ব্যাংক ডাকাতদের কাছেই আবার ব্যাংক ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে: শিশির মনির

সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য শিশির মনিরসহ দলের অন্য নেতারা। আজ সোমবার বিকেলে রাজধানাধীর মগবাজারে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়েছবি: প্রথম আলো

ব্যাংক ডাকাতদের কাছেই আবার ব্যাংক ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য শিশির মনির। তিনি বলেছেন, ‘যারা ব্যাংক লুট করে নিল, সব আমানতকারীর টাকাপয়সা নিয়ে গেল, নতুন আইনে তার শাস্তি ছিল–কীভাবে তার শাস্তি হবে, কীভাবে তা রিকভার (উদ্ধার) করা হবে। এই পুরোটাকে এখান থেকে আউট করে দিয়ে ব্যাংক ডাকাতদের কাছেই আবার ব্যাংক ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে।’

আইনমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও চিফ হুইপের বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে আজ সোমবার বিকেলে রাজধানাধীর মগবাজারে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে শিশির মনির এ কথা বলেন।

শিশির মনির বলেন, পাঁচটা ব্যাংককে অন্তর্বর্তী সরকার একীভূত করেছিল। বর্তমান সরকার ব্যাংক রেজোল্যুশন অধ্যাদেশে সংশোধন এনে যুক্ত করেছে, যাঁরা আসল মালিক ছিলেন অথবা অন্য কোনো ব্যক্তি, বাংলাদেশ ব্যাংক চাইলে তাঁদের আগের বিষয়াদি তাঁদের ফিরিয়ে দিতে পারবে।

জামায়াতের এই কর্মপরিষদ সদস্য বলেন, ইসলামী ব্যাংক থেকে ৭০ হাজার কোটি টাকা সরানো হয়েছিল। ২৪টি বিকল্প কোম্পানি তৈরি করে ইসলামী ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া হয়েছে। তদন্তে দেখা গেছে, এই কোম্পানিগুলো বাস্তবে নেই। ২৪ জায়গা থেকে ২ শতাংশের বেশি শেয়ার নিয়ে এসে তারা বোর্ডে লোক বসিয়েছেন, এভাবে তাঁরা ৮২ শতাংশ শেয়ারের মালিক হয়েছেন। সেই এস আলমের হাতে আবার সেই পাঁচটা কোম্পানির শেয়ার ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

ব্যাংক রেজোল্যুশন অধ্যাদেশ বাতিল করার পেছনে শুধু সরকার জড়িত নয় উল্লেখ করে শিশির মনির বলেন, ‘এইটার পিছনে বড় ধরনের ফাইন্যান্সিয়াল ট্রানজেকশন (আর্থিক লেনদেন) জড়িত। আমরা মনে করি, এভাবে ফাইন্যান্সিয়াল ট্রানজেকশন দিয়ে বাংলাদেশের মানি মার্কেটকে আবার করায়ত্ত করার সুযোগ বিএনপি সরকারকে করে দেওয়া উচিত নয়। যারা ভুক্তভোগী তাদেরটা তাদের কাছেই ফেরত দেওয়া উচিত।’

‘আইনমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য সঠিক নয়’

সংবাদ সম্মেলনে গুম অধ্যাদেশ বিষয়ে আইনমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ব্যাখ্যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় বলে দাবি করেন শিশির মনির। সুপ্রিম কোর্টের এই জ্যেষ্ঠ আইনজীবী বলেন, গুম অধ্যাদেশে গুমের যে সংজ্ঞা ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে গুমের যে সংজ্ঞা দুটি একই, এ জন্য সরকার এটি বাদ দিয়েছে—তাদের এই বক্তব্য আইনগতভাবে সঠিক নয়।

গণভোট প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের বক্তব্য প্রসঙ্গে শিশির মনির বলেন, তাঁরা বলছেন এটা ফ্যাক্টাম ভ্যালেট, ঘটনাক্রমে সিদ্ধ। আদেশ জারি হয়েছে, গণভোট হয়েছে, সেটার বৈধতা আছে। যদি ফ্যাক্টাম ভ্যালেট হয়, বৈধতা আছে বলা হয়, তাহলে এখন সরকারের দায়িত্ব হলো সেটি বাস্তবায়ন করা। একটি বৈধ আইন বাস্তবায়ন না হলে তার দায়দায়িত্ব সরকারের ওপর থাকবে।

