লালফিতা ও টাকা পাচারের বিরুদ্ধে প্রতিশ্রুতি চাইলেন ব্যবসায়ীরা, জামায়াতের আশ্বাস

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে মতবিনিময় সভায় দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তারা। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় রাজধানীর বনানীর একটি হোটেলেছবি: জামায়াতে ইসলামীর ফেসবুক পেজ থেকে নেওয়া

বাংলাদেশে ব্যবসার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি আমলাতান্ত্রিক জটিলতা। সরকারি দপ্তরে লালফিতার দৌরাত্ম্যের কারণে ব্যবসায়ীরা হয়রানি ও অর্থনৈতিক ক্ষতির শিকার হন। আবার বিদেশে অর্থ পাচারের কারণে তাঁরা প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যাংক থেকে পর্যাপ্ত ঋণ নিতে পারছেন না। অর্থনীতিতে আরও গতি আনতে এসব সমস্যার সমাধানে যথাযথ উদ্যোগ নিতে হবে।

বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় রাজধানীর বনানীর একটি হোটেলে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় এ কথাগুলো বলেন দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তারা। নির্বাচনে জয়ী হয়ে জামায়াত সরকার গঠন করতে পারলে লালফিতার দৌরাত্ম্য ও টাকা পাচারের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে—এমন প্রতিশ্রুতি চান তাঁরা।

এ প্রসঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান বলেন, ক্ষমতায় গেলে লালফিতার দৌরাত্ম্য বন্ধ করে ঘুষ ও চাঁদাবাজিমুক্ত একটি ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা হবে। তিনি বলেন, জনগণ ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করলে এই সম্মানের মর্যাদা রাখা হবে। ঘুষ, চাঁদাবাজি, লালফিতার দৌরাত্ম্য বন্ধ করা হবে।

‘সমৃদ্ধির সংলাপ: বাংলাদেশের শিল্প ও বাণিজ্যের জন্য কৌশলগত ভাবনা’ শীর্ষক এ মতবিনিময় সভায় ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স (আইসিসি) বাংলাদেশের সভাপতি মাহবুবুর রহমান, ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি মীর নাসির হোসেন, এ কে আজাদ ও মো. জসিম উদ্দিন, বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার উল আলম চৌধুরী পারভেজ, মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোস্তফা কামাল, বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি ফজলুল হক, বারভিডার সভাপতি আবদুল হকসহ বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতারা সভায় উপস্থিত ছিলেন। সভায় ‘বাংলাদেশের জন্য ব্যবসাবান্ধব অর্থনৈতিক নীতি প্রণয়ন’ বিষয়ে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং ও ফিন্যান্স বিভাগের অধ্যাপক এ কে এম ওয়ারেসুল করিম।

সভার শুরুতে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান বলেন, তাঁর দল দেশ পরিচালনার সুযোগ পেলে লালফিতা কারও হাতে থাকতে দেবে না। লালফিতাকে কাঁচি দিয়ে কেটে টুকরা টুকরা করা হবে। তিনি বলেন, ঘুষকে ‘স্পিড মানি’ নামে বৈধ করার সংস্কৃতি শিল্প খাতকে প্রথম ধাক্কা দেয়। শিল্পেদ্যোক্তারা ঘুষের কারণে ব্যবসা করতে গিয়ে বিপাকে পড়েন। চাঁদাবাজেরা ব্যবসায়ীদের রাতের ঘুম হারাম করে দেয়। নির্ধারিত সময়ে কারখানা চালু করা না গেলেও ব্যাংকঋণের সুদ চলতে থাকে। এতে উদ্যোক্তা শুরুতেই ক্ষতিগ্রস্ত হন। এ পরিস্থিতি চিরতরে বদলাতে হবে।

দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী ও শিল্প উদ্যোক্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় বক্তব্য দিচ্ছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান।বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় রাজধানীর বনানীর একটি হোটেলে
ছবি: প্রথম আলো

জামায়াতের আমির বলেন, ঘুষের কারণে দেশি ব্যবসায়ীরা ইচ্ছা ও সম্পদ থাকা সত্ত্বেও বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হন না। দেশি বিনিয়োগকারীরা যদি নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন, তাহলে বিদেশি বিনিয়োগ আসবে কেন—রাষ্ট্রকে আগে এ প্রশ্নের সমাধান করতে হবে।

শফিকুর রহমান বলেন, অবৈধভাবে বিদেশে পাচার করা অর্থ সম্মানের সঙ্গে দেশে ফিরিয়ে আনতে আহ্বান জানানো হবে। কাউকে অপমান করার জন্য নয়, এর উদ্দেশ্য জাতির কল্যাণ। যাঁরা অর্থ ফেরত দেবেন, রাষ্ট্র তাঁদের সম্মান দেবে।

