জামায়াতের প্রতিশ্রুতি
ইডেন, বদরুন্নেসা ও হোম ইকোনমিকস নিয়ে বিশ্বের সর্ববৃহৎ নারী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হবে
ক্ষমতায় গেলে রাজধানীর ইডেন মহিলা কলেজ, বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজে ও হোম ইকোনমিকস কলেজকে (বাংলাদেশ গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজ) একীভূত করে বিশ্বের সর্ববৃহৎ নারী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করবে জামায়াতে ইসলামী। এ ছাড়া জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন বড় কলেজগুলোকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর করা হবে বলেও ঘোষণা দিয়েছে দলটি।
আজ মঙ্গলবার রাজধানীর একটি হোটেলে জামায়াত আয়োজিত ‘পলিসি সামিট ২০২৬’–এ দলটির পক্ষ থেকে এসব প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।
জামায়াতের পক্ষ থেকে বলা হয়, মেধার ভিত্তিতে সকল নিয়োগ হবে, ৬০ বছরের ঊর্ধ্বে বয়স্ক ও ৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য বিনা মূল্যে স্বাস্থ্যসেবা, ৬৪ জেলায় ৬৪টি বিশেষায়িত হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করা হবে। তা ছাড়া শিক্ষাজীবন শেষে চাকরি পাওয়া পর্যন্ত ৫ লাখ বেকার গ্র্যাজুয়েটকে সর্বোচ্চ ২ বছর পর্যন্ত মাসিক ১০ হাজার টাকা করে সুদমুক্ত ঋণ দেওয়া হবে। সেই সঙ্গে মেধা ও প্রয়োজনের ভিত্তিতে ১ লাখ শিক্ষার্থীর জন্য মাসিক ১০ হাজার টাকা করে সুদমুক্ত শিক্ষাঋণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে দলটি।
সম্মেলনে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে বলা হয়, জামায়াত ক্ষমতায় গেলে দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ঘোষণা করবে। ট্যাক্স ও ভ্যাট (মূল্য সংযোজন কর) বর্তমান হার থেকে ক্রমান্বয়ে কমিয়ে দীর্ঘ মেয়াদে ট্যাক্স ১৯ শতাংশ ও ভ্যাট ১০ শতাংশে নিয়ে আসা হবে এবং স্মার্ট সোশ্যাল সিকিউরিটি কার্ড (এনআইডি, টিআইএন, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সেবা এক কার্ডে) চালু করা হবে।
আগামী তিন বছরে শিল্পে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির চার্জ বাড়ানো হবে না বলেও প্রতিশ্রুতি দিয়েছে জামায়াত। এ ছাড়া বন্ধ কলকারখানা পাবলিক–প্রাইভেট পার্টনারশিপে চালু এবং ১০ শতাংশ মালিকানা শ্রমিকদের প্রদান, ব্যবসাবান্ধব নীতি প্রণয়ন, সহজ লাইসেন্সিং ব্যবস্থা, ক্ষুদ্র ও মাঝারি কৃষকদের জন্য সুদবিহীন ঋণসুবিধা দেওয়ার কথা বলেছে দলটি।
প্রতিবছর বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার জন্য ১০০ শিক্ষার্থীকে সুদমুক্ত শিক্ষাঋণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছে জামায়াতের পক্ষ থেকে। মেধাবী গরিবের সন্তানও যেন হার্ভার্ড, এমআইটি, অক্সফোর্ড, কেমব্রিজে পড়তে পারেন, সেই চেষ্টা করা হবে বলে দলটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
‘ফার্স্ট থাউজেন্ড ডেইজ প্রোগ্রাম’-এর আওতায় গর্ভধারণ থেকে শুরু করে শিশুর দুই বছর বয়স পর্যন্ত মা ও শিশুর প্রাথমিক স্বাস্থ্য ও পুষ্টির নিরাপত্তাকে সামাজিক নিরাপত্তার আওতায় নিয়ে আসাও জামায়াতের লক্ষ্য হিসেবে রাখা হয়েছে।
তরুণদের জন্য জামায়াতের পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে, দক্ষ জনশক্তি ও জব প্লেসমেন্টের জন্য নতুন মন্ত্রণালয় সৃষ্টি, ৫ বছরে ১০ মিলিয়ন (১ কোটি) তরুণকে বাজারভিত্তিক স্কিল প্রশিক্ষণ দেওয়া, প্রতিটি উপজেলায় গ্র্যাজুয়েটদের জন্য ‘ইয়ুথ টেক ল্যাব’ স্থাপন, প্রতিটি জেলায় ‘জেলা জব ইয়ুথ ব্যাংক’ গঠন করে ৫ বছরে ৫ মিলিয়ন (৫০ লাখ) জব এক্সেস নিশ্চিত; নারী, তরুণ ও অবহেলিত জনগোষ্ঠীকে প্রাধান্য দিয়ে ৫ লাখ উদ্যোক্তা তৈরি, ১.৫ মিলিয়ন (১৫ লাখ ফ্রিল্যান্সার তৈরি, স্বল্পশিক্ষিত যুবকদের জন্য উপযোগী স্কিল ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম চালু করা।
