আওয়ামী লীগের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের টানা দুই মেয়াদে এই দায়িত্বে আছেন। এর আগে কোনো সাধারণ সম্পাদক টানা তিন মেয়াদে দায়িত্ব পালন করেননি। তাই এবার মূল আলোচনা ওবায়দুল কাদের কি বাদ যাচ্ছেন, নাকি তিনি হ্যাটট্রিক করছেন? এই আলোচনার মধ্যেও ভেতরে-ভেতরে এক ডজনের মতো নেতা সাধারণ সম্পাদক পদের দাবিদার হিসেবে নিজেদের উপস্থাপন করার চেষ্টা করছেন।

আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী সূত্র বলছে, সভাপতি হিসেবে শেখ হাসিনাই থাকছেন—এটা প্রায় নিশ্চিত। আর সাধারণ সম্পাদক ঠিক করেন সভাপতি নিজেই। এবার কে হতে পারেন সাধারণ সম্পাদক—এ বিষয়ে দলীয় সভাপতি এখন পর্যন্ত তাঁর মনোভাব প্রকাশ্যে বা ঘনিষ্ঠ নেতাদের কাছে প্রকাশ করেননি। সাধারণত তিনি জাতীয় সম্মেলনের তিন থেকে সাত দিন আগে বিষয়টি খোলাসা করেন। এবারও এমনটাই হওয়ার কথা।

আওয়ামী লীগের দলীয় সূত্রে জানা গেছে, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের এক বছর আগের এই সম্মেলনে ওবায়দুল কাদেরকে সাধারণ সম্পাদক হিসেবে রেখে দেওয়া এবং নতুন কাউকে নির্বাচন করা—এই দুটি সম্ভাবনা নিয়েই আলোচনা আছে। কেউ কেউ বলছেন, জাতীয় নির্বাচন ও বিরোধীদের আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে ওবায়দুল কাদেরকে রেখে দেওয়া হতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে ওবায়দুল কাদেরের বাড়তি তৎপরতাও দেখা যাচ্ছে। নানা কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে তিনি বিএনপি নেতাদের অভিযোগের জবাব দিয়ে আসছেন। বিএনপির সঙ্গে আন্দোলন ও ভোটের মাঠে ‘খেলা হবে’ বলেও বলছেন তিনি। করোনা মহামারির মধ্যে দীর্ঘদিন দৃশ্যত বাইরে না আসা ওবায়দুল কাদেরের এই রাজনৈতিক তৎপরতা তাঁর অনুসারীদের আশা দেখাচ্ছে।

অপর দিকে বিপরীত ধারার মত হচ্ছে—সম্মেলনের মূল আকর্ষণ সাধারণ সম্পাদক। এই পদে পরিবর্তন না এলে সম্মেলনের কোনো আকর্ষণ থাকে না। নতুন নেতৃত্ব তৈরির কাজ পিছিয়ে যাবে। এ ছাড়া নেতা, কর্মী ও সমর্থকেরা নতুন নেতৃত্ব পেলে হয়তো বেশি উজ্জীবিত হবে।

আওয়ামী লীগের টানা ক্ষমতায় থাকার গত ১৩ বছরে দলের জাতীয় সম্মেলন হয়েছে তিনবার। প্রতিবারই নেতৃত্ব নির্বাচন হয়েছে সমঝোতার ভিত্তিতে, কাউন্সিলরদের গোপন ভোটে নয়। সম্মেলনের আগে কোনো পদে কেউ আনুষ্ঠানিক প্রার্থিতা ঘোষণা করেননি, প্রচারেও নামেননি কেউ। তবে ভেতরে-ভেতরে কাঙ্ক্ষিত পদ পেতে দৌড়ঝাঁপ করেছেন নেতারা। এবারও এর ব্যতিক্রম হবে না বলেই মনে করছেন দলের নেতারা।

স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলের মাঠপর্যায়ে দ্বন্দ্ব-সংঘাত দেখা গেছে। ২০২৪-এর শুরুতে জাতীয় নির্বাচন। নতুন কমিটির সামনে চ্যালেঞ্জ বিরোধী দলের আন্দোলন। আগামী নির্বাচনে দলের ভূমিকা কী হবে এবং কতটা মাঠে সক্রিয় থাকতে পারবে, তা নির্ভর করছে এই কমিটির ওপর।

আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্র অনুসারে, সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ সভাপতিমণ্ডলীর সদস্যসংখ্যা ১৯ জন। তাঁদের মধ্যে সাজেদা চৌধুরী, মো. নাসিম, সাহারা খাতুন ও আবদুল মতিন খসরু মারা গেছেন। আগে থেকে দুটি পদ ফাঁকা ছিল।

