দলীয় সূত্র জানায়, বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, আগামী কয়েক মাস তিনি বিভিন্ন বিভাগীয় ও জেলা শহরে সরকারি কর্মসূচিতে অংশ নেবেন। সরকারি এসব কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি তিনি দলীয় সমাবেশ করবেন। এর মধ্যে ৪ ডিসেম্বর চট্টগ্রামের পলোগ্রাউন্ডে সমাবেশ হবে। এরপর কক্সবাজার, যশোরসহ অন্যান্য শহরেও সমাবেশ হবে। 

বিএনপিও তাদের বিভাগীয় সমাবেশ শুরু করেছিল চট্টগ্রামের পলোগ্রাউন্ড থেকে, ১২ অক্টোবর। ওই সমাবেশে লাখখানেক মানুষের জমায়েত হয়েছিল বলে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের সাংবাদিকদের বলেছিলেন।

আওয়ামী লীগের ২২তম জাতীয় সম্মেলন হবে ২৪ ডিসেম্বর।

■ ৪ ডিসেম্বর চট্টগ্রামের পলোগ্রাউন্ডে সমাবেশ  করবে দলটি।

■ আগামী দুই মাসে ঢাকায় ৬-৭টি বড় সমাবেশ করার পরিকল্পনা।

■ ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন আজ।

দলীয় সূত্র বলছে, বিএনপির সমাবেশের চেয়ে বেশি মানুষের উপস্থিতি দেখাতে চায় আওয়ামী লীগ। এ জন্যই পলোগ্রাউন্ডে সমাবেশের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বৈঠকে উপস্থিত একাধিক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, বৈঠকের মূল সুর ছিল দল গোছানো এবং নির্বাচনের প্রস্তুতি নেওয়া। একই সঙ্গে নিজেদের সাংগঠনিক শক্তি আরও বাড়ানো নিয়ে কথা হয়েছে বৈঠকে।

এদিকে বিএনপির সমাবেশ এবং সাংগঠনিক শক্তি দেখানোর পাল্টা হিসেবে আজ শনিবারই শক্তি প্রদর্শনের পরিকল্পনা রয়েছে আওয়ামী লীগের। দলের ঢাকা জেলা কমিটির সম্মেলন হবে রাজধানীর আগারগাঁওয়ের বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলনকেন্দ্রের পাশের মাঠে (আগে যেখানে বাণিজ্য মেলা হতো)। এতে বিপুল জমায়েতের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। এর আগে ঢাকা জেলার সম্মেলন রাজধানীর আশপাশের উপজেলাগুলোতে হয়েছে। এবার রাজধানীতে সম্মেলন করার পেছনে বড় জমায়েত দেখানোর বিষয়টিও কাজ করেছে বলে দলের নেতারা জানিয়েছেন।

গতকাল বিকেলে গণভবনের বৈঠক শুরুর আগে সকালে নিজ বাসায় এক ব্রিফিংয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের উদ্দেশে বলেন, ‘জনসমাগম কাকে বলে, তা আগামীকাল (আজ শনিবার) থেকে বিএনপিকে বুঝিয়ে দেওয়া হবে।’

২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে আওয়ামী লীগকে কার্যত রাজপথে শক্তি দেখানোর প্রয়োজন পড়েনি। করোনার সংক্রমণ শুরুর (২০২০ সালের মার্চে) আগপর্যন্ত সরকার বড় কোনো সংকটেও পড়েনি। এই দীর্ঘ সময় বিরোধী দল বিএনপির রাজনৈতিক তৎপরতা ছিল ঘরের ভেতরে, সংবাদ সম্মেলন ও সভা-সেমিনারে। এ বছরের শুরুর দিকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ও করোনা মহামারির কারণে অর্থনীতিতে সংকট বাড়তে থাকে। এর প্রভাবে দেশে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে। বিদ্যুৎ-সংকট প্রকট হয়েছে। শিল্পকারখানায় গ্যাসের সংকট চলছে। একই সঙ্গে নিত্যপণ্যের দাম দফায় দফায় বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের কষ্ট বেড়েছে। মূলত জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, বিদ্যুৎ-সংকট ও নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় বিএনপি মাঠের আন্দোলনে সক্রিয় হয়েছে। 

বড় সমাবেশ করার ওপর জোর

আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের সূত্রগুলো বলছে, আগামী নির্বাচনে অংশগ্রহণ নয়, বিএনপির মূল লক্ষ্য সরকার পতন। যে কারণে রাজপথে সাংগঠনিক শক্তি দেখানো ছাড়া বিএনপির সামনে বিকল্প কিছু নেই। এটি বিবেচনায় রেখেই বিএনপিকে মোকাবিলার কৌশল ঠিক করা হচ্ছে।

আওয়ামী লীগের একজন দায়িত্বশীল নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, তাঁদের ধারণা ছিল, বিএনপি রাজপথে নামবে আগামী বছরের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে। তখন হয়তো তাদের সঙ্গে নির্বাচন নিয়ে ভেতরে-ভেতরে আলোচনা চলত। কিন্তু তারা আগেভাগে নেমে গিয়ে বড় জমায়েত করছে। দেশে-বিদেশে দেখানোর চেষ্টা করছে, তারা দেশের প্রধান রাজনৈতিক শক্তি হয়ে উঠেছে। বিএনপিকে এই সুযোগ দেবে না সরকার ও আওয়ামী লীগ। আস্তে আস্তে দলটির ওপর চাপ বাড়ানো হবে। পাশাপাশি আওয়ামী লীগকে সংগঠিত করা হবে।

দলীয় সূত্রগুলো বলছে, বাধা ও চাপের মধ্যেও বিএনপির সমাবেশে বিপুল মানুষের উপস্থিতির কারণে একধরনের অস্বস্তি এবং চাপ তৈরি হয়েছে আওয়ামী লীগের তৃণমূলে। তৃণমূলের নেতারা চাইছেন, আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকেও যাতে বড় সমাবেশের আয়োজন করা হয়। দিবসভিত্তিক কর্মসূচি এবং সাংগঠনিক সম্মেলন একটা ধারাবাহিক কর্মসূচি। আওয়ামী লীগ তা এমনিতেই করত। তবে এসব কর্মসূচিতে খুব বড় জমায়েতের পরিকল্পনা ছিল না। এখন বড় সমাবেশের ওপর জোর দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। আগামী দুই মাসে ঢাকায় ছয়-সাতটি বড় সমাবেশ করার পরিকল্পনা রয়েছে।

ঢাকায় আগামী দুই মাসের কর্মসূচির মধ্যে যুবলীগের ৫০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠান হবে ১১ নভেম্বর। এরপর আওয়ামী লীগের সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের মধ্যে পাঁচ-ছয়টি জাতীয় সম্মেলন করা হবে। ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণের সম্মেলন হতে পারে ডিসেম্বরের শুরুতে। এগুলোতে বড় জমায়েত হবে। ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসের দিন আওয়ামী লীগের বিজয় শোভাযাত্রা এবার বড় আকারে করার পরিকল্পনা আছে।

বৈঠক সূত্র জানায়, প্রধানমন্ত্রী সহযোগী সংগঠনের সম্মেলন দ্রুত শেষ করতে নির্দেশ দেন। নতুবা কমিটি ভেঙে দেওয়া হবে বলে জানান। এ সময় দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের সহযোগী সংগঠনের সঙ্গে কথা বলে সম্মেলনের দিন-তারিখ ঠিক করা হবে বলে জানান। 

নির্বাচনের প্রস্তুতি

বৈঠকে উপস্থিত একাধিক সূত্র জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রী দলের নেতাদের ইঙ্গিত দিয়েছেন, বিএনপি শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে অংশ নেবে। আগামী নির্বাচনে কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পড়তে হবে। তিনি এখন থেকেই সম্ভাব্য সেরা প্রার্থী বাছাই শুরু করেছেন। প্রধানমন্ত্রী বৈঠকে বলেন, আওয়ামী লীগ ১৪ বছর ধরে ক্ষমতায় আছে—এটা নেতিবাচকভাবে প্রচার হচ্ছে। কিন্তু ১৪ বছরে যে কাজগুলো হয়েছে, সেটা প্রচার করতে হবে। সরকারের অর্জন নিয়ে একটি বই করা হচ্ছে। সেটা পৌঁছে দিতে হবে। পাশাপাশি বিএনপির অপকর্মও মানুষকে বারবার মনে করিয়ে দিতে হবে।

বৈঠক সূত্র জানায়, ব্যবসায়ীদের মধ্যে সরকারবিরোধী মনোভাব বাড়ছে—এমন আশঙ্কার কথা কোনো কোনো নেতা তাঁদের বক্তব্যে উল্লেখ করেন। এর জবাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ব্যবসায়ীরা বর্তমান সরকারের আমলে সহজে ব্যবসা করতে পারছেন। তাঁরা কখনোই বিএনপিকে চাইবেন না। তিনি সব পেশাজীবীর সঙ্গে দলের নেতাদের যোগাযোগ বাড়াতে বলেছেন। এ ছাড়া তিনি বলেছেন, সরকার ঝুঁকি নিয়ে করোনাভাইরাসের টিকা অগ্রিম টাকা দিয়ে সংগ্রহ করেছে। এমনও তো হতে পারত যে টিকা পরে কার্যকর হয়নি। কিন্তু মানুষের কথা চিন্তা করেই সরকার ঝুঁকি নিয়েছে। এ ছাড়া মহামারিতে বিভিন্ন খাতে সরকার আর্থিক প্রণোদনা দিয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের এসব অর্জন প্রচার করতে নেতাদের বলেছেন তিনি।