আইসিটি সেক্টরের (তথ্যপ্রযুক্তি খাত) উন্নয়নে ‘ভিশন ২০৪০’ ঘোষণা করেছে জামায়াত। দলটি ২০৩০ সালের মধ্যে ২ মিলিয়ন (২০ লাখ) আইসিটি সম্পৃক্ত জব সৃষ্টি ও প্লেসমেন্ট, ফ্রিল্যান্সার ও ডিজিটাল রপ্তানির জন্য ন্যাশনাল পেমেন্ট গেটওয়ে স্থাপন, আইসিটি সেক্টর থেকে ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রপ্তানি আয়, আইসিটি খাতে সরকারের ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয় সাশ্রয় এবং শ্রমনির্ভর অর্থনীতি থেকে জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতিতে রূপান্তরের লক্ষ্যমাত্রার কথা জানিয়েছে।
জামায়াতের রেমিট্যান্স–সংক্রান্ত প্রতিশ্রুতির মধ্যে রয়েছে দক্ষ জনশক্তির মাধ্যমে পাঁচ-সাত বছরের মধ্যে রেমিট্যান্স আয় দুই থেকে তিন গুণ বৃদ্ধি করা হবে, অর্থনৈতিক রেমিট্যান্সের পাশাপাশি ‘ইন্টেলেকচুয়াল রেমিট্যান্স’ হিসেবে প্রবাসী বাংলাদেশি প্রফেশনাল, গবেষক, শিক্ষকদের দেশে নিয়ে আসা হবে।
সকালে রাজধানীর ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলের বলরুমে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ‘পলিসি সামিট ২০২৬’ অনুষ্ঠিত হয়। পলিসি সামিটে বিভিন্ন প্যানেল ডিসকাশনে নতুন বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে পলিসি ঘোষণা করা হয়।
সম্মেলনে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত, রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতা, বুদ্ধিজীবী, শিক্ষাবিদ, বিশিষ্ট সম্পাদক ও সাংবাদিক নেতা, গবেষকসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, চীন, ভারত, পাকিস্তান, কসোভো, তুরস্ক, মালয়েশিয়া, শ্রীলঙ্কা, ব্রুনেই, অস্ট্রেলিয়া, ইতালি, ডেনমার্ক, সিঙ্গাপুর, ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া, মালদ্বীপ, ইরান, কানাডা, ফিলিস্তিন, আফগানিস্তান, লিবিয়া, আলজেরিয়া, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ফ্রান্স, জার্মানি, জাপান, নরওয়ে, সুইডেন, নেদারল্যান্ডস, দক্ষিণ কোরিয়া, ভুটান, থাইল্যান্ড, সুইজারল্যান্ড, স্পেন, ব্রাজিল, জাতিসংঘ, ইউএনডিপি, আইআরআইসহ বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থার রাষ্ট্রদূত, হাইকমিশনার ও কূটনীতিবিদেরা সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন।
আরও উপস্থিত ছিলেন সিপিডির ডিস্টিংগুইশড ফেলো ও প্রথম নির্বাহী পরিচালক দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী শাহদীন মালিক, সাবেক সংসদ সদস্য মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান, ইবনে সিনা ট্রাস্টের সদস্য (প্রশাসন) অধ্যাপক এ কে এম সাদরুল ইসলাম, ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম, প্রথম আলোর নির্বাহী সম্পাদক সাজ্জাদ শরিফ, প্রবীণ সম্পাদক আবুল আসাদ, দৈনিক নয়াদিগন্ত সম্পাদক সালাউদ্দিন বাবর, দ্য নিউ নেশন সম্পাদক মোকাররম হোসেন, ডিইউজের সভাপতি ও দৈনিক মানবকণ্ঠের সম্পাদক মোহাম্মদ শহিদুল ইসলাম, ডিইউজের সাধারণ সম্পাদক খুরশীদ আলমসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমের নেতারা।
জামায়াত নেতাদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন দলটির নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের ও মাওলানা আ ন ম শামসুল ইসলাম, সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা এ টি এম মা’ছুম, মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান, হামিদুর রহমান আযাদ, মাওলানা আবদুল হালিম ও এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন ও মোবারক হোসাইন।