সিপিবির মিছিলে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেওয়ার অভিযোগ তুলে হামলা

হামলার পর বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে পুলিশের অবস্থান। সোমবার রাত ১১টার দিকেছবি: প্রথম আলো

সুনামগঞ্জে নারী বাউলশিল্পীদের গান গাইতে বাধা দেওয়ার প্রতিবাদে ঢাকার ধানমন্ডিতে মানববন্ধন করতে গিয়ে আটক ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি দীপক শীলের মুক্তির পর বিক্ষোভ মিছিল বের করেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) নেতা-কর্মীরা। রাজধানীর পুরানা পল্টন এলাকায় এই মিছিলে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেওয়া হয়েছে অভিযোগ তুলে সেখানে হামলা করা হয়। যুবদল ও ছাত্রদলের নেতা-কর্মী পরিচয় দিয়ে এই হামলা করা হয়েছে বলে সিপিবি নেতারা জানিয়েছেন।

সোমবার রাত ১০টার দিকে এই হামলা শুরু হওয়ার পর প্রায় এক ঘণ্টা হামলাকারীরা পুরানা পল্টনে সিপিবির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নিয়ে নানা স্লোগান দেন। এ সময় তাঁরা সিপিবির দুজন নেতা-কর্মীকে মারধরও করেন। পরে পুলিশ এসে তাঁদের উদ্ধার করে।

রাত সাড়ে ১১টার দিকে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, সিপিবির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে পুলিশ অবস্থান নিয়েছে। পাশেই সিপিবির কয়েকজন নেতা–কর্মী অবস্থান করছেন।

সিপিবি নেতারা জানান, দীপক শীলের মুক্তির পর তাঁকে নিয়ে সিপিবির নেতা-কর্মীদের মিছিলটি দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সামনে থেকে শুরু হয়ে পল্টন মোড়ে গিয়ে শেষ হয়। পরে সেখানে একটি সংক্ষিপ্ত সমাবেশ হচ্ছিল। সমাবেশে ‘জয় বাংলা, জয় সমাজতন্ত্র’ স্লোগান দেওয়া হয়। এমন সময় যুবদল, ছাত্রদল পরিচয় দেওয়া ৪০ থেকে ৫০ জন লোক ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেওয়ায় আপত্তি তোলেন। এ নিয়ে তাঁদের মধ্যে কথা-কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে যুবদল–ছাত্রদলের নেতা–কর্মী পরিচয় দেওয়া ব্যক্তিরা ‘আওয়ামী লীগের ঠিকানা, এই বাংলায় হবে না’ এমন স্লোগান দেন। এভাবে কিছুক্ষণ চলার পর তাঁরা সিপিবির দুজন নেতা-কর্মীকে মারধর করেন।

সিপিবির নেতা–কর্মীরা আরও জানান, মারধর করার পর পল্টন মোড় থেকে সিপিবির নেতা–কর্মীরা তাঁদের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে আসেন। সেখানেও কিছুক্ষণ দুই পক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। পরে হামলাকারীরা লাঠিসোঁটা নিয়ে সিপিবির কেন্দ্রীয় কার্যালয়টির সামনে অবস্থান নিয়ে নানা স্লোগান দেন। রাত ১১টার পর তাঁরা চলে যান।

এ বিষয়ে সিপিবির প্রেসিডিয়াম সদস্য জলি তালুকদার প্রথম আলোকে বলেন, সিপিবি জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ভূমিকা রাখার পরও তাঁদের ওপর হামলা করা হয়েছে। সরকারকে নিজের দলের লোকজনকে সামলাতে হবে। একটা রাজনৈতিক দলের কার্যালয়ের সামনে এসে তাঁরা কীভাবে হামলা চালান?

হামলার পর সিপিবির সদস্য ইরান মোল্লা ও সোহেল ফকিরকে পুলিশ আটক করে নিয়ে গেছে বলে অভিযোগ করেন জলি তালুকদার। তবে আটকের বিষয়টি অস্বীকার করেছেন পল্টন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরিফুল আলম। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি দীপক শীলের মুক্তির পর ১৫-২০ জন পল্টন এলাকায় একটা মিছিল বের করেন। ওই মিছিলে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেওয়া হয়েছে, স্থানীয় কিছু লোকজন এমন অভিযোগ তোলেন। পরে তাঁদের সঙ্গে বাগ্‌বিতণ্ডা হয়। সিপিবির অফিস ভাঙচুর বা কাউকে আটক করা হয়নি।

এই হামলার বিষয়ে জানতে চাইলে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন প্রথম আলোকে বলেন, ‘সিপিবির কার্যালয়ে ছাত্রদলের কোনো নেতা-কর্মী বিক্ষোভ দেখাতে গেছেন, এমন কোনো ঘটনার বিষয়ে আমরা অবগত নই। ছাত্রদলের পক্ষ থেকে কোনো নেতা-কর্মীর প্রতি এ ধরনের কোনো নির্দেশনাও নেই। আসলে বিষয়টি কী, তা আমরা খোঁজখবর নিয়ে দেখছি।’

