গণশুনানি ছাড়া জ্বালানির দাম বাড়ানো নিয়ে সংসদীয় কমিটিতে প্রশ্ন

জাতীয় সংসদ ভবনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ১০ অক্টোবরছবি: সংসদ সচিবালয়ের সৌজন্যে

বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্যাপাসিটি চার্জের যৌক্তিকতা এবং গণশুনানি ছাড়া জ্বালানির দাম বাড়ানোর বিষয়ে সংসদীয় কমিটিতে প্রশ্নের মুখে পড়েছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়। আইন অনুযায়ী ২৩ বছরেও জ্বালানির দাম নির্ধারণে গণশুনানি-সংক্রান্ত প্রবিধান তৈরি না হওয়ায় এর কারণ জানতে চেয়েছেন সংসদীয় কমিটির এক সদস্য। আরেক সদস্য বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রকৃত উৎপাদন সক্ষমতা যাচাই এবং ক্যাপাসিটি চার্জের যৌক্তিকতা নির্ধারণে ফরেনসিক অডিটের দাবি জানিয়েছেন।

আজ শনিবার জাতীয় সংসদ ভবনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক শেষে কমিটির সদস্য জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য নাজিবুর রহমান এবং এনসিপির সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ বৈঠক বিষয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন।

বৈঠকে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়, বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে ২০০৯ সাল থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত ২ লাখ ৮৯ হাজার ৯৪৯ কোটি টাকা ক্যাপাসিটি চার্জ দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে নাজিবুর রহমান বলেন, ক্যাপাসিটি চার্জ নিয়ে হাইকোর্টে একটি মামলার রায় হয়েছে। পরে একটি তদন্ত কমিটি করা হয়েছিল। সে কিমিটির সুপারিশ কী ছিল, সুপারিশ কতটুকু বাস্তবায়ন হয়েছে—এ বিষয়ে পরবর্তী বৈঠকে জানাতে বলা হয়েছে।

বৈঠক শেষে কমিটির সদস্য জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য নাজিবুর রহমান এবং এনসিপির সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। ১০ অক্টোবর
ছবি: রিয়াদুল করিম

নাজিবুর রহমান বলেন, ২০০৩ সালের বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন আইনের ৩৪ ধারায় বলা আছে, কমিশন শুনানির মাধ্যমে জ্বালানির দাম নির্ধারণ করবে। এ জন্য তারা একটি প্রবিধান তৈরি করবে। গত ২৩ বছরে কেন এ প্রবিধান তৈরি করা হলো না—তা তাঁরা বৈঠকে জানতে চেয়েছেন। মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে কোনো সদুত্তর দিতে পারেনি। তাঁরা জানতে চেয়েছেন, সম্প্রতি এলপিজির দাম বাড়ানো, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে গণশুনানি করা হয়েছে কি না—এসব বিষয়ে তাঁরা প্রশ্ন তুলেছেন। ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের অগ্রগতি কতটুকু, সে বিষয়েও সুনির্দিষ্ট তথ্য বৈঠকে দিতে পারেনি।

কমিটির আরেক সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ সাংবাদিকদের বলেন, ডিজেল হচ্ছে কৌশলগত জ্বালানি। ডিজেলের মজুত আছে মাত্র ৩১ দিনের। এটাকে কীভাবে বাড়ানো যায়, তারা সেটা দেখতে বলেছেন। এখন ২৯ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা আছে। কিন্তু উৎপাদন হচ্ছে ১৪ হাজার মেগাওয়াট। এখন পর্যন্ত ২ লাখ ৮৯ হাজার কোটি টাকা ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হয়েছে। তাঁরা এ বিষয়ে ফরেনসিক অডিটের কথা বলেছেন।

হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেন, রান্নার এলপিজির সিলিন্ডার এখন ২ হাজার ৫০০-৬০০ টাকায় কিনতে হচ্ছে। বাজারে সরকার অনুপস্থিত, কোনো নজরদারি নেই। তাঁরা সরকারের নজরদারি বাড়ানোর কথা বলেছেন।

হাসনাত আব্দুল্লাহ দাবি করেন, ভবনের ছাদে ৫০ মেগাওয়াটের একটি সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনায় ১৫০ কোটি টাকার মতো খরচ হওয়ার কথা। কিন্তু সরকারের প্রকল্পে দেখা যাচ্ছে, এ ধরনের প্রকল্পের খরচ ধরা হয়েছে ৩৫০ কোটি টাকার ওপরে। তাঁরা মন্ত্রণালয়কে আগামী বৈঠকে এ ধরনের প্রকল্পে কোন খাতে কত খরচ ধরা হয়েছে, তার বিবরণ দিতে বলেছেন। তিনি বলেন, বিটিভি ও বাসসকে ব্যবহার করে এক ধরনের অসত্য তথ্য প্রচার করা হয়েছে যে সরকার এই কিছুদিনের মধ্যে ৩২টি গ্যাস কূপ খনন করেছে। এগুলো কোথায় তা জানানো উচিত।

বৈঠক শেষে সংসদ সচিবালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ভবনের ছাদের সোলার প্যানেল থেকে কতটুকু বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হচ্ছে, তা আগামী বৈঠকে উপস্থাপনের সুপারিশ করেছে কমিটি। বৈঠকে জানানো হয়, বর্তমানে দেশে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ১২ হাজার ২২ মেগাওয়াট। আর প্রকৃত উৎপাদন ৪ হাজার থেকে ৫ হাজার মেগাওয়াট। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ সক্ষমতা ৬ হাজার ৯২৭ মেগাওয়াট, আর প্রকৃত উৎপাদন ৫-৬ হাজার মেগাওয়াট। তরল জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ সক্ষমতা ৬ হাজার ৪০৯ মেগাওয়াট আর প্রকৃত উৎপাদন আড়াই থেকে তিন হাজার মেগাওয়াট।

কমিটির সভাপতি মিয়া নুরুদ্দিন আহাম্মেদ অপুর সভাপতিত্বে জাতীয় সংসদ ভবনে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। কমিটির সদস্যদের মধ্যে বৈঠকে অংশ নেন বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ, প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, মোহাম্মদ কয়ছর আহমেদ, রফিকুল ইসলাম হিলালী, এস এম জাহাঙ্গীর হোসেন, নায়াব ইউসুফ আহমেদ, মমতাজ আলো, মোহাম্মদ নাজিবুর রহমান এবং মো. আবুল হাসনাত (হাসনাত আব্দুল্লাহ)।