বিভ্রান্তিমূলক তথ্য প্রচারের অভিযোগে যুবককে গ্রেপ্তার নিয়ে চিফ হুইপ ও হাসনাতের বিতর্ক
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে চিফ হুইপ নূরুল ইসলামকে নিয়ে বিভ্রান্তিমূলক তথ্য প্রচারের অভিযোগে এক যুবককে গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিয়ে জাতীয় সংসদে বিতর্ক হয়েছে। আজ রোববার সংসদে বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন এনসিপির সংসদ সদস্য মো. আবুল হাসনাত (হাসনাত আবদুল্লাহ)। তিনি বলেন, কার্টুন শেয়ার করার কারণে কাউকে গ্রেপ্তার করার ঘটনা তাঁরা কল্পনাও করতে পারেন না।
জবাবে চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম বলেন, কার্টুনের কারণে কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়ে থাকলে তাঁকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য তিনি (চিফ হুইপ) অনুরোধ জানাচ্ছেন। একই সঙ্গে তিনি বলেন, কুৎসা রটনা, বিভ্রান্তি ছড়ানোর কারণে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে গত ডিসেম্বরে তিনটি জিডি করা হয়। যদি গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তি ওই সব কার্যক্রমে জড়িত ব্যক্তি হয়ে থাকেন, তাহলে এটা সরকারের গভীরভাবে খতিয়ে দেখা উচিত।
সন্ধ্যায় সংসদে এই অনির্ধারিত বিতর্ক হয়। এ সময় সংসদে প্রশ্নোত্তর টেবিলে উত্থাপন করা নিয়েও বিতর্ক হয়।
মন্ত্রীদের জন্য নির্ধারিত প্রশ্নোত্তর টেবিলে উত্থাপন করা হয়। যে কারণে সংসদ সদস্যরা সম্পূরক প্রশ্ন করার সুযোগ পাননি। বিষয়টি নিয়ে পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে হাসনাত আবদুল্লাহ এ বিতর্কের সূচনা করেন।
সংসদের কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী স্পিকার চাইলে প্রশ্নোত্তর টেবিলে উত্থাপন করতে পারেন। বিষয়টি উল্লেখ করে হাসনাত বলেন, ‘কার্যকর গণতন্ত্র ও সংসদের জন্য আমরা কোথায় কথা বলব? আমরা যদি মন্ত্রীদের জবাবদিহির আওতায় না আনতে পারি, আমাদের কথা বলার জায়গা একেবারেই সীমিত, দুই মিনিট, এক মিনিট, ৩০ সেকেন্ড দেওয়া হয়। সেই জায়গায় আমরা মন্ত্রীদেরকে চলমান বিভিন্ন বিষয়ে প্রশ্নের মধ্যে তাঁদেরকে আনি।’
হাসনাত আরও বলেন, গত দুই সপ্তাহে সংসদ অধিবেশনে প্রশ্নোত্তর টেবিলে দিয়ে দেওয়া হয়। যার ফলে তাঁরা মন্ত্রীদের প্রশ্ন, সম্পূরক প্রশ্ন করতে পারেন না। তিনি মনে করেন, এতে সংসদ সদস্যরা অধিকারবঞ্চিত হচ্ছেন।
বক্তব্যের একপর্যায়ে ফেসবুকে চিফ হুইপকে নিয়ে বিভ্রান্তিমূলক তথ্য প্রচার এবং হোয়াটসঅ্যাপে ব্ল্যাকমেল করার অভিযোগে এ এম হাসান নাসিমকে গ্রেপ্তারের বিষয়টি সামনে আনেন হাসনাত। তিনি বলেন, ‘আমরা কল্পনাও করতে পারি নাই, একটা নির্বাচনের পরে কার্টুন শেয়ার দেওয়ার কারণে হাসান নাসিমকে গ্রেপ্তার করা হবে। আমরা হাসিনার আমলে দেখেছি, কটূক্তি করার জন্য গ্রেপ্তার করা হয়।’
হাসনাত বলেন, চিফ হুইপ সংসদ সদস্যদের আমন্ত্রণ করে সংসদে বলেছিলেন তিমি ও হাঙরের কথা। এটা কৌতুক করে বলেছিলেন। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে, এ-সংক্রান্ত একটি কার্টুন শেয়ার করার কারণে চিফ হুইপের এক কর্মী মামলা করেছেন সাইবার সুরক্ষা আইনের ২৫ ধারায়।
এ সময় ডেপুটি স্পিকার হাসনাতের বক্তব্য শেষ করার অনুরোধ করেন। তখন হাসনাত বলেন, ‘আমরা এমনিই সুযোগ পাই না, সুযোগ দেওয়া হয় না। আমরা কবে ট্রেজারি বেঞ্চে যাব, ৪৫ মিনিট ধরে কথা বলব। ইনশা আল্লাহ অবশ্যই আগামীতে বলব।’
