রাস্তায় যাওয়া শেষ ‘অপশন’, কূটনীতিকদের বললেন নাহিদ

ঢাকায় নিযুক্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত বিভিন্ন দেশের দূতাবাসের প্রতিনিধিদের সঙ্গে সংলাপের আয়োজন করে এনসিপি। সেখানে বক্তব্য দেন এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। আজ শনিবার সকালে রাজধানীর গুলশানের একটি হোটেলেছবি: প্রথম আলো

বর্তমান জাতীয় সংসদ সংবিধান সংস্কার পরিষদে রূপান্তরিত হবে—এ ব্যাপারে এখনো আশাবাদী জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম।

বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকদের নিয়ে আয়োজিত এক সংলাপে তিনি বলেছেন, ‘সংস্কার বাস্তবায়নে আমরা আবারও রাস্তায় যেতে চাই না। আমরা কোনো অস্থিতিশীলতা চাই না। রাস্তায় যাওয়া আমাদের শেষ অপশন (উপায়)। কিন্তু সরকার যদি বিরোধী দলের সহযোগিতাকে উপেক্ষা করে, আমরা রাস্তায় যেতে বাধ্য হব।’

আজ শনিবার সকালে রাজধানীর গুলশানের একটি হোটেলে ‘সংস্কারের অচলাবস্থা: এগোনোর পথ’ শীর্ষক এই সংলাপের আয়োজন করেছিল এনসিপির সংস্কার বাস্তবায়ন কমিটি। সংলাপে মূলত ঢাকায় নিযুক্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত বিভিন্ন দেশের দূতাবাসের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

সংলাপে কূটনীতিকদের উদ্দেশে নাহিদ ইসলাম বলেন, সরকারি দল এরই মধ্যে সংস্কার প্রশ্নে নিজেদের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছে। তারা সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নেয়নি। তারা জুলাই সনদ ও জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশের মধ্যে একটি মিথ্যা বাইনারি তৈরি করেছে। এখন বিতর্কটি হচ্ছে, সংস্কার কীভাবে বাস্তবায়িত হবে। এই বিতর্কটি ঐকমত্য কমিশন থেকেই শুরু হয়েছিল। নির্বাচনের আগে আমরা ভেবেছিলাম, আমরা একটা চুক্তি করেছি, জুলাই সনদ হয়েছে, একটা নির্বাচন ও গণভোটের দিকে যাওয়া হচ্ছে।

বিএনপি নির্বাচনের জন্য সংস্কারের বিষয়ে আপস করেছিল—সংসদের প্রথম অধিবেশনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের এই বক্তব্যের কথা উল্লেখ করে নাহিদ ইসলাম বলেন, সে কারণে সে সময়ে তারা জুলাই সনদ ও সংস্কার কমিশনের সবকিছু গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু তাদের প্রধান উদ্বেগ ছিল নির্বাচন, সংস্কার নয়। এখানে দুটি বিষয় রয়েছে। একটি হলো সংস্কারের বিষয়বস্তু কী, কোন সংস্কার আমাদের দরকার। আর দ্বিতীয়ত, কীভাবে এর বাস্তবায়ন হবে। এখানে কীভাবের প্রশ্নটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। সরকার একটি সাধারণ সংশোধনপ্রক্রিয়ার মাধ্যমে সংস্কার করতে চাইছে। কিন্তু আমরা সংবিধান সংস্কার পরিষদ চাই।

সংবিধানে মৌলিক পরিবর্তনের জন্য সংবিধান সংস্কার পরিষদ জরুরি বলে মন্তব্য করেন বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ। তিনি বলেন, ‘এখন আমরা কিছু প্রধান মৌলিক সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছি। যেমন, উচ্চকক্ষের গঠন, যা সংবিধান সংশোধনে ভারসাম্য তৈরি করবে। এ ছাড়া তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়োগ, দুদক ও নির্বাচন কমিশনের মতো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ এবং স্বাধীন বিচার বিভাগ-এসব বিষয়কেও আমরা গুরুত্ব দিচ্ছি।’

কূটনীতিকদের উদ্দেশে নাহিদ ইসলাম বলেন, সংস্কার বাস্তবায়নে তাঁরা কোনো অস্থিতিশীলতা চান না। তাঁরা এখনো আশা করছেন যে আলোচনার মাধ্যমে সংস্কারের বিষয়ে একটি সমাধানে যাওয়া সম্ভব হবে।

নাহিদ আরও বলেন, ‘বল এখন সরকারের কোর্টে। তাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে, তারা কীভাবে পরিস্থিতি ম্যানেজ এবং প্রত্যাশা পূরণ করতে চায়। কারণ সংস্কার কোনো দলীয় এজেন্ডা বা ধারণা নয়। এটা শুধু এনসিপি বা অন্য কোনো দলকে সাহায্য করবে না। আমাদের জাতীয় পুনর্গঠন, গণতান্ত্রিক চর্চা নিশ্চিত করা এবং জাতীয় প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠনের জন্যই সংস্কার প্রয়োজন।’

সংলাপের শেষ পর্যায়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর দেন নাহিদ ইসলাম। এক প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে তিনি অভিযোগ করেন, সংস্কার নিয়ে সরকার বা বিএনপি একটা ছলচাতুরি করছে। সংস্কার প্রশ্নে আন্দোলন সম্পর্কে নাহিদ বলেন, ‘আমরা শান্তিপূর্ণ ও অহিংসভাবে আন্দোলন করব। রাজপথে ইতিমধ্যে কর্মসূচি শুরু হয়েছে। কিন্তু এই কর্মসূচি কতটুকু বৃদ্ধি পাবে, কতটুকু কঠোর অবস্থানে যাবে—তা নির্ভর করবে সরকার এ আন্দোলনে কতটুকু সাড়া দিচ্ছে অথবা তারা দাবিগুলো মেনে নিচ্ছে কি না, তার ওপর।’

এর আগে এনসিপির সংস্কার বাস্তবায়ন কমিটির নেতা সারোয়ার তুষারের বক্তব্যের মধ্য দিয়ে সংলাপের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। এরপর একটি লিখিত বক্তব্য পড়ে শোনান দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। পরে উন্মুক্ত আলোচনায় ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউট (আইআরআই), ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনাল (ডিআই), নরওয়ে দূতাবাস, সুইডেন দূতাবাস, সুইজারল্যান্ড দূতাবাস ও ডেনমার্ক দূতাবাসের প্রতিনিধিরা বক্তব্য দেন। তাঁদের কয়েকজন অনুষ্ঠানে কথা বলেন। বেশির ভাগেরই বক্তব্য ছিল, তাঁরা মূলত এনসিপির নেতাদের কথা শুনতে এসেছেন।

সাবেক নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য মো. আব্দুল আলীম, নাগরিক কোয়ালিশনের সহ-সমন্বয়ক ফাহিম মাসরুর সংলাপে কথা বলেন। এনসিপির সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য নুসরাত তাবাসসুম অনুষ্ঠানে ধন্যবাদ জানান। সঞ্চালনা করেন দলের যুগ্ম সদস্যসচিব আলাউদ্দীন মোহাম্মদ। এ সময় মঞ্চে আরও ছিলেন সংসদ সদস্য ও এনসিপি নেত্রী মাহমুদা আলম মিতু এবং দলের যুগ্ম আহ্বায়ক জাবেদ রাসিন।