তহবিলের নিরাপত্তাহীনতা, সম্পদের সুরক্ষার অভাব এবং রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার ঘাটতিকে শিল্পমালিকদের প্রধান তিনটি সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেন জামায়াত আমির। মতবিনিময় সভায় জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহেরসহ দলটির নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

আরও পড়ুন

ব্যবসায়ীরা যা বললেন

অনুষ্ঠানে আইসিসি বাংলাদেশের সভাপতি মাহবুবুর রহমান বলেন, সামনে জাতীয় নির্বাচন। নতুন সরকার গঠিত হলে সরকারের সঙ্গে বেসরকারি খাতকে একই টেবিলে বসে কাজ করতে হবে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে গত দেড় বছরে সরকার যেন বেসরকারি খাত থেকে অনেকটাই দূরে সরে গেছে। এই দূরত্ব বজায় থাকলে দেশি বা বিদেশি কোনো বিনিয়োগই টেকসইভাবে আসবে না। তিনি বলেন, ‘আশা করব বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীসহ সব রাজনৈতিক দল সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজ করবে। একই সঙ্গে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির প্রতি সতর্ক থাকবে। কোনো অবস্থাতেই ব্যবসা-বাণিজ্য ব্যাহত হতে দেওয়া যাবে না।’

জামায়াত নেতাদের উদ্দেশে এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি এ কে আজাদ বলেন, ‘আপনারা হয় সরকারে থাকবেন, না হয় বিরোধী দলে থাকবেন। মাঝামাঝি কোনো অবস্থান নেই, এটা নিশ্চিত। তাই বলতে চাই, লালফিতার কথা অনেকেই বলেছেন। আমার কাছে মনে হয়, লালফিতা কোনো সমস্যা নয়, সমস্যা হচ্ছে রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব। সরকার যদি চায়, লালফিতা পায়ের নিচে থাকবে।’

এ কে আজাদ বলেন, ‘বেসরকারি খাত কর্মসংস্থান তৈরির জন্য ব্যাংক থেকে ঋণ পাচ্ছে না। এ জন্য ব্যবসায়ী ও সরকার—দুই পক্ষই দায়ী। কারণ, টাকা বিদেশে গেছে। যারা টাকা পাচার করেছে, দেশের সম্পদ বিদেশে নিয়ে গেছে, তাদের অবশ্যই শাস্তির আওতায় আনতে হবে। এই কমিটমেন্ট (প্রতিশ্রুতি) আপনাদের কাছ থেকে চাই।’

বৈঠকে উপস্থিত ব্যবসায়ীদের একাংশ।বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় রাজধানীর বনানীর একটি হোটেলে
ছবি: প্রথম আলো

এফবিসিসিআইয়ের আরেক সাবেক সভাপতি মো. জসিম উদ্দিন বলেন, একটি তৈরি পোশাক বা উৎপাদন শিল্প স্থাপনের ক্ষেত্রে যেখানে একটি নিরবচ্ছিন্ন ইউটিলিটি লাইন থাকা যথেষ্ট, বাস্তবে সেখানে উদ্যোক্তাকে একাধিক বিকল্প ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। ফলে যে বিনিয়োগ সরাসরি উৎপাদন খাতে যাওয়ার কথা ছিল, তার বড় একটি অংশ ব্যয় হয়ে যাচ্ছে শুধু ইউটিলিটি ব্যবস্থাপনায়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, যেখানে একটি কারখানায় ৫ কোটি টাকা বিনিয়োগের পরিকল্পনা ছিল, সেখানে ইউটিলিটি নিশ্চিত করতেই খরচ হয়ে যাচ্ছে ৫০ কোটি টাকা পর্যন্ত। এই বিপুল অর্থের বড় অংশ আসে ব্যাংকঋণ থেকে, ফলে সুদের বোঝা বাড়ে, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পায় এবং শেষ পর্যন্ত শিল্পটি আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। এ বিষয়ে রাজনৈতিক দলের কাছে নীতি সহায়তা প্রত্যাশা করেন তিনি।

মেঘনা গ্রুপের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোস্তফা কামাল বলেন, ‘লালফিতা বা রেড টেপ—এটা নিয়ে আমি খুব স্পষ্ট করে বলতে চাই। লালফিতা শুধু আছে তা নয়, এটি এখন এত ভারী হয়ে গেছে যে এটাকে কাটতে গেলে একটা–দুটো কাঁচি দিয়ে হবে না—অনেক বড় কাঁচি লাগবে।’