২৫ ধারার বিষয়টি উল্লেখ করে হাসনাত বলেন, যৌন নির্যাতন করা হলে এ ধারায় মামলা করা হবে। কিন্তু হুইপ মহোদয়কে নিয়ে যে মিম শেয়ার করা হয়েছে, সেখানে কোথায় যৌন নির্যাতন করা হয়েছে? এখানে একটা মিম শেয়ার দেওয়া হয়েছে। যেখানে দেওয়া হয়েছে, তিমি মাছ সবাইকে সার্ভ করা হচ্ছে। এ ধরনের মামলায় অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে বিরোধীদলীয় মতকে দমন–নিপীড়নের জন্য গ্রেপ্তার করা হচ্ছে এবং জামিনও দেওয়া হচ্ছে না।
পরে হাসনাতকে সংসদে নোটিশ দেওয়ার পরামর্শ দেন ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল।
চিফ হুইপের জবাব
এরপর হাসনাতের বক্তব্যের জবাব দেন চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম। তিনি বলেন, প্রশ্নোত্তর সংসদ সদস্যদের একটি অধিকার। এটা ঠিক। কিন্তু বিরোধীদলীয় নেতা রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ৫০ ঘণ্টা আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছেন। সব মিলিয়ে এখন পর্যন্ত ১২ ঘণ্টা আলোচনা হয়েছে। সংসদনেতা, বিরোধীদলীয় নেতাসহ অন্য সদস্যরা বক্তব্য দেবেন। ৩০ তারিখের মধ্যে সংসদ শেষ করতে চাইলে সময় কাভার করা যায় না। সে কারণেই প্রশ্নোত্তরের টেবিল করা হয়।
চিফ হুইপ বলেন, যদি সদস্যরা চান যে রাত ১০টা পর্যন্ত অধিবেশন চলুক, তাহলে তাঁরা প্রশ্নোত্তর টেবিল করতে চান না। তাঁরা জবাবদিহি নিশ্চিত করার বিষয়ে আন্তরিক।
কার্টুন-সংক্রান্ত মামলার বিষয়ে চিফ হুইপ বলেন, কুৎসা রটনা, বিভ্রান্তি ছড়ানোর কারণে কোনো এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে গত ডিসেম্বরে তিনটি জিডি করা হয়। তিনি সেগুলোর কাগজও দেখান এ সময়। তিনি জানান, সে সময় তিনি নির্বাচন কমিশনেও এ বিষয়ে অভিযোগ করেন। কিন্তু কোনো সুরাহা পাননি। পরে আইনশৃঙ্খলা কমিটির বৈঠকে বলেছেন, ফেক আইডি বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য। কিন্তু নির্বাচনের আগে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া যায়নি।
গতকাল এক ভদ্রলোককে কার্টুন আঁকার কারণে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, এমনটা পত্রিকায় দেখেছেন উল্লেখ করে স্পিকারের উদ্দেশে চিফ হুইপ বলেন, ‘আমি আপনাকে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় এবং পরিষ্কার করে বলতে চাই, কার্টুন আমার ব্যাপারে আঁকার কারণে কাউকে যদি গ্রেপ্তার করা হয়, তাঁকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য আমি অনুরোধ জানাচ্ছি আপনার মাধ্যমে এই সংসদে।’
নূরুল ইসলাম বলেন, সাইবার তথ্য সংগ্রহ করে তাঁরা দেখেছেন, হাসান নামে একজন জনশক্তি, মানিলন্ডারিংসহ অনেক কাজে জড়িত। কতখানি সঠিক, তা তিনি জানেন না।
চিফ হুইপ বলেন, ‘এই ব্যক্তি যদি এসব সাইবারের কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি হন, তাহলে এটা সরকারের গভীরভাবে খতিয়ে দেখা উচিত। এটা পর্যালোচনা করা উচিত যে এটা সঠিক কি না। যদি সঠিক, তাহলে আইনের আওতায় যেন আনা হয়।’ আর সঠিক না হলে তাঁর ব্যাপারে চিফ হুইপের ব্যক্তিগত কোনো অভিযোগ নেই।
চিফ হুইপ বলেন, ফেক আইডিগুলো থেকে প্রধানমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিনী, কন্যার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হয়। সরকারের স্বার্থে, বিরোধী দলের স্বার্থে, দেশের স্বার্থে এগুলো গভীরভাবে খতিয়ে দেখা দরকার।