চট্টগ্রাম ও ময়মনসিংহ ছাড়া অন্যান্য বিভাগীয় সমাবেশের মতো সিলেটেও গণসমাবেশকে কেন্দ্র করে গতকাল থেকে সিলেট ছাড়া অপর তিন জেলায় পরিবহন ধর্মঘট চলছে। আজ অপর তিন জেলার সঙ্গে সিলেটেও সকাল-সন্ধ্যা ধর্মঘট চলবে। সেই সঙ্গে নতুন করে পুলিশের মামলা, গ্রেপ্তার, জায়গায় জায়গায় বাধা এবং শহরে ছাত্রলীগের মোটরসাইকেল মহড়াও আছে। এই সমাবেশকে কেন্দ্র করে হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও সুনামগঞ্জ থেকে সিলেট অভিমুখী বাস চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে জেলা বাস মালিক সমিতি ও পরিবহন শ্রমিক সংগঠনগুলো। এর ফলে সাধারণ মানুষও চরম দুর্ভোগের মুখে পড়েছেন।

আজ সমাবেশ হলেও পরিবহন ধর্মঘটের কথা মাথায় রেখে বুধবার থেকে বিএনপির নেতা-কর্মীরা সিলেটে আসা শুরু করেন। মোটরসাইকেল, অটোরিকশা, সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে, আবার অনেকে হেঁটে সমাবেশস্থলে জড়ো হচ্ছেন। মূলত হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও সুনামগঞ্জ জেলার প্রত্যন্ত উপজেলার নেতা-কর্মীদের একটি অংশ আগেভাগেই সিলেটে পৌঁছায়। তিন দিন ধরে তাঁদের বেশির ভাগ আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে ঘুমান। সেখানেই তাঁরা খাওয়াদাওয়া সারেন। গতকাল সন্ধ্যায় আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে গিয়ে দেখা যায়, সমাবেশস্থল প্রায় পরিপূর্ণ। নেতা-কর্মীরা মিছিল নিয়ে মাঠে ঢুকছেন।

গণসমাবেশ সফল করতে গতকালও সিলেট শহরে একাধিক প্রচার মিছিল হয়েছে। বিকেল চারটার দিকে বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও সিটি করপোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীর নেতৃত্বে মিছিল বের হয়।

জ্বালানি তেলসহ নিত্যপণ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি, দলের পাঁচ নেতা-কর্মীকে গুলি করে হত্যার প্রতিবাদে; বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তি এবং নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ সরকারের অধীন সংসদ নির্বাচনের দাবিতে বিএনপি সারা দেশে ধারাবাহিকভাবে গণসমাবেশ করছে। আজ সিলেটে সমাবেশের পর ২৬ নভেম্বর কুমিল্লায় ও ৩ ডিসেম্বর রাজশাহীতে সমাবেশ হবে। সবশেষে ১০ ডিসেম্বর ঢাকায় গণসমাবেশ হওয়ার কথা।

এর আগে ১২ অক্টোবর চট্টগ্রামে প্রথম গণসমাবেশ হয়। এরপর ময়মনসিংহ, খুলনা, রংপুর, বরিশাল ও ফরিদপুরে সমাবেশ হয়। চট্টগ্রাম ছাড়া সব সমাবেশের দুই দিন আগেই পরিবহন ধর্মঘট ডাকা হয়। এর মধ্যে ময়মনসিংহে ধর্মঘট ছিল অঘোষিত।

যেখানেই সমাবেশ, সেখানেই পরিবহন ধর্মঘট কেন?