কোচিং সেন্টারে কোচিং করানোর বিজ্ঞাপন দেওয়া ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্ট্যাটাস দেওয়ার অভিযোগে ২৮ জন বিচারককে শোকজ করার বিষয়ে শিশির মনির বলেন, শোকজ নোটিশে কোচিং সেন্টারের বিজ্ঞাপনের বিষয়ে কিছু নেই। তবে ফেসবুকে কে কী মন্তব্য করছেন বা ক্লোজ হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে কে কার সঙ্গে কী কথা বলছেন, এ জন্য তাদের শৃঙ্খলা বিধি ভঙ্গ হয়েছে মর্মে শোকজ করা হয়েছে। তবে যে আইনে তাদের শোকজ করা হয়েছে, সে আইন বর্তমানে নেই। আইনটি সুপ্রিম কোর্ট একটি আদেশের মাধ্যমে বাতিল করে দিয়েছেন।

বর্তমান পরিস্থিতিতে কেউ গুম হলে কোথাও প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ নেই বলে উল্লেখ করেন শিশির মনির। তিনি বলেন, আজকে কেউ গুম হলে তার কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই। পুলিশের কাছে গেলে তারা বলবে, তাদের তদন্ত করার আইন নেই। মানবাধিকার কমিশনের কাছে যেতে পারবে না। ট্রাইব্যুনালের কাছে গেলে তারা বলবে, এটা তাদের জুরিসডিকশনের (এখতিয়ার) মধ্যে পড়ে না।

‘সরকারি দল অঙ্গীকার ভঙ্গ করেছে’

সংবাদ সম্মেলনে পাবনা-১ আসনের সংসদ সদস্য নাজিবুর রহমান (মোমেন) বলেন, সংসদীয় বিশেষ কমিটিতে যেভাবে আলোচনা হয়েছে, ঠিক সেভাবেই বিলগুলো একের পর এক সংসদে উত্থাপিত হওয়ার কথা। বিরোধী দলের ‘নোট অব ডিসেন্ট’ (ভিন্নমত) দেওয়া বিলগুলোর বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে, এ বিষয়ে একধরনের ঐকমত্য ছিল। সেই অঙ্গীকার সরকারি দল ভঙ্গ করেছে।

নাজিবুর রহমান বলেন, বিশেষ কমিটির একটা রিপোর্ট বের করা হয়েছে। কমিটির বৈঠকে শুধু বিরোধী দল নয়, সরকারদলীয় কিছু সংসদ সদস্যও মানবাধিকার কমিশন, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়সহ কিছু বিষয়ে নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছিল। কিন্তু রিপোর্টে এসব বিষয়কে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। সরকারি দলের সংসদ সদস্য যাঁরা নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছিলেন, তাঁদের হয়তো জোর করে নোট অব ডিসেন্ট ওঠানো হয়েছে।

নাজিবুর রহমান মোমেন আরও বলেন, বিএনপি সব সময় ঈদের পর আন্দোলনের কথা বলত। সে ঈদ কখনো আসেনি। এখন তারা মানবাধিকার কমিশন, গুম কমিশন, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় বিলের বিষয়ে আন্তর্জাতিকভাবে চাপে পড়েছে। এখন তারা অধিকতর সংশোধন করে সেসব বিল আনার কথা বলছেন। তবে সে জন্য ঈদের পরে আন্দোলনের মতো ১৬ বছর অপেক্ষা করতে হবে কি না, সেটি এখন বড় প্রশ্ন।

সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন জামায়াতের প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, কুড়িগ্রাম-৩ আসনের সংসদ সদস্য মাহবুবুল আলম সালেহী, ঢাকা-৫ আসনের সংসদ সদস্য কামাল হোসাইন, ঢাকা–৪ আসনের সংসদ সদস্য সৈয়দ জয়নুল আবেদীন, জামায়াতের কর্মপরিষদ সদস্য জাহিদুর রহমান প্রমুখ।