বিবেক–বুদ্ধি অনুযায়ী সঠিক প্রতিনিধি নির্বাচন করুন: সিপিবি সভাপতি

জাতির উদ্দেশে ভাষণে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সভাপতি কাজী সাজ্জাদ জহির চন্দনছবি: বিটিভি থেকে নেওয়া

১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে নিজের বিবেক-বুদ্ধি অনুযায়ী ভোট দিয়ে সঠিক প্রতিনিধি বাছাই করার আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সভাপতি কাজী সাজ্জাদ জহির চন্দন।

সিপিবি সভাপতি বলেছেন, ‘আসন্ন নির্বাচন একটি ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের মুহূর্ত। কে ক্ষমতায় যাবে, শুধু সে প্রশ্ন নয়; রাষ্ট্র কার স্বার্থে পরিচালিত হবে, সেই প্রশ্নেরও মীমাংসা হবে এই নির্বাচনে। সংসদ নির্বাচনই জনগণের মতপ্রকাশের প্রধান সাংবিধানিক মাধ্যম। অন্য কোনো অপ্রয়োজনীয় বা প্রতারণামূলক ভোটে নির্বিচার সম্মতি নয়, ভোটকেন্দ্রে গিয়ে নিজের বিবেক–বুদ্ধি অনুযায়ী সঠিক প্রতিনিধি নির্বাচন করুন। নির্বাচন বানচালের যেকোনো চক্রান্ত ও অপচেষ্টা রুখে দিয়ে আপনাদের মূল্যবান ভোটাধিকার প্রয়োগ করুন।’

আজ সোমবার বিকেলে বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বাংলাদেশ বেতারে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে কাজী সাজ্জাদ জহির চন্দন এ কথাগুলো বলেন।

ভাষণে সিপিবি সভাপতি বলেন, রাষ্ট্র ও সমাজ গভীর ও বহুমাত্রিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। গণতন্ত্রের অবক্ষয়, আইনের শাসনের দুর্বলতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ, চরম অর্থনৈতিক বৈষম্য ও সাধারণ মানুষের জীবনমানের অবনতি মিলিয়ে বাংলাদেশ আজ একটি গুরুতর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে।

বক্তব্যে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা উল্লেখ করে কাজী সাজ্জাদ জহির চন্দন বলেন, মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্য ছিল একটি গণতান্ত্রিক, সাম্যভিত্তিক ও মানবিক রাষ্ট্র গড়ে তোলা। কিন্তু স্বাধীনতার দীর্ঘ পথচলায় সেই লক্ষ্য এখনো পূরণ হয়নি। এর ফল হিসেবে সাধারণ মানুষ নিরাপত্তাহীনতা, বৈষম্য ও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।

সিপিবি সভাপতির বক্তব্যে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রসঙ্গও উঠে আসে। তিনি বলেন, দীর্ঘদিনের দমন–পীড়ন, বৈষম্য ও ফ্যাসিবাদী শাসনের বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার ধারাবাহিক আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ছিল এই গণ-অভ্যুত্থান। এতে সহস্রাধিক মানুষের প্রাণহানির কথা উল্লেখ করে তিনি নিহত ব্যক্তিদের হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি করেন।

আসন্ন সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সিপিবি ‘ব্যবস্থা বদলের ইশতেহার’ উপস্থাপন করেছে বলে জানান কাজী সাজ্জাদ জহির চন্দন। তিনি বলেন, এটি শুধু নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির দলিল নয়; বরং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থানসহ বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলনের দাবিকে একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থার রূপরেখায় রূপ দেওয়ার প্রয়াস। রাষ্ট্র পরিচালনার কেন্দ্রে জনগণকে স্থাপন করাই এই ইশতেহারের মূল দর্শন।

অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থান ও কর্মসংস্থানের অধিকারকে সংবিধানে মৌলিক অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার অঙ্গীকার করেন সিপিবি সভাপতি। তিনি বলেন, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে, অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থান ও কর্মসংস্থান কোনো দয়া বা অনুকম্পার বিষয় নয়; এগুলো মানুষের মৌলিক অধিকার। তাই এ অধিকারগুলোকে সংবিধানে মৌলিক অধিকার হিসেবে সুস্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠা করা হবে।

সিপিবির ইশতেহারে দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি মোকাবিলায় সর্বজনীন ও স্বচ্ছ খাদ্য রেশনিং ব্যবস্থা এবং উৎপাদক-ভোক্তা সমবায় ব্যবস্থার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বলে জানান দলটির সভাপতি। তিনি বলেন, মর্যাদাপূর্ণ কর্মসংস্থান ও নিরাপদ জীবন নিশ্চিত করতে জাতীয় কর্মসংস্থান কর্মসূচি চালুর পরিকল্পনা রয়েছে সিপিবির, যার মাধ্যমে প্রতি পরিবারে অন্তত একজনের জন্য সম্মানজনক কাজ সৃষ্টি করা হবে। পাশাপাশি রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত সর্বজনীন স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষার অঙ্গীকার করা হয়েছে।

শ্রমজীবী জনগোষ্ঠীর সুরক্ষার বিষয়টিও সিপিবি সভাপতির বক্তব্যে গুরুত্ব পায়। তিনি অনানুষ্ঠানিক শ্রমিকদের নিবন্ধন, সামাজিক নিরাপত্তা এবং জাতীয় ন্যূনতম মজুরি ঘোষণার প্রতিশ্রুতি দিন। একই সঙ্গে কমিউনিস্ট পার্টির ১৮ দফা কর্মসূচিতে রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক পুনর্গঠন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, স্থানীয় সরকার শক্তিশালী করা এবং গণমাধ্যম ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিতের কথা উল্লেখ করা হয়।

তরুণ সমাজের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে কাজী সাজ্জাদ জহির চন্দন বলেন, বেকারত্ব ও অনিশ্চয়তা তরুণদের বড় সংকটে ফেলছে। তাই সিপিবির কর্মসূচির কেন্দ্রে রয়েছে তরুণদের জন্য মর্যাদাপূর্ণ কর্মসংস্থান, অবৈতনিক শিক্ষা এবং সামাজিক নিরাপত্তা ও গণতান্ত্রিক অধিকার নিশ্চিত করা।

বক্তব্যের শেষাংশে সিপিবি সভাপতি ন্যায়ভিত্তিক অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের অঙ্গীকার করেন। তিনি বলেন, এর কেন্দ্রে থাকবে প্রগতিশীল করব্যবস্থা, যেখানে অধিক সম্পদশালীরা বেশি কর দেবেন এবং সাধারণ মানুষের ওপর করের বোঝা কমানো হবে। একই সঙ্গে কালোটাকা সাদা করা এবং বিদেশে টাকা পাচারের পথ বন্ধ করে রাষ্ট্রীয় সম্পদের লুটপাট রোধ করা হবে।

আসন্ন নির্বাচনকে ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের মুহূর্ত উল্লেখ করে সিপিবি সভাপতি কাস্তে প্রতীকে ভোট দিতে জনগণের প্রতি আহ্বান জানান।