সংখ্যালঘু সম্প্রদায় থেকে ৮০ প্রার্থী
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ৮০ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তাঁদের মধ্যে স্বতন্ত্র প্রার্থী ১২ জন। আর সংখ্যালঘু প্রার্থীদের মধ্যে ১০ জন নারী।
বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ ২২টি রাজনৈতিক দল এবারের নির্বাচনে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ৬৮ জনকে প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দিয়েছে। নির্বাচন কমিশনে এখন নিবন্ধিত দল ৬০টি। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের নিবন্ধন স্থগিত আছে, দলটির কার্যক্রমও নিষিদ্ধ।
নির্বাচনে অংশ নিতে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মোট ৮৮ জন মনোনয়নপত্র দাখিল করেছিলেন। এর মধ্যে ৫ জন প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল করে নির্বাচন কমিশন। আর ৩ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করেছেন। এখন ৮০ জন ভোটের লড়াইয়ে রয়েছেন।
রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি সংখ্যালঘু প্রার্থী দিয়েছে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), ১৭ জন।
বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের অন্যতম সভাপতি নির্মল রোজারিও প্রথম আলোকে বলেন, যতক্ষণ পর্যন্ত সংখ্যালঘু সম্প্রদায় রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণপ্রক্রিয়ায় যেতে না পারবে এবং প্রভাব সৃষ্টি করতে না পারবে, ততক্ষণ পর্যন্ত তাদের অধিকার, উন্নয়ন ও অস্তিত্ব রক্ষা করা সম্ভব হবে না। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে রাজনৈতিক প্রক্রিয়া ও নির্বাচনে আরও বেশি করে সম্পৃক্ত হতে হবে।
বিএনপিতে ছয়জন, জামায়াতে একজন
সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ছয়জনকে এবার প্রার্থী করেছে বিএনপি। তাঁদের মধ্যে বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের নেতা দুজন। তাঁরা হলেন দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় (ঢাকা-৩) ও ভাইস চেয়ারম্যান নিতাই রায় চৌধুরী (মাগুরা-২)।
বিএনপি থেকে মনোনয়ন পাওয়া অন্য চারজন প্রার্থী হলেন কপিল কৃষ্ণ মণ্ডল (বাগেরহাট-১), সোম নাথ দে (বাগেরহাট-৪), দীপেন দেওয়ান (রাঙামাটি) ও সাচিং প্রু (বান্দরবান)।
জামায়াতে ইসলামী দেশের কোনো জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই প্রথম সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের একজনকে মনোনয়ন দিয়েছে। হিন্দু-অধ্যুষিত খুলনার দাকোপ ও বটিয়াঘাটা উপজেলা নিয়ে গঠিত খুলনা-১ আসনে জামায়াতে ইসলামী থেকে নির্বাচন করছেন কৃষ্ণ নন্দী। তাঁর বাড়ি খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার চুকনগরে। ব্যবসায়ী কৃষ্ণ নন্দী ডুমুরিয়া উপজেলা জামায়াতের হিন্দু কমিটির সভাপতি।
খুলনা-১ আসনে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মোট আটজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এর মধ্যে জামায়াত, জাতীয় পার্টি, সিপিবিসহ ছয়টি রাজনৈতিক দল সংখ্যালঘু সম্প্রদায় থেকে প্রার্থী মনোনয়ন দিয়েছে। এর বাইরে খুলনা-১ আসনে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় থেকে দুজন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করছেন।
জাতীয় নাগরিক পার্টিও (এনসিপি) সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের একজনকে প্রার্থী করেছে। দলটি থেকে মৌলভীবাজার-৪ আসনে নির্বাচন করছেন প্রীতম দাশ। তিনি এনসিপির সিলেট অঞ্চলের ‘তত্ত্বাবধায়ক’।
জাতীয় পার্টির মনোনয়নে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের চারজন প্রার্থী এবার নির্বাচন করছেন। তাঁরা হলেন বহ্নি ব্যাপারী (ঢাকা-১০), সাজন কুমার মিস্ত্রী (বাগেরহাট-৪), মিথিলা রোয়াজা (খাগড়াছড়ি) ও অশোক তালুকদার (রাঙামাটি)।
তিনটি দল দুজন করে সংখ্যালঘু প্রার্থী মনোনয়ন দিয়েছে
সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের দুজনকে মনোনয়ন দিয়েছে গণসংহতি আন্দোলন। দলটির হয়ে লালমনিরহাট–৩ আসনে দীপক কুমার রায় এবং নারায়ণগঞ্জ–৩ আসনে নির্বাচন করছেন অঞ্জন দাশ।
গণ অধিকার পরিষদও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের দুজনকে মনোনয়ন দিয়েছে। তাঁরা হলেন বরিশাল–২ আসনের প্রার্থী রঞ্জিত কুমার বাড়ৈ এবং খাগড়াছড়ি আসনে দীনময় রোয়াজা।
গণফোরাম থেকে গোপালগঞ্জ–৩ আসনে দুলাল চন্দ্র বিশ্বাস এবং চট্টগ্রাম–১১ আসনে উজ্জল ভৌমিক নির্বাচন করছেন।
বামপন্থী দলগুলো থেকে সংখ্যালঘু প্রার্থী বেশি
সংখ্যালঘু সম্প্রদায় থেকে সবচেয়ে বেশি প্রার্থী দিয়েছে বামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলো। সিপিবি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ১৭ জনকে প্রার্থী করেছে।
সিপিবি থেকে মনোনয়ন পাওয়া সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রার্থীরা হলেন নিমাই চন্দ্র রায় (লালমনিরহাট–২), মধুসূদন রায় (লালমনিরহাট–৩), শিপন কুমার রবিদাস (বগুড়া–৫), কিশোর কুমার রায় (খুলনা–১), চিত্ত রঞ্জন গোলদার (খুলনা–৫), প্রশান্ত কুমার মণ্ডল (খুলনা–৬), মানবেন্দ্র দেব (গাজীপুর–৪), মন্টু চন্দ্র ঘোষ (নারায়ণগঞ্জ–৫), নীরদ বরণ মজুমদার (গোপালগঞ্জ–১), নিরঞ্জন দাস (সুনামগঞ্জ–২), জহর লাল দত্ত (মৌলভীবাজার–৩), অমৃত কুমার রায় (দিনাজপুর–৩), মিহির কুমার ঘোষ (গাইবান্ধা–২), শ্রী নিরমল (গাইবান্ধা–৫), ত্রিদ্বীপ কুমার সাহা (ঢাকা–৮), কল্লোল বনিক (ঢাকা–১২) ও প্রমোদ বরন বড়ুয়া (চট্টগ্রাম–৭)।
সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ছয়জনকে মনোনয়ন দিয়েছে বাসদ। তাঁরা হলেন কালিপদ সরকার (নওগাঁ–৩), শম্পা বসু (মাগুরা–১), জনার্দন দত্ত (খুলনা–৩), মনীষা চক্রবর্ত্তী (বরিশাল–৫), প্রণব জ্যোতি পাল (সিলেট–১) ও মিলন কৃষ্ণ মণ্ডল (লক্ষ্মীপুর–৪)।
বাসদ (মার্ক্সবাদী) সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সাতজনকে মনোনয়ন দিয়েছে। তাঁরা হলেন প্রগতি বর্মণ তমা (রংপুর–৪), পরমানন্দ দাস (গাইবান্ধা–১), শেখর কুমার রায় (ময়মনসিংহ–৪), সীমা দত্ত (ঢাকা–৭), সঞ্জয় কান্ত দাস (সিলেট–১), বিