বাজেটের আলোচনা ছাপিয়ে গিয়েছিল বিশেষ কমিটি, বিল পাসেও তড়িঘড়ি

জাতীয় সংসদ অধিবেশনফাইল ছবি

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশন শেষ হয়েছে গত বুধবার। এটি ছিল বাজেট অধিবেশন। ২৬ কার্যদিবসের এই অধিবেশন শুধু বাজেটেই সীমাবদ্ধ ছিল না; সংবিধান সংশোধনসংক্রান্ত বিশেষ কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে বিরোধী দলের ওয়াকআউট, ইসলামী ব্যাংকের মালিকানা, ১৯৭১ সালে জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকা, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের হত্যাকাণ্ডের বিচার, আওয়ামী লীগের বিচারসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ইস্যুতেও সরব ছিল সংসদ। আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়ার ব্যত্যয় নিয়েও ছিল সমালোচনা।

এ অধিবেশনে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট পাস হয়। বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নেন ৩১৬ জন সংসদ সদস্য। বিল পাস হয়েছে ১০টি। সংবিধান সংশোধনের জন্য সুপারিশ দেওয়ার লক্ষ্যে বিশেষ কমিটিসহ ১১টি সংসদীয় কমিটি গঠন করা হয় এই অধিবেশনে।

সংসদ সচিবালয় সূত্র জানায়, এই অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রীর উত্তরদানের জন্য ২৭৮টি প্রশ্ন জমা পড়ে। এর মধ্যে ৩৫টি প্রশ্নের উত্তর টেবিলে উপস্থাপিত হয়েছে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীদের জন্য ৫ হাজার ৩১টি প্রশ্ন জমা পড়ে, এর মধ্যে ৩ হাজার ৪৭৪টি প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হয়েছে।

এই অধিবেশনে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট পাস হয়। বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নেন ৩১৬ জন সংসদ সদস্য। বিল পাস হয়েছে ১০টি। সংবিধান সংশোধনের জন্য সুপারিশ দেওয়ার লক্ষ্যে বিশেষ কমিটিসহ ১১টি সংসদীয় কমিটি গঠন করা হয় এই অধিবেশনে।

জাতীয় সংসদের মূল কাজগুলোর একটি হলো আইন প্রণয়ন করা। গত অর্থবছরের সম্পূরক বাজেট, চলতি অর্থবছরের বাজেট–সংক্রান্ত ৩টি বিলসহ মোট ১০টি বিল পাস হয় এই অধিবেশনে। এর বাইরে জামায়াতে ইসলামীর একজন সংসদ সদস্য দুটি বেসরকারি বিল উত্থাপন করলেও পরে তিনি সে দুটি প্রত্যাহার করে নেন।

পাস হওয়া বিলগুলোর মধ্যে আছে অর্থবিল, দুটি নির্দিষ্টকরণ বিল, বগুড়া বিশ্ববিদ্যালয় বিল, ইনভেস্টমেন্ট বাংলাদেশ বিল, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (সংশোধন) বিল, পাবলিক এক্সামিনেশনস (অফেন্স) (সংশোধন) বিল, জুয়া প্রতিরোধ বিল, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ (সংশোধন) ও সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) বিল।

জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান
ছবি: প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়

বিল নিয়ে তড়িঘড়ি

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের মতো দ্বিতীয় অধিবেশনেও কিছু ক্ষেত্রে বিল উপস্থাপন ও পাস করানোর ক্ষেত্রে তড়িঘড়ি দেখা গেছে। এ নিয়ে বিরোধী দল আপত্তি তুললেও সেগুলো নাকচ হয়ে যায় কণ্ঠভোটে।

বিশেষ করে অধিবেশনের শেষ দিন বুধবার ‘ইনভেস্টমেন্ট বাংলাদেশ বিল’ যে প্রক্রিয়ায় পাস করা হয়েছে, তা নিয়ে সমালোচনা হয়েছে। বিলটি আনার ক্ষেত্রে বিধি অনুযায়ী কোনো নোটিশ দেওয়া হয়নি। আবার বিল তোলার পরপরই সেটা পাস করা হয়েছে। বিলের ওপর কোনো আলোচনাই হয়নি।

এই অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রীর উত্তরদানের জন্য ২৭৮টি প্রশ্ন জমা পড়ে। এর মধ্যে ৩৫টি প্রশ্নের উত্তর টেবিলে উপস্থাপিত হয়েছে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীদের জন্য ৫ হাজার ৩১টি প্রশ্ন জমা পড়ে, এর মধ্যে ৩ হাজার ৪৭৪টি প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হয়েছে।

প্রথা অনুযায়ী বিল তোলার পর সেটা সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়। এ ক্ষেত্রে তা করা হয়নি। এমনকি বিরোধী দলকে জনমত যাচাই, বাছাই কমিটিতে প্রেরণ ও সংশোধনী প্রস্তাব দেওয়ারও সুযোগ দেওয়া হয়নি। সংসদে বিল তোলা থেকে পাস করতে সময় নেওয়া হয়েছে ৩০ মিনিটের মতো। এই আধা ঘণ্টা সময়ের মধ্যেও বেশির ভাগ আলোচনা ছিল বিল পাসের প্রক্রিয়ার ত্রুটি নিয়ে। এটি নিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমানসহ একাধিক সংসদ সদস্য কঠোর সমালোচনা করেন।

অবশ্য সরকারের পক্ষ থেকে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, বিলটি পাস হয়ে গেলেও পরবর্তী সময়ে বিরোধী দলের সংশোধনী প্রস্তাবগুলো যৌক্তিক হলে গ্রহণ করা হবে। এটি নতুন কোনো আইন নয়। আজ সংসদ অধিবেশন শেষ হচ্ছে। তাই বিলটি পাস করতে হচ্ছে।

পাস হওয়া বিলগুলোর মধ্যে আছে অর্থবিল, দুটি নির্দিষ্টকরণ বিল, বগুড়া বিশ্ববিদ্যালয় বিল, ইনভেস্টমেন্ট বাংলাদেশ বিল, বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় (সংশোধন) বিল, পাবলিক এক্সামিনেশনস (অফেন্স) (সংশোধন) বিল, জুয়া প্রতিরোধ বিল, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ (সংশোধন) ও সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) বিল।

এর আগে গত ২৮ জুন আগে কোনো নোটিশ না দিয়ে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (সংশোধন) আইন এবং পাবলিক এক্সামিনেশনস (অফেন্স) (সংশোধন) বিল উত্থাপন করা হয়। বিরোধী দল সেদিনও এর আপত্তি জানায়। সেদিন বিরোধী দলকে সময় কম ও সরকারি দলকে বেশি সময় দেওয়া; বিলের কপি আগে না দেওয়া এবং পয়েন্ট অব অর্ডার না দেওয়ায় সংসদ থেকে ওয়াকআউট করে বিরোধী দল।

পাস হওয়া বিলগুলোয় যা আছে

বগুড়ায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য বগুড়া বিশ্ববিদ্যালয় বিল পাস করা হয়। ২০০১ সালে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় থাকাকালে বগুড়া বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় আইনটি করা হয়েছিল। তবে সেটি কার্যকর হয়নি। বিএনপি ক্ষমতায় ফিরে এবার আগের আইনটি রহিত করে নতুন বিল পাস করেছে।

ইনভেস্ট বাংলাদেশ বিলে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা), সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব কর্তৃপক্ষ (পিপিপি) ও বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে (বিডা) একীভূত করে নতুন ইনভেস্ট বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ গঠনের বিধান করা হয়েছে।

পাবলিক এক্সামিনেশনস (অফেন্স) (সংশোধন) বিলে ডিজিটাল কারসাজি, অনলাইনে প্রশ্নপত্র ফাঁস ও উত্তরপত্রের অন্যায্য মূল্যায়নের জন্য সাজার বিধান যুক্ত করা হয়েছে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ (সংশোধন) বিলে সাইবার মাধ্যমে মাদক কেনাবেচাসহ সংশ্লিষ্ট অপরাধের সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড এবং পৃথক মাদক ট্রাইব্যুনাল গঠনের বিধান রাখা হয়েছে।

সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান
ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া

১৮৬৭ সালের পাবলিক গ্যাম্বলিং অ্যাক্ট রহিত করে নতুন করে জুয়া প্রতিরোধ আইন করা হয়েছে। এতে অনলাইন জুয়া, বেটিং ও ম্যাচ ফিক্সিংয়ের জন্য সর্বোচ্চ সাত বছরের কারাদণ্ডের বিধান করা হয়েছে। সাইবারে জুয়ার অপরাধের দণ্ড এই আইনে অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় সাইবার সুরক্ষা আইনের জুয়াসংক্রান্ত ২০ নম্বর ধারা বাতিল করা হয়েছে।

‘বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (দ্বিতীয় সংশোধন) বিল’ পাসের মাধ্যমে চিকিৎসাসেবার পরিধি সম্প্রসারণে মুনাফাভিত্তিক বা অমুনাফাভিত্তিক কোম্পানি গঠন করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়কে (বিএমইউ)।