ব্যুরোক্রেসি (আমলাতন্ত্র) আজ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা উল্লেখ করে মোস্তফা কামাল বলেন, ‘এই ব্যুরোক্রেসি এখন এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে তারা কার্যত রেগুলেটর নয়—তারা রাজা আর আমরা প্রজা। তহসিলদার থেকে শুরু করে সচিব পর্যন্ত এই মানসিকতা বিস্তৃত। আমাদের সম্পদ আছে, মানুষ আছে, উদ্যোক্তারা অত্যন্ত অ্যাগ্রেসিভ ও উদ্যমী। সমস্যা একটাই—আমাদের কাজ করতে দেওয়া হয় না। এ জন্য আল্লাহর ওয়াস্তে অনুরোধ করছি, যাঁরাই ক্ষমতায় আসবেন, ব্যুরোক্রেসিকে নিয়ন্ত্রণে আনুন, আইন–কানুন সংক্ষিপ্ত ও সহজ করুন, পারমিশনের জট কমান।’

ব্যবসায়ীদের চলাফেরা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার কথা বলেন বিসিআই সভাপতি আনোয়ার উল আলম চৌধুরী পারভেজ। তিনি বলেন, ‘আমরা সবাই এ দেশের নাগরিক। আমরা যেখানে খুশি যেতে পারি, কথা বলতে পারি, মতপ্রকাশ করতে পারি। কিন্তু কেন আমি কোথায় গেলাম, কোথায় গেলাম না—এই প্রশ্নে আমাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হবে, এই ভয়টা কাজ করে। এটা কোনো স্বাধীনতার লক্ষণ হতে পারে না। আমাকে কথা বলার সুযোগ দিতে হবে। এই সুযোগ, এই স্বাধীনতা, এই নিরাপত্তা—আমরা সবাই আমাদের রাজনীতিবিদদের কাছ থেকে আশা করি। ব্যবসা করতে হলে আগে এই স্বস্তিবোধ, সুরক্ষা ও সম্মান নিশ্চিত করতে হবে।’

নিট পোশাক মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি ফজলুল হক বলেন, দেশে সরকারি সহায়তা আছে, কিন্তু সেটি বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই নিয়ন্ত্রণমূলক; প্রতিযোগিতাবান্ধব নয়। যদি সত্যিকার অর্থেই আমলাতান্ত্রিক জটিলতা বা ‘রেড টেপ’ ভাঙা যায়, তাহলে শুধু গার্মেন্ট খাত নয়, পুরো শিল্প খাত অনেক দূর এগিয়ে যাবে।
বাংলাদেশ ওষুধশিল্প সমিতির মহাসচিব মোহাম্মদ জাকির হোসেন বলেন, ব্যবসায়ীদের জনগণের শত্রু নয়, উন্নয়নের অংশীদার হিসেবে দেখতে হবে। নীতিমালা প্রণয়নে ব্যবসায়ীদের যুক্ত করা প্রয়োজন। ওষুধশিল্পে ব্যবসা করতে ৪৭টি লাইসেন্স ও নিয়মিত নবায়ন বড় বাধা। আমলাতান্ত্রিক দুর্নীতি ও হয়রানির কারণে উদ্যোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

আদ-দ্বীন মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের চেয়ারম্যান এবং বেসরকারি মেডিকেল কলেজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শেখ মহিউদ্দিন বলেন, ‘ব্যবসায়ীদের কোনো দল নেই, তারা শুধু নিরাপদ পরিবেশ চায়। যে দল ক্ষমতায় থাকবে, রাষ্ট্র পরিচালনা করবে, তার কাছ থেকে আমরা শুধু একটি বিষয় চাই, আমাদের কোনো উপকারের দরকার নেই; শুধু ক্ষতি করবেন না।’

মেট্রোপলিটন চেম্বারের (এমসিসিআই) জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি হাবিবুল্লাহ এন করিম বলেন, বাংলাদেশ আজ একটি পরিবর্তনের সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। রাজনীতি, প্রশাসনিক কাঠামোতে একটি গুণগত পরিবর্তন আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। ভবিষ্যৎ নীতিনির্ধারকদের প্রতি অনুরোধ থাকবে, তথ্যপ্রযুক্তি খাতকে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করুন। এই খাতের সম্ভাবনাকে রাষ্ট্রীয় নীতিতে, উন্নয়ন দর্শনে এবং রাজনৈতিক অঙ্গীকারে প্রতিফলিত করুন।

রিকন্ডিশন্ড গাড়ি আমদানিকারক ব্যবসায়ীদের সংগঠন বারভিডার সভাপতি আবদুল হক বলেন, বাংলাদেশের লাখ লাখ সৎ ব্যবসায়ীকে এক কাতারে ফেলে ‘অলিগার্ক’ বা অর্থ পাচারকারী হিসেবে ব্র্যান্ডিং করা অন্যায়। যাঁদের পরিবার বিদেশে, সম্পদ বাইরে—এমন প্রকৃত অপরাধীদের চিহ্নিত এবং সৎ ব্যবসায়ীদের ব্যবসা করার পরিবেশ নিশ্চিত করা হবে।