সব মিলিয়ে ছয়টি পদ ফাঁকা হয়। এর মধ্যে এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন, মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী ও কামরুল ইসলামকে সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য করা হয়। সভাপতিমণ্ডলীতে এখনো তিনটি পদ ফাঁকা আছে।

আওয়ামী লীগের দলীয় সূত্র জানায়, বর্তমান সভাপতিমণ্ডলীর দু-একজন অসুস্থ। বাকিরা দলে সক্রিয় এবং অনেকের বেশি দিন হয়নি। ফলে এবারের সম্মেলনে দু-একজনকে উপদেষ্টা পরিষদে পাঠানো হতে পারে। খালি পদ ও বাদ পড়াদের জায়গায় সম্পাদকমণ্ডলীর দু-একজন ঢুকতে পারেন। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে নির্বাচনকালীন সরকার গঠন করা হবে। তখন মন্ত্রিসভা থেকে বাদ পড়বেন কেউ কেউ। তাঁদের মধ্যে জ্যেষ্ঠ কয়েকজনের দলের সভাপতিমণ্ডলীতে স্থান পাওয়ার সম্ভাবনা আছে।

আওয়ামী লীগের সম্পাদকমণ্ডলীতে পদের সংখ্যা ৩৪। এতে কেউ কেউ এক যুগ ধরে আছেন। তাঁদের অন্যত্র পদায়ন এবং নতুনদের জায়গা দেওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে দলে আলোচনা আছে। কোষাধ্যক্ষ পদে দীর্ঘদিন ধরে আছেন এইচ এন আশিকুর রহমান। এবার এই পদে পরিবর্তন নিয়েও আলোচনা আছে। এ ছাড়া কেন্দ্রীয় নির্বাহী সদস্যের পদ ২৮টি। এর মধ্যে কেউ কেউ মারা গেছেন। সাবেক ছাত্রনেতাদের মধ্যে যাঁরা সরকারি পদ, সংসদ সদস্য কিংবা স্থানীয় সরকারে জনপ্রতিনিধি হতে পারেননি, এমন কাউকে স্থান দেওয়া হতে পারে। এর বাইরে বঙ্গবন্ধু পরিবারের সদস্যদের কেউ কেন্দ্রীয় কমিটিতে আসছেন কি না, সে আলোচনা প্রতিবারই হয়। এবারও সেই আলোচনা আছে।

সাধারণ সম্পাদক পদে আলোচনায় যাঁরা

২০০৯ সালে দলের সাধারণ সম্পাদক হন প্রয়াত সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। এর আগে থেকেই বর্তমান সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের এই পদে আসার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা ছিল। সৈয়দ আশরাফ দুই মেয়াদে দায়িত্ব পালনের পর ওবায়দুল কাদের এই পদে আসেন ২০১৬ সালে। এখন তিনি দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব পালন করছেন। গত দুই সম্মেলনে ওবায়দুল কাদেরের পাশাপাশি দলের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য আব্দুর রাজ্জাকের নামও জোরালোভাবে আলোচনায় ছিল।

আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের কেউ কেউ এবার সাধারণ সম্পাদক পদে আব্দুর রাজ্জাকের সম্ভাবনা দেখেন। এর বাইরে সাধারণ সম্পাদক হতে আগ্রহী আরও কয়েকজন নেতা নানাভাবে সক্রিয় আছেন। তাঁরা জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সম্মেলনে অংশ নিচ্ছেন। কেউ কেউ দলের বিভিন্ন জেলার বিভেদ মেটাতে উদ্যোগী ভূমিকা রাখছেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন জাহাঙ্গীর কবির নানক, মাহবুব উল আলম হানিফ, হাছান মাহমুদ, দীপু মনি ও আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম।

দলীয় সূত্র জানায়, গত জাতীয় সম্মেলনের আগে দলের সাংগঠনিক পর্যায়ের কয়েকজন নেতাও সাধারণ সম্পাদক পদে আলোচনায় ছিলেন। এর মধ্যে বর্তমান নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী অন্যতম। এবার তিনি কেন্দ্রীয় কমিটিতে নেই। তবে আলোচনায় আছেন। নতুন করে আলোচনায় যুক্ত হয়েছেন দুই সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাঈদ আল মাহমুদ ও মির্জা আজম। এর বাইরে রাজশাহী সিটি করপোরেশনের মেয়র এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটনের সম্ভাবনাও দেখছেন কেউ কেউ।