এ ঘটনা নিয়ে রাত সোয়া ১২টার দিকে সিপিবির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন দলটির সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন। তিনি বলেন, ‘২০২৫ সালের ১৫ মার্চ ঘোষণা দিয়ে আমাদের পার্টি অফিসে হামলার চেষ্টা করা হয়েছিল। যারা মুক্তিযুদ্ধের সময় দেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে ছিল, তারা ওই হামলার চেষ্টা করেছিল। আমাদের প্রতিরোধের মুখে তারা সফল হতে পারেনি। আজকের হামলার মধ্য দিয়ে তারা সেই ব্যর্থতার আক্রোশ মেটাতে চায় বলে আমাদের মনে হচ্ছে।’

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে সিপিবির ভূমিকার কথা উল্লেখ করে আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন বলেন, ‘২০২৪ সালের ২৬ জুলাই কারফিউ ভেঙে আমরা ঢাকার রাজপথে মিছিল করেছিলাম। ২ আগস্ট আমরা দ্রোহযাত্রা করেছিলাম। অথচ আজ আমাদের বলা হচ্ছে, আমরা নাকি ফ্যাসিস্টের দোসর, পতিত সরকারের দোসর। যারা এসব বলছে, তারা ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের চেষ্টা করছে।’

সিপিবির সাধারণ সম্পাদক আরও বলেন, ‘এরশাদের আমলে আমাদের এই অফিসে হামলা হয়েছিল। ২০১৩ সালের ৫ মে গানপাউডার দিয়ে পার্টি অফিসের তিনতলা পর্যন্ত পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। পাকিস্তান আমলে ২৩ বছর আমাদের পার্টিকে নিষিদ্ধ রাখা হয়েছিল। ১৯৭৭ সালে জিয়াউর রহমানও আমাদের পার্টি নিষিদ্ধ করেছিলেন; কিন্তু কেউ আমাদের পার্টিকে নিশ্চিহ্ন করতে পারেনি।’

হামলার পর সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন সিপিবির সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন। সোমবার দিবাগত রাত সাড়ে ১২টায়
ছবি: প্রথম আলো

হামলাকারীদের উদ্দেশে সিপিবির সাধারণ সম্পাদক বলেন, ‘গভীর রাতে হামলা করতে এসেছিল। কিন্তু আমাদের কমরেডরা নিজ নিজ এলাকা থেকে এসে পার্টি অফিস রক্ষা করেছেন। আমরা জীবন দেব, তবু কমিউনিস্ট পার্টির ওপর কোনো আক্রমণ বরদাশত করব না।’ তিনি বলেন, ‘যারা মব তৈরি করে মাজার ভেঙেছে, পত্রিকা অফিস পুড়িয়ে দিয়েছে, পার্টি অফিস ভেঙেছে, তাদের বলে দিতে চাই—মব করে কমিউনিস্ট পার্টির কোনো ক্ষতি করতে পারবেন না।’

হামলার কারণ সম্পর্কে আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন বলেন, ‘আমাদের একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। তাঁর নাম দীপক শীল, তিনি ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক নেতা। তাঁর মুক্তির পর এখানে একটি মিছিল হয়েছিল বলে শুনেছি। সেই মিছিলে জয় সমাজতন্ত্র ও জয় সর্বহারা স্লোগান দেওয়া হয়েছিল। হামলাকারীরা ওই স্লোগানের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে হামলা করে থাকতে পারে। তবে কোনো স্লোগানই পার্টি অফিসে হামলার অজুহাত হতে পারে না।’

‘জয় বাংলা’ স্লোগান প্রসঙ্গে সিপিবির সাধারণ সম্পাদক বলেন, ‘”জয় বাংলা” আমাদের মুক্তিযুদ্ধের স্লোগান। আওয়ামী লীগ “জয় বাংলা” বলে অনেক অন্যায় করেছে, তার মানে এই নয় যে আমরা “জয় বাংলা” স্লোগান ছেড়ে দেব। কেউ আমাদের মিছিল থেকে “জয় বাংলা” স্লোগান দিয়ে থাকলেও তা কমিউনিস্ট পার্টির অফিসে হামলার অজুহাত হতে পারে না।’ হামলাকারীদের পরিচয় সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘যারা হামলা করেছে, তারা নিজেদের একটি দলের লোক বলে পরিচয় দিয়েছে। তবে সেই পরিচয় সত্য কি না, আমরা নিশ্চিত নই। স্থানীয় সরকারদলীয় নেতাদের সঙ্গে কথা বলেছি। হামলাকারীরা তাঁদের দলের লোক নন বলে জানিয়েছেন।’

আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন বলেন, হামলার বিষয়ে তাঁরা সিসিটিভি ফুটেজ দেখবেন। প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করে পরবর্তী সময়ে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে বিস্তারিত জানাবেন।

আরও পড়ুন