সব মিলয়ে বরিশাল মহানগর কার্যত সারা দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। তারা প্রয়োজনে বরিশাল ছাড়তে পারছেন না, প্রবেশও করতে পারছেন না। এর মধ্যে গতকাল সন্ধ্যায় শহরের বিভিন্ন সড়কে ছাত্রলীগ মোটরসাইকেল মহড়া দিয়েছে। লাঠিসোঁটা হাতে খণ্ড খণ্ড মিছিলও হয়েছে।

এমন বিরূপ পরিস্থিতিতেই আজ শনিবার বিকেলে বরিশাল নগরের বঙ্গবন্ধু উদ্যানে (বেলস পার্ক) অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বিএনপির বিভাগীয় গণসমাবেশ। তবে এর মধ্যেও বিএনপির নেতা-কর্মীরা সমাবেশে যোগ দিতে ব্যবহার করছেন নানা কৌশল।

বরিশালের আগে চারটি বিভাগীয় শহরে বিএনপির গণসমাবেশ হয়েছে। এর কোনোটাই নির্বিঘ্নে হতে পারেনি। সবখানেই কমবেশি বাধা ছিল। এর মধ্যে চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ ও খুলনায় পরিবহন ধর্মঘট ছাড়াও সমাবেশে যাওয়ার পথে বিএনপির নেতা-কর্মীদের ওপর হামলা, মারধর ও বাধার ঘটনা ঘটেছে। রংপুরে হামলার ঘটনা ঘটেনি। তবে সেখানেও সমাবেশকে ঘিরে দুদিন আগ থেকেই পরিবহন ধর্মঘট ছিল। বরিশালে গতকাল পর্যন্ত বড় ধরনের হামলা ও মারধরের ঘটনা না ঘটলেও সমাবেশকে ঘিরে তিন দিন আগ থেকেই ক্ষমতাসীন দলের হুমকি-ধামকি ও রাস্তায় রাস্তায় ব্যাপক মহড়া চলেছে। মোটরসাইকেলে করে সমাবেশের উদ্দেশে যাওয়ার পথে গতকাল সন্ধ্যায় পটুয়াখালীর গাবুয়া বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন মহাসড়কে বিএনপির নেতা-কর্মীদের ওপর হামলা হয়েছে। এতে তিনজন আহত হন। দলটির নেতাদের অভিযোগ, সরকারি দলের লোকজন এ হামলা চালিয়েছে।

গণসমাবেশের অন্যতম সমন্বয়ক এবং বিএনপির মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক জহির উদ্দীন স্বপন গতরাতে প্রথম আলোকে বলেন, বরিশাল একটি নদীবহুল এলাকা। দক্ষিণাঞ্চলের রাজধানী এই শহরের সঙ্গে প্রায় অর্ধেক যোগাযোগই নদী নির্ভর। সরকার পরিবহন ধর্মঘটের নামে সড়ক পথ বন্ধ করেছে এবং শেষ মুহূর্তে নৌপথও বন্ধ করে দিয়েছে।

এই অভিযোগ নাকচ করে দিয়ে বরিশাল জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তালুকদার মো. ইউনুস প্রথম আলোকে বলেন, ‘বাস, লঞ্চ এবং অন্যান্য যানের ধর্মঘট ডেকেছে মালিক-শ্রমিকেরা। এর সঙ্গে বিএনপির সমাবেশের কী সম্পর্ক থাকতে পারে? আবার এ জন্য আওয়ামী লীগকে দায়ী করা হচ্ছে কেন?’

বরিশাল নগরে আসার সব পথ বন্ধ হওয়ার পরও নানা উপায়ে বিএনপির নেতা-কর্মীরা সমাবেশে জমায়েত হন। রাত ৯টায় এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত সমাবেশস্থলে পৌঁছান হাজার হাজার নেতা-কর্মী। কথা বলে জানা যায়, কেউ মাছ ধরার ট্রলারে, কেউ ইঞ্জিনচালিত নৌকায়, পণ্যবাহী নৌযানে, কেউবা সাইকেলে করে বরিশাল আসেন। তাঁদের অধিকাংশই রাতে বঙ্গবন্ধু উদ্যানে বিছানা পেতে রাত্রি যাপন করেন।

হেমন্ত ঋতুর এই সময়ে বরিশাল অঞ্চলে এখন শীতের আবহ। দূর-দূরান্ত থেকে আসা নেতা-কর্মীরা খোলা মাঠে থাকতে বিরূপ পরিস্থিতিতে পড়েন। বরগুনা সদর থেকে গতকাল সকালে সাড়ে ৮টায় বরিশাল পৌঁছান লিমন তালুকদার। তিনি বিএনপির সাধারণ কর্মী। দুপুরে সমাবেশস্থলে কথা হয় তাঁর সঙ্গে। তিনি বলেন, বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ৯টায় তাঁরা প্রায় ৩০০ নেতা-কর্মী একটি পণ্যবাহী নৌযান (কার্গো) ভাড়া করে বরিশালের উদ্দেশে রওনা হন।

