তবে দলের দুই পক্ষের এ সংঘর্ষের বিষয়ে বক্তব্যে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের কিছু বলেননি। নিজের বক্তৃতার সময় এ নিয়ে কথা বলেন কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাঈদ আল মাহমুদ (স্বপন)। তিনি বলেন, ‘দেখলাম সুন্দর সম্মেলন। এরপর দেখলাম এক বালতি দুধের মধ্যে এক ফোঁটা চনা। এটা আমাকে ব্যথিত করেছে। আমাদের কতিপয় নেতা ও নেত্রীর মধ্যে অহংকার ভর করেছে। অহংকার পতনের মূল। জনগণকে একটু সরি বলেন। বড় সমাবেশ জনপ্রিয়তার মাপকাঠি নয়। আমরা একটি কঠিন সময় পার করছি।’

আ ক ম বাহাউদ্দিন কুমিল্লা মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি। আঞ্জুম সুলতানা মহানগর আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ও কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের প্রয়াত সাধারণ সম্পাদক আফজল খানের মেয়ে। আগে কুমিল্লার রাজনীতিতে আফজল-বাহাউদ্দিন দ্বন্দ্ব ছিল প্রকট। এখন দ্বন্দ্ব বাহাউদ্দিন-আঞ্জুম সুলতানার সমর্থকদের মধ্যে। এ ঘটনার জন্য এক পক্ষ অপর পক্ষকে দায়ী করেছে।

সম্মেলন শুরুর পরপরই

গতকাল বেলা সোয়া ১১টায় আ ক ম বাহাউদ্দিনের সভাপতিত্বে মহানগর আওয়ামী লীগের প্রথম সম্মেলন কুমিল্লা টাউন হল মাঠে ফটক বন্ধ করে দিয়ে শুরু হয়। দলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বেলুন ও পায়রা উড়িয়ে সম্মেলনের উদ্বোধন করেন।

সরেজমিনে দেখা যায়, বেলা ১১টা ৪৭ মিনিটে ওবায়দুল কাদের সম্মেলনস্থলে বক্তব্য দেওয়া শুরু করেন। তখন দলীয় নেতা–কর্মীদের নিয়ে সম্মেলনে প্রবেশের চেষ্টা করেন আঞ্জুম সুলতানা। কিন্তু কাউন্সিলর ছাড়া অন্য কাউকে সম্মেলনে ঢুকতে দেওয়া হবে না বলে জানানো হয়। তখন আঞ্জুম সুলতানার সঙ্গে সেখানে বাহাউদ্দিনের অনুসারীদের কথা–কাটাকাটি হয়। পরে তিনি সেখানে কিছুক্ষণ থেকে চলে যান।

আঞ্জুম সুলতানা টাউন হল ফটক এলাকা পার হওয়ার পর বেলা ১১টা ৫৬ মিনিটে প্রথমে কান্দিরপাড় পুবালি চত্বরে ককটেল বিস্ফোরণ, গুলির আওয়াজ শুরু হয়। প্রায় ২৫ মিনিট নজরুল অ্যাভিনিউ এলাকায় দুই পক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। একপর্যায়ে বাহাউদ্দিনের অনুসারীরা আঞ্জুমের অনুসারীদের ধাওয়া দিয়ে নগরের ফরিদা বিদ্যায়তন এলাকা পর্যন্ত সরিয়ে দেন। এ সময় ককটেল বিস্ফোরণ, কাচের বোতল, ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও ফাঁকা গুলিবর্ষণ করতে দেখা যায় কয়েকজনকে। তবে গতকাল রাত সাড়ে ১০টায় এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত সংঘর্ষে জড়িত কারও পরিচয় পাওয়া যায়নি। প্রথম আলোর কুমিল্লা অফিসের আলোকচিত্রী এম সাদেকের গলার পাশে স্প্লিন্টার লাগে। এতে তিনি সামান্য আহত হন। এ ঘটনায় মোট আহত হন অন্তত ১০ জন। পরে পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে। বিকেলে নজরুল অ্যাভিনিউয়ে গুলির খোসা, ইটের টুকরা, বোমার স্প্লিন্টার দেখা গেছে।

সংঘর্ষ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে আঞ্জুম সুলতানা বলেন, ‘আমাকে সম্মেলনে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। ওরা টাউন হলের ফটক বন্ধ করে সম্মেলন করে। পুরো পুবালি চত্বর এলাকা লোকজন নিয়ে ভরে রাখে। পরে আমি চলে আসি। এরপর ঝামেলা হয়।’

এ প্রসঙ্গে সংসদ সদস্য আ ক ম বাহাউদ্দিনের মুঠোফোনে যোগাযোগ করেও তাঁর বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। তাঁর একটি মুঠোফোন বন্ধ পাওয়া গেছে। আরেকটিতে রিং হলেও সাড়া মেলেনি। তবে সম্মেলনে বক্তৃতায় বাহাউদ্দিন তাঁর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী আফজল খান পরিবারকে ইঙ্গিত করে বলেন, ‘যখনই সম্মেলন হয় সমস্যা, যখনই নমিনেশনের সময় আসে সমস্যা। জনসভা হলে সমস্যা হতো না। ওরা ভাগ চায়।’ তিনি বলেন, ‘আমি ২৩ বছর দলের কোনো পদে ছিলাম না। ষড়যন্ত্র করে আমাকে বাদ দেওয়া হয়। এখন ভাগ বসাতে চায়।’

পুলিশ সুপার আব্দুল মান্নান বলেন, টাউন হল মাঠের বাইরে অন্য সড়কে ঝামেলা হয়। প্রশাসন পরিস্থিতি সামাল দিয়েছে।

‘কত লোক হয়েছে আসেন, দেখে যান’

সম্মেলনে ওবায়দুল কাদের বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের উদ্দেশে বলেন, ‘ফখরুল সাহেবের খবর কী? শুয়ে আছেন টাকার বস্তার ওপর। কুমিল্লা মহানগর আওয়ামী লীগের সম্মেলনে কত লোক হয়েছে, আসেন, দেখে যান। এটা বিভাগীয় কোনো সমাবেশ না, মহানগর ইউনিট। আপনাদের মতো ভাড়া করা লোক নেই এখানে।’

ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘খেলা হবে, আন্দোলনে, নির্বাচনে, ভোট চুরির বিরুদ্ধে, ভোট জালিয়াতির বিরুদ্ধে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে। যাঁরা ১৭ কোটি মানুষের ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলে, ভুয়া ভোটার বানানোকারীদের বিরুদ্ধে খেলা হবে।’

সম্মেলনে প্রধান অতিথি ছিলেন দলের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম। প্রধান বক্তা ছিলেন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ। বিশেষ অতিথি ছিলেন কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাইদ আল মাহমুদ, কেন্দ্রীয় ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক সুজিত রায় নন্দী, তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক সেলিম মাহমুদ। স্বাগত বক্তব্য দেন কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের মেয়র আরফানুল হক (রিফাত)। সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন কুমিল্লা-৭ আসনের সংসদ সদস্য প্রাণ গোপাল দত্ত, কুমিল্লা-৫ আসনের সংসদ সদস্য আবুল হাসেম খান, সংরক্ষিত মহিলা সংসদ সদস্য আরমা দত্ত প্রমুখ।

পুরোনোরাই সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক

দ্বিতীয় অধিবেশনে কুমিল্লা মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি পদে সংসদ সদস্য আ ক ম বাহাউদ্দিন ও সাধারণ সম্পাদক পদে সিটি মেয়র আরফানুল হক নির্বাচিত হন। এর আগে ২০১৭ সালের ২২ জুলাই আ ক ম বাহাউদ্দিনকে সভাপতি ও আরফানুল হককে সাধারণ সম্পাদক করে কেন্দ্র থেকে কমিটি ঘোষণা করা হয়। এবার তাঁরা সম্মেলন করে নির্বাচিত হলেন। পূর্ণাঙ্গ কমিটির নামের তালিকা পরে জানানো হবে।

এর আগে গত ২৯ অক্টোবর সদর দক্ষিণ উপজেলা ও ৩০ অক্টোবর আদর্শ সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলনেও পুরোনো নেতৃত্ব বহাল রাখা হয়। আওয়ামী লীগের তিনটি সম্মেলনে পুরোনোরাই সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক পদে রয়ে গেলেন।