সিলেটের মতো খুলনা, রংপুর, বরিশাল ও ফরিদপুরে বিএনপির গণসমাবেশের আগেও বাস মালিক ও শ্রমিক সংগঠনগুলো আঞ্চলিকভাবে পরিবহন ধর্মঘট ডেকেছিল। তাদের দাবি ছিল, মহাসড়কে সিএনজিচালিত অটোরিকশা, নছিমন, করিমন, ভটভটিসহ তিন চাকার ছোট যান বন্ধ। সিলেটে বিএনপির সমাবেশ ঘিরে জেলায় আজ সকাল-সন্ধ্যা পৃথকভাবে পরিবহন ধর্মঘট ডেকেছে দুটি সংগঠন। এর একটি সিলেট জেলা সড়ক পরিবহন বাস মালিক সমিতি, অন্যটি সিলেট জেলা শ্রমিক ঐক্য পরিষদ।

এর মধ্যে জেলা সড়ক পরিবহন বাস মালিক সমিতি ধর্মঘট ডেকেছে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় যাত্রীদের নিরাপত্তাবেষ্টনী লাগানোসহ দুই দফা দাবিতে। জেলা শ্রমিক ঐক্য পরিষদ ধর্মঘট ডেকেছে সিলেটে বন্ধ থাকা সব কটি পাথর কোয়ারি চালুসহ চার দফা দাবিতে।

বিএনপির সমাবেশের আগে এ দাবি রাস্তায় এল কেন? জবাবে সিলেট জেলা সড়ক পরিবহন বাস মালিক সমিতির সভাপতি মো. আবুল কালাম প্রথম আলোকে বলেন, এটা কাকতালীয়, অন্য কোনো কারণ নেই। দিনটি আগেই নির্ধারিত ছিল।

আর সিলেট বিভাগীয় শ্রমিক ঐক্য পরিষদের সভাপতি মো. মইনুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা অরাজনৈতিক মানুষ। কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের কর্মসূচি মাথায় রেখে ধর্মঘট ডাকা হয়নি।’

পুলিশের অনেক তল্লাশিচৌকি

সিলেট শহরে ঢোকার পথ ছয়টি। সেগুলো হলো সিলেট-ঢাকা মহাসড়ক, সিলেট-কোম্পানীগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়ক, সিলেট-তামাবিল আঞ্চলিক মহাসড়ক, সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়ক, সিলেট-গোলাপগঞ্জ সড়ক এবং সিলেট-ফেঞ্চুগঞ্জ সড়ক।

বিএনপির নেতা-কর্মীদের অভিযোগ, গতকাল সিলেট শহরে ঢোকার পথে তাঁদের পুলিশের বাধার মুখোমুখি হতে হয়েছে। ফলে একাধিকবার গাড়ি বদল করে, মোটরসাইকেলে করে কিংবা হেঁটে নেতা-কর্মীদের আসতে হয়েছে। তাঁদের দাবি, পুলিশের কাছে যাঁদের সন্দেহজনক মনে হয়েছে কিংবা যাঁদের বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মী বলে শনাক্ত করা গেছে, তাঁদের সিলেট শহরে ঢুকতে দেওয়া হয়নি।

এ বিষয়ে সিলেট জেলা বিএনপির সভাপতি আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, গতকাল সিলেট-তামাবিল সড়কের দরবস্ত এলাকা, গোলাপগঞ্জের হেতিমগঞ্জ এলাকায় পুলিশ অসংখ্য নেতা-কর্মীকে আটকে দিয়েছে। সুনামগঞ্জ থেকে নৌকায় আসা বেশ কিছু নেতা-কর্মীকে সুরমা নদীর সিলেট শহরের কানিশাইল অংশে আটকে দেওয়া হয়েছে। অসংখ্য নেতা-কর্মী ফোন করে পুলিশের বাধার কথা জানাচ্ছেন।

পুলিশ প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, সিলেট মহানগরসহ বিভাগের চার জেলার বিভিন্ন পয়েন্টে ৩২টি তল্লাশিচৌকি বসানো হয়েছে। এর মধ্যে ১২টি সিলেট মহানগরের ছয় থানায়। আজ শনিবার আরও ৭টি জায়গায় তল্লাশিচৌকি বসানো হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

এ বিষয়ে সিলেট মহানগর পুলিশ কমিশনার মো. নিশারুল আরিফ গত রাতে প্রথম আলোকে বলেন, পুলিশ যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ও নাশকতা এড়াতেই তল্লাশিচৌকি বসিয়েছে। পুলিশ কাউকেই সিলেট শহরে ঢুকতে বাধা দিচ্ছে না।

