রাজধানীর মিরপুরে যুবদলের কর্মী ইউসুফ আলী পারভেজ হত্যাকাণ্ডের পেছনে রয়েছে এলাকার আধিপত্য নিয়ে ক্ষমতাসীন বিএনপির সহযোগী দুই সংগঠনের নেতাদের দ্বন্দ্ব—পুলিশ এমন দাবি করলেও তা প্রত্যাখ্যান করেছেন কাফরুল থানা যুবদলের সদস্যসচিব হাফিজুল ইসলাম বাবু। তিনি বলেছেন, ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব কিংবা চাঁদাবাজি নয়, এর পেছনে রয়েছে রাজনৈতিক শত্রুতা।
আজ বুধবার রাজধানীর বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স ইউনিটির (ক্র্যাব) মিলনায়তনে এক সংবাদ সম্মেলনে এ কথা বলেন হাফিজুল ইসলাম। ‘শত্রু’ হিসেবে তিনি অভিযোগ তুলেছেন কাফরুল থানা বিএনপির এক নেতার বিরুদ্ধে। হাফিজুলের দাবি, আসন্ন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে কাউন্সিলর প্রার্থিতাই এই দ্বন্দ্বের কারণ।
গত শুক্রবার রাতে মিরপুর ১৩ নম্বরে হাফিজুল ইসলামের বাড়ির পাশের একটি চায়ের দোকানে অস্ত্রধারীদের গুলিতে প্রাণ হারান ইউসুফ আলী, আহত হন দুজন। হাফিজুল ইসলামই এই হামলার লক্ষ্য ছিলেন বলে পুলিশ জানিয়েছে।
এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে আট ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে গত সোমবার সংবাদ সম্মেলন করে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। সেখানে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) শফিকুল ইসলাম বলেন, কাফরুল থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক হাফিজুর রহমান হাফিজ ওরফে সিএনজি হাফিজের সঙ্গে হাফিজুল ইসলাম বাবুর বিরোধ দীর্ঘদিনের। স্থানীয় ময়লার টেন্ডার, ফুটপাতের দোকান, ব্যবসা, একটি টিনশেড বাড়ির দখলকে কেন্দ্র করে এই বিরোধের সৃষ্টি হয়। এর জের ধরে হাফিজুলকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়েছিল।
এর এক দিন পরই সংবাদ সম্মেলনে এসে হাফিজুল ইসলাম বলেন, ৪ নম্বর ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদে তাঁর প্রার্থিতা ও জনপ্রিয়তা সহ্য করতে না পেরে তাঁকে হত্যার পরিকল্পনা করেন কাফরুল থানা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক সাব্বির দেওয়ান জনি।
হাফিজুল ইসলামের ভাষ্য, ‘মূল মাস্টারমাইন্ড বা মূল ঘাতক সাব্বির দেওয়ান জনি। সে-ই অর্থদাতা বলে আমার সন্দেহ।’
তবে এর পক্ষে কোনো প্রমাণ না দিয়ে হাফিজুল ইসলাম বলেন, তা প্রমাণের দায়িত্ব রাষ্ট্র ও প্রশাসনের।
পুলিশ যাঁদের গ্রেপ্তার করেছে, তাঁদের মধ্যে জিয়ারুল মোল্লা ও আবির হাওলাদারের সঙ্গে সাব্বির দেওয়ান জনির ছবি সংবাদ সম্মেলনে দেখান হাফিজুল। এরপরও সাব্বিরকে কেন গ্রেপ্তার বা জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে না, এ প্রশ্ন তোলেন তিনি।
পুলিশ যে হাফিজের কথা বলেছে, সে বিষয়ে হাফিজুল ইসলাম বলেন, স্থানীয় একটি মার্কেটের গ্যারেজ অবৈধভাবে ‘সিএনজি হাফিজ’ নামে এক ব্যক্তিকে ভাড়া দেওয়া হয়েছিল। মার্কেটের সভাপতি হিসেবে সাব্বির দেওয়ান জনি অন্য সদস্যদের মতামত ছাড়াই তাঁকে সেখানে আশ্রয় দিয়েছেন। সেই স্থান হত্যার পরিকল্পনার কাজে ব্যবহৃত হয়।
সংবাদ সম্মেলনে আরও দাবি করা হয়, হাফিজুলক হত্যার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ঢাকার বাইরে থেকে ২৫ লাখ টাকার বিনিময়ে পেশাদার খুনি ভাড়া করা হয়েছিল। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের দায়িত্বে ছিলেন ‘সিএনজি হাফিজ’।
হাফিজুল ইসলামের দাবি, হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারীকে আড়াল করতেই তদন্ত ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা চলছে।
হাফিজুলের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপি নেতা সাব্বির দেওয়ান প্রথম আলোকে বলেন, তিনি এর সঙ্গে কোনোভাবে জড়িত নন। পুলিশের তদন্তে যদি তাঁর সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়, তাহলে তিনি নিজ থেকেই আত্মসমর্পণ করবেন।
তাঁর সঙ্গে সন্দেহভাজনদের ছবি থাকা নিয়ে সাব্বির দেওয়ান বলেন, অপরাধীদের সঙ্গে ছবি থাকা মানেই অপরাধে জড়িত থাকা নয়। যখন ছবি তোলা হয়েছে, তখন তাঁরা অপরাধের সঙ্গে জড়িত ছিলেন না।
এদিকে চাঁদাবাজির অভিযোগ অস্বীকার করে সংবাদ সম্মেলনে হাফিজুল ইসলাম বলেন, মিরপুর ১৩ নম্বরে তাঁর বা অন্য কারও স্যাটেলাইট টিভি কেব্ল কিংবা ইন্টারনেট ব্যবসা কিংবা ফুটপাতের চাঁদাবাজির সিন্ডিকেট নেই। এমনকি ওই এলাকায় এখনো সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে বর্জ্য সংগ্রহের কোনো দরপত্রও আহ্বান করা হয়নি।
পুলিশ জানিয়েছে, হাফিজুল ইসলাম বাবুকে হত্যার জন্য ২৫ লাখ টাকার চুক্তিতে মাগুরা ও ঝিনাইদহ থেকে চার পেশাদার শুটার ভাড়া করা হয়েছিল। তবে পরিকল্পিত হামলা লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে নিহত হন ইউসুফ।
নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করে হাফিজুল বলেন, তাঁকে হত্যার চেষ্টা দীর্ঘদিনের পরিকল্পনার অংশ। আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় নেতাদের সরিয়ে দিয়ে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে প্রতিপক্ষ এ হামলার পরিকল্পনা করেছে।
সংবাদ সম্মেলন থেকে এই যুবদল নেতা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ও নিরপেক্ষ তদন্ত এবং মূল নির্দেশদাতাসহ সব পরিকল্পনাকারীকে দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবি জানান।