লিমন তালুকদারদের সঙ্গে আসেন রফিকুল ইসলাম। রাত জেগে নদীপথে এত দুর্ভোগ সহ্য করে কেন সমাবেশে এলেন, জানতে চাইলে রফিকুল প্রথম আলোকে বলেন, ‘সবদিক থেকেই দেশের অবস্থা খারাপ। এ অবস্থা আর চলতে দেওয়া যায় না।’

ঢাকা-বরিশাল লঞ্চও বন্ধ

বরিশাল থেকে ঢাকায় বা ঢাকা থেকে বরিশালে নদীপথে যাতায়াতের অন্যতম বাহন হচ্ছে লঞ্চ। বরিশালের অঞ্চলের বিপুলসংখ্যক মানুষ রাজধানীতে থাকেন। বিএনপির গণসমাবেশ ঘিরে গতকাল বিকেলে লঞ্চ মালিকেরা দুই প্রান্ত থেকেই দুদিনের জন্য চলাচল বন্ধের ঘোষণা দিলে সাধারণ যাত্রীরাও দুর্ভোগের মুখে পড়েন। হঠাৎ কেন এই লঞ্চ ধর্মঘট সে বিষয়ে সরকারি প্রতিষ্ঠান বিআইডব্লিউটিএ এবং লঞ্চ মালিক সমিতি কারোরই সুনির্দিষ্ট কোনো ব্যাখ্যা নেই।

বরিশাল-ঢাকার নৌপথে চলাচলকারী কীর্তনখোলা লঞ্চের মালিক মঞ্জুরুল আহসান বলেছেন, যাত্রী সংকটের কারণে লঞ্চ চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে। তাঁর দাবি, শুক্রবার হওয়ায় যাত্রী নেই। যে যাত্রী পাওয়া যাবে তাতে খরচ উঠবে না। তাই আর্থিক ক্ষতি করে লঞ্চ চালাব না।

তবে আরেক লঞ্চের মালিক সুরভি শিপিং লাইনসের পরিচালক রেজিন উল কবির গতরাতে প্রথম আলোকে বলেন, লঞ্চ শ্রমিকেরা তাঁদের দাবি দাওয়া নিয়ে ধর্মঘট ডাকায় লঞ্চ বন্ধ রাখা হয়েছে। আগামীকাল শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত এই ধর্মঘট ডেকেছে তাঁরা।

যদিও লঞ্চ শ্রমিক ফেডারেশনের বরিশাল বিভাগীয় সভাপতি আবুল হাসেম মাস্টার গতরাতে প্রথম আলোকে বলেছেন, ‘আমরা কোনো ধর্মঘট ডাকিনি। সব করেছে মালিকেরা। এখন সেই দায় আমাদের ওপর চাপাচ্ছে। এটা দুঃখজনক।’

সরগরম সমাবেশস্থল

চারদিক থেকে নানা উপায়ে নেতা-কর্মীরা বরিশালে পৌঁছালেও কেউ মিছিল নিয়ে সমাবেশস্থলে যাচ্ছেন না। সবাই দল বেঁধে নীরবে পায়ে হেঁটে সমাবেশস্থলে যাচ্ছেন। তবে সমাবেশস্থলে পৌঁছেই নেতা-কর্মীরা মুহুর্মুহু স্লোগানে সরগরম করে তুলছেন আশপাশ।

বিএনপি নেতাদের অভিযোগ, গণসমাবেশ বানচাল করতে শুরু থেকেই সরকারি দল নানা ধরনের হুমকি এবং ত্রাস সৃষ্টি করে নেতা-কর্মীদের মধ্যে ভীতি সঞ্চারের চেষ্টা করেছে। এরপর পরিবহন মালিকদের দিয়ে পরিবহন ও লঞ্চ ধর্মঘট দিয়েছে। যাতে বিএনপির সমাবেশে উপস্থিতি কম হয়।

বিএনপির এই গণসমাবেশের অন্যতম সমন্বয়ক জহির উদ্দীন স্বপন বলেন, সব প্রতিবন্ধকতা উপেক্ষা করে বরিশাল শহরের সমাবেশস্থলে বিপুল মানুষের জমায়েত হয়ে গেছে। শনিবার প্রমাণ হবে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ এ সরকারকে প্রত্যাখ্যান করেছে।