অন্যান্য সমাবেশের মতো সিলেটের সমাবেশ ঘিরেও গত দেড় সপ্তাহ ধরে বিভাগের চার জেলায় কিছুটা উত্তেজনা বিরাজ করছে। পুলিশ ও বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, সিলেট, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জে সাতটি মামলা হয়। নতুন ও পুরোনো মামলায় ২১ জনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এর মধ্যে বিচ্ছিন্ন ঘটনায় ছাত্রলীগ ও যুবলীগ কর্মীদের হামলায় নিহত হন জেলা বিএনপির সাবেক স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক আ ফ ম কামাল। এই সমাবেশকে কেন্দ্র করে গত বৃহস্পতিবার বিকেলে শহরে ছাত্রলীগ মহড়া দিয়েছে।

এ বিষয়ে সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শফিকুর রহমান চৌধুরী গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, সারা দেশেই তারা (বিএনপি) কর্মসূচি পালন করছে, সরকার তো কোনো বাধা দিচ্ছে না। তবে কর্মসূচির নামে উচ্ছৃঙ্খল আচরণ করলে সেটা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না।

শাল্লা থেকে সাইফুররা কীভাবে এলেন

গতকাল সন্ধ্যায় সমাবেশের মাঠে দেখা হয় মো. সাইফুর রহমানের সঙ্গে। তিনি শাল্লা উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি। তাঁর কাছ থেকে জানা গেল, পরিবহন ধর্মঘটের মধ্যেও কীভাবে প্রায় ৯৯ কিলোমিটারের পথ শাল্লা থেকে সিলেট পৌঁছালেন।

সুনামগঞ্জের শাল্লা থেকে সরাসরি সিলেটে আসা যায় না। শাল্লা থেকে ১৯ কিলোমিটার পথ নৌকায়, মোটরসাইকেলে অথবা হেঁটে দিরাই আসতে হয়। এরপর দিরাই থেকে সিলেটের বাস আছে। প্রায় ৮০ কিলোমিটার দূরত্বের এই পথে সময় লাগে সোয়া দুই ঘণ্টার মতো। সব মিলে শাল্লা থেকে সিলেট পর্যন্ত একজন যাত্রীর সময় লাগে পৌনে তিন থেকে সাড়ে চার ঘণ্টা। সাইফুর রহমানের লেগেছে ১০ ঘণ্টা। কারণ, দিরাই থেকে সিলেটে যাওয়ার বাস গতকাল সকাল থেকে বন্ধ।

দীর্ঘ পথের ঝক্কি ও ভোগান্তিতে ক্লান্ত সাইফুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, দিরাই থেকে সিলেটের বাসভাড়া ১৮০ টাকা। তাঁদের সিলেট পর্যন্ত পৌঁছাতে জনপ্রতি খরচ হয়েছে প্রায় ৮০০ টাকা।

কথা বলে জানা গেল, সকাল সাতটার দিকে সাইফুর রহমান সঙ্গে কয়েকজনকে নিয়ে সিলেটের উদ্দেশে রওনা হন। এর মধ্যে শাল্লা থেকে মোটরসাইকেলে দিরাই পর্যন্ত নির্বিঘ্নেই পৌঁছান। এরপর দিরাই থেকে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় প্রথমে বদলপুর পর্যন্ত আসেন। সেখানে পুলিশ তাঁদের সিএনজিটি আটকে দিলে কিছুটা পথ হেঁটে আগান। আবার সিএনজিতে সিলেটের উদ্দেশে যাত্রা। এবার জাউয়া, পাগলা ও গোবিন্দগঞ্জ এলাকায় পুলিশ তাঁদের গাড়ি আটকে দেয়। তিনবারই কিছু দূর হাঁটার পর আবার সিএনজি নিয়ে রওনা দেন। সবশেষে গোবিন্দগঞ্জ এলাকা থেকে সিএনজি নিয়ে তাঁরা সিলেটে পৌঁছান।