবে তৈরি করা হয়েছিল এ সনদ। তবে সনদ বাস্তবায়নের প্রশ্নে এক বছরের মধ্যেই রাজনৈতিক বিভাজন বড় আকারে সামনে এসেছে।

কিছু মৌলিক সংস্কার প্রস্তাবে রাজনৈতিক মতপার্থক্য এবং বাস্তবায়ন পদ্ধতি নিয়ে রাজনৈতিক টানাপোড়েন ছিল আগে থেকেই। এক বছরের মাথায় এসে সনদে স্বাক্ষরকারী দলগুলো মোটাদাগে দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে।

জুলাই সনদের সংবিধান-সম্পর্কিত প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নে অন্তর্বর্তী সরকার যে প্রক্রিয়া নির্ধারণ করেছিল, সেটি সেভাবে অনুসরণ করছে না বর্তমান ক্ষমতাসীন বিএনপি। সংবিধান সংশোধনের লক্ষ্যে তারা একটি বিশেষ সংসদীয় কমিটি করেছে। বিরোধী দল এই কমিটি প্রত্যাখ্যান করেছে। তারা গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবি করে আসছে।

অবশ্য বিশেষ কমিটি আশা করছে, শেষ পর্যন্ত বিরোধী দল সংসদে সংবিধান সংশোধন বিলের আলোচনায় অংশ নেবে। নোট অব ডিসেন্ট বা ভিন্নমতসহ যেভাবে জুলাই সনদ সই হয়েছিল, সেভাবেই এই সনদ বাস্তবায়ন করা হবে। এর সঙ্গে বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে থাকা বিষয়গুলোও প্রাধান্য পাবে। কমিটি সংবিধান সংশোধন নিয়ে অংশীজনদের সঙ্গে পর্যায়ক্রমে মতবিনিময় চালিয়ে যাচ্ছে। আগামী জানুয়ারিতে সংবিধান সংশোধন বিল সংসদে তোলার সম্ভাবনা আছে বলে কমিটি জানিয়েছে।

গত ২০ সেপ্টেম্বর জুলাই সনদে সই করা ২৬টি দল ও জোটকে মতবিনিময়ে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল বিশেষ কমিটি। এতে জামায়াতে ইসলামী, এনসিপিসহ ১১টি দল সাড়া দেয়নি। দলগুলো সংবিধান সংশোধন প্রক্রিয়ার অংশ হতে চায় না বলে জানা গেছে।

জুলাই সনদ কী

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি ছিল রাষ্ট্রকাঠামোর সংস্কার। শুধু সরকার বদল নয়, বরং কেমন রাষ্ট্রব্যবস্থা এই পরিবর্তনের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসবে—এ প্রশ্নও তখন সামনে আসে।

অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার দুই মাসের মাথায় ২০২৪ সালের অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে রাষ্ট্রের বিভিন্ন ক্ষেত্রে গুণগত পরিবর্তন বা সংস্কার আনার জন্য ছয়টি সংস্কার কমিশন গঠন করে। সেগুলো হলো: সংবিধান, নির্বাচনব্যবস্থা, বিচার বিভাগ, জনপ্রশাসন, পুলিশ ও দুর্নীতি দমন কমিশন সংস্কার কমিশন।

পরে ২০২৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি এসব কমিশনের প্রস্তাবের ভিত্তিতে রাজনৈতিক ঐকমত্য তৈরির জন্য গঠন করা হয় জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। দীর্ঘ আট মাস ৩০টি রাজনৈতিক দল ও জোটের সঙ্গে আলোচনার পর তৈরি হয় ‘জুলাই জাতীয় সনদ’। সনদে আছে মোট ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব। এর মধ্যে ৪৮টি সংবিধান-সম্পর্কিত। বাকিগুলো বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনি সংস্কারের প্রস্তাব। সনদের শেষ অংশে আছে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের ৭ দফা অঙ্গীকারনামা।

গত বছরের ১৭ অক্টোবর জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ ২৪টি দল এই সনদের অঙ্গীকারনামায় সই করে। পরে গণফোরাম এবং চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি সনদে সই করে এনসিপি। ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় অংশ নিলেও বামধারার চারটি দল ওই সনদে সই করেনি।

সনদে নোট অব ডিসেন্ট

সনদের অনেকগুলো প্রস্তাবেই এক বা একাধিক দলের ভিন্নমত বা নোট অব ডিসেন্ট আছে। কোন প্রস্তাবে কোন কোন দলের ভিন্নমত আছে, সনদে তার উল্লেখ আছে। সংবিধান-সম্পর্কিত প্রস্তাবগুলোর মধ্যে সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (পিআর) পদ্ধতিতে সংসদের উচ্চকক্ষ গঠন, উচ্চকক্ষের ক্ষমতা, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগপদ্ধতি, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের গঠনপ্রক্রিয়া, প্রধানমন্ত্রীর একাধিক পদে থাকার বিধানসহ এ ধরনের কিছু প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে সংবিধানে মৌলিক পরিবর্তন আসবে। তবে কিছু প্রস্তাবে বিএনপির ভিন্নমত আছে।