সরকার ও দল আলাদা

আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের সূত্র জানায়, সম্মেলনে দল ও সরকারকে আলাদা রাখার বিষয়টিও গুরুত্ব পেতে পারে। অর্থাৎ যাঁরা মন্ত্রিসভায় আছেন, তাঁদের পারতপক্ষে দলের বড় পদে বিবেচনায় না নেওয়া। ২০১৯ সালের সম্মেলনেও এমন চেষ্টা দেখা গেছে। এ জন্য বেশ কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতা মন্ত্রিসভায় স্থান পাওয়ার পর দলের পদ হারান। ২০১৮ সালে মন্ত্রিসভা থেকে বাদ পড়া অনেকে আবার দলের পদ পান।

দলীয় সূত্র বলছে, শেখ হাসিনা সভাপতি হয়ে প্রধানমন্ত্রীও থাকবেন—এটা নিশ্চিত। সাধারণ সম্পাদককে সারা দেশে দলীয় কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে হয়। এতে প্রশাসনিক সহায়তার প্রয়োজন পড়ে। সাধারণ সম্পাদক সরকারে না থাকলে সমস্যা।

ফলে এই পদধারীও মন্ত্রিসভার সদস্য হবেন—এমনটাই আলোচনা। তবে ওবায়দুল কাদেরকে পুনরায় সাধারণ সম্পাদক হিসেবে রেখে দিলে তাঁকে দপ্তরবিহীন মন্ত্রী করার বিষয়টিও আলোচনায় আছে। এর বাইরে কিছু কিছু নেতা আছেন যাঁরা সরকার ও দলে সমান গুরুত্বপূর্ণ। তাঁরা হয়তো থেকে যাবেন। তবে সম্পাদকমণ্ডলী ও নির্বাহী সদস্যের ৬২টি পদে মন্ত্রিসভার সদস্যদের রাখার সম্ভাবনা কম।

আওয়ামী লীগের দলীয় সূত্র জানায়, আগামী ফেব্রুয়ারিতে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের মেয়াদ শেষ হচ্ছে। তাঁকে আরেকবার রাষ্ট্রপতি করতে হলে সংবিধান সংশোধন করতে হবে। এই পদ অনেক জ্যেষ্ঠ নেতার আকাঙ্ক্ষিত। দল থেকে বাদ পড়া কেউ রাষ্ট্রপতি পদের দাবিদার হয়ে উঠতে পারেন বলে মনে করা হচ্ছে।

বিবেচনায় নির্বাচন

আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন কেন্দ্র করে জাতীয় রাজনীতি ঘটনাবহুল হবে—এর আঁচ এখনই পাওয়া যাচ্ছে। বিএনপি সারা দেশে বিভাগীয় গণসমাবেশ করছে।

এগুলোতে বড় জমায়েত দেখানোর উদ্যোগ নিয়েছে তারা। পাল্টা হিসেবে আওয়ামী লীগ দলের জেলা ও সহযোগী সংগঠনের সম্মেলন, শান্তি সমাবেশ ও বর্ধিত সভার নাম দিয়ে বড় জমায়েত দেখানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

আগামী ডিসেম্বরে নতুন নেতৃত্ব দায়িত্ব নেওয়ার পর রাজপথ আরও উত্তপ্ত হবে বলেই মনে করছেন আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকেরা। এ জন্য দলের সাধারণ সম্পাদক ও গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে নির্বাচনকালীন পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার মতো নেতারা বিবেচনায় থাকবেন বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির গুরুত্বপূর্ণ একজন নেতা বলেন, নির্বাচনকালীন প্রশাসনিক বিষয়াদি এবং অভ্যন্তরীণ কৌশল নির্ধারণের ক্ষেত্রে দলের নেতাদের বড় ভূমিকা থাকে না। মাঠের বক্তৃতা, টিভির টক শোতে অংশ নিয়ে দলের পক্ষে কথা বলা, বিদেশি কূটনীতিকদের সঙ্গে আলোচনা এবং আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে দলকে ভালোভাবে প্রতিনিধিত্ব করাই জ্যেষ্ঠ নেতাদের বড় কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখন নেতা নির্বাচনের ক্ষেত্রে এসবও বিবেচনায় নেওয়া হতে পারে।

সর্বশেষ ২০১৯ সালের ২০ ও ২১ ডিসেম্বর ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আওয়ামী লীগের ত্রিবার্ষিক সম্মেলন হয়েছিল। এবারই একই স্থানে, একই মাসে সম্মেলন হতে যাচ্ছে। মূল আকর্ষণ সাধারণ সম্পাদক পদে কে আসছেন—এই আলোচনা ২৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত দলের নেতা–কর্মীদের মধ্যে জারি থাকবে বলেই মনে হচ্ছে।