বিশেষ কমিটি গঠন, বিরোধী দলের প্রত্যাখ্যান

বাজেট পাস হওয়ার পর এই অধিবেশনের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ছিল সংবিধান সংশোধনের জন্য বিশেষ কমিটি গঠন। বিরোধী দল আগে থেকেই বলে আসছিল, সংবিধান সংশোধন নয়, তারা সংবিধান সংস্কার চায়। এ জন্য সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করতে হবে। সংবিধান সংশোধনের জন্য কোনো বিশেষ কমিটির প্রয়োজন নেই। এ ধরনের কমিটিতে তারা থাকবে না।

সংবিধান সংশোধনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে সভাপতি করে ১২ সদস্যের বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়। বিরোধী দলের ওয়াকআউটের মধ্যে প্রস্তাবটি সংসদে পাস হয়। সরকারি দলের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, পরে বিরোধী দল নাম দিলে তাঁদের অন্তর্ভুক্ত করে কমিটি পুনর্গঠন করা হবে।

অবশ্য সরকারি দলের আশা ছিল, বিরোধী দল এ কমিটিতে নাম দেবে। এ কমিটি ১৭ সদস্যের হওয়ার কথা ছিল। এতে পাঁচজনের নাম দিতে বিরোধী দলকে অনুরোধ করা হয়েছিল। তবে বিরোধী দল কারও নাম দেয়নি।

গত ১৩ জুলাই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে সভাপতি করে ১২ সদস্যের বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি গঠনের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে সংসদ থেকে সেদিন ওয়াকআউট করে বিরোধী দল। তাদের অনুপস্থিতিতে বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাবটি সংসদে পাস হয়। অবশ্য সরকারি দলের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, পরে বিরোধী দল নাম দিলে তাদের অন্তর্ভুক্ত করে কমিটি পুনর্গঠন করা হবে।

সংসদীয় কমিটি

জাতীয় সংসদের একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো নির্বাহী বিভাগকে জবাবদিহি করা। এ কাজ করার একটি সুযোগ করে দেয় সংসদীয় কমিটি। বিশেষ করে মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটিগুলো এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এখন পর্যন্ত সব কটি মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি গঠন করা হয়নি।

এখন পর্যন্ত নয়টি মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটি গঠন করা হয়েছে। সেগুলো হলো অর্থ, পরিকল্পনা, আইন, শিল্প, বাণিজ্য, পররাষ্ট্র, স্বরাষ্ট্র, পানিসম্পদ ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। সব কটি কমিটির সভাপতি হয়েছেন বিএনপির সংসদ সদস্যরা।

সংবিধান সংশোধনে কমিটি গঠনের প্রতিবাদে গত ১৩ মার্চ সংসদ অধিবেশন থেকে বেরিয়ে যান বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা
ফাইল ছবি: ভিডিও থেকে

এর বাইরে সরকারি হিসাব কমিটিও গঠন করা হয়েছে দ্বিতীয় অধিবেশনে। গুরুত্বপূর্ণ এ কমিটির সভাপতি দেওয়া হয়েছে বিরোধী দলকে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় যে চার সংসদীয় কমিটির সভাপতি বিরোধী দল থেকে দেওয়ার বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছিল, তার একটি ছিল সরকারি হিসাব কমিটি।

বিষয়ভিত্তিক বিতর্ক ও আলোচনা

বাজেট আলোচনায় রাজনৈতিক বক্তব্য ও বিতর্কের বাইরেও এ অধিবেশনে কয়েকটি বিষয়ে নির্ধারিত বিতর্ক ও আলোচনা হয়েছে। যেমন ইসলামী ব্যাংকের শেয়ার প্রকৃত মালিকদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া এবং ব্যাংকের ব্যবস্থাপনায় রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধের দাবিতে আনা নোটিশে দীর্ঘ আলোচনা হয়। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের হত্যাকাণ্ডের বিচার নিয়ে আলোচনায় বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা আওয়ামী লীগকে দল হিসেবে বিচারের দাবি জানান। এ দুটি নোটিশই এনেছিল বিরোধী দল।

এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক মালয়েশিয়া ও চীন সফরের সাফল্যের জন্য সংসদে ধন্যবাদ প্রস্তাবও সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হয়। অন্যদিকে কাতারের সাবেক আমির শেখ হামাদ বিন খলিফা আল থানির মৃত্যুতে শোক প্রস্তাব গ্রহণ করে সংসদ। কাতারের সাবেক আমিরের নামে ঢাকায় অবস্থিত কাতার দূতাবাস সড়কটির নামকরণের জন্য প্রস্তাব আনেন বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান। এ প্রস্তাবের আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জানান, শেখ হামাদ বিন খলিফা আল থানির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে ঢাকার একটি উপযুক্ত সড়ক তাঁর নামে করা হবে।