যেমন জুলাই সনদের প্রস্তাবে বলা হয়েছে, আইনসভা হবে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট। নিম্নকক্ষ বা সংসদ নির্বাচনে সারা দেশে একটি দল যত ভোট পাবে, তার অনুপাতে তারা উচ্চকক্ষে আসন পাবে। এ প্রস্তাবে বিএনপির ভিন্নমত আছে। তাদের অবস্থান হলো, একটি দলের নিম্নকক্ষে পাওয়া আসনের ভিত্তিতে উচ্চকক্ষে আসন বণ্টন হবে।

গণভোটে ছিল না ভিন্নমত

সনদে উল্লেখ থাকলেও জুলাই সনদ নিয়ে অনুষ্ঠিত গণভোটের ব্যালটে বিএনপি বা অন্য কোনো দলের ভিন্নমতের বিষয়গুলোর কোনো উল্লেখ ছিল না। অর্থাৎ জুলাই সনদের মূল প্রস্তাবগুলোর ওপরই গণভোট হয়েছে। জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশের ভিত্তিতে গত ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে ওই গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হওয়ায় সংসদ সদস্যদের নিয়ে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করার কথা ছিল। অবশ্য বিএনপি বলছে, ওই আদেশ অবৈধ।

ভিন্নমত থাকা বিষয়গুলোসহ বেশ কিছু বিষয় বিএনপি যেভাবে বাস্তবায়ন করতে চায়, সেভাবে নির্বাচনী ইশতেহারে তুলে ধরেছিল। দলটি নির্বাচনী ইশতেহারের সাংবিধানিক সংস্কারের প্রথম দফায় বলেছে, ‘সংবিধান সংস্কারের বিষয়ে বিগত ১৭ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে জুলাই জাতীয় সনদ যে আঙ্গিকে ঐকমত্য ও স্বাক্ষরিত হয়েছে, সেগুলো সে মতে বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।’

বিএনপির মতে, এর অর্থ হলো জুলাই সনদ সই হয়েছে রাজনৈতিক দলগুলোর ভিন্নমতসহ। কারণ, জুলাই সনদের প্রস্তাবগুলোর পাশে রাজনৈতিক দলগুলোর মতামত অংশে একটি নোট আছে। যেখানে বলা আছে, ‘অবশ্য কোনো রাজনৈতিক দল বা জোট তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে উল্লেখপূর্বক যদি জনগণের ম্যান্ডেট লাভ করে, তাহলে তারা সেই মতে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবে।’

বাস্তবায়ন পদ্ধতি প্রশ্নে মতবিরোধ

১৭ অক্টোবর সনদ সই হলেও তখন পর্যন্ত বাস্তবায়নের পদ্ধতি চূড়ান্ত ছিল না। শুরু থেকেই ঐকমত্য কমিশনের সিদ্ধান্ত ছিল, বাস্তবায়ন পদ্ধতি সনদের অংশ হবে না। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে বাস্তবায়ন পদ্ধতি নিয়ে দলগুলোর সঙ্গে ৫ দফা সংলাপ করেছিল ঐকমত্য কমিশন। পাশাপাশি একটি বিশেষজ্ঞ প্যানেলের সঙ্গেও দীর্ঘ আলোচনা করা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে কমিশন দুটি বাস্তবায়ন পদ্ধতি অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে সুপারিশ করে। এর ভিত্তিতে গত বছরের ১৩ নভেম্বর জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ জারি করা হয়।

এ আদেশ অনুযায়ী নির্বাচিত সংসদ সদস্যের সমন্বয়ে ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ গঠন করার কথা। এ ছাড়া ত্রয়োদশ সংসদ সদস্যদের দুটি শপথ নেওয়ার কথা ছিল। একটি সংসদ সদস্য হিসেবে, আরেকটি সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে। জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপির নেতৃত্বাধীন জোটের সংসদ সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নিলেও বিএনপির সংসদ সদস্যরা নেননি। ফলে ওই সংস্কার পরিষদও গঠিত হয়নি।

বিএনপি দাবি করেছে, জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অবৈধ। এ ধরনের শপথ নেওয়ারও কোনো সুযোগ নেই। তবে জুলাই জাতীয় সনদ যেভাবে তারা সই করেছে, সেভাবে বাস্তবায়ন করবে।

অন্যদিকে বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী বলছে, গণভোটের রায় পাশ কাটিয়ে সংবিধান সংশোধনের বিষয়টি তারা মেনে নেবে না। গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জুলাই সনদ কার্যকর করার দাবিতে রাজপথের আন্দোলন জোরদার করতে চায় তারা। ইতিমধ্যে তারা লংমার্চের মতো কর্মসূচি পালন করছে।

সাবেক জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ প্রথম আলোকে বলেন, জুলাই জাতীয় সনদ শুধু রাজনৈতিক দলগুলোর সমঝোতার দলিল নয়, গণভোটের মাধ্যমে এটি জনগণের সমর্থন পেয়েছে। শুধু কী কী সংস্কার করতে হবে তা নয়, কীভাবে এটি বাস্তবায়ন করতে হবে, তার রূপরেখাও আলোচনার মাধ্যমে ঠিক করা হয়েছিল। দলগুলো সনদের অঙ্গীকারনামায় সই করেছিল। এখন কোনো দল যদি সে জায়গা থেকে সরে আসে, এটি অঙ্গীকারের ব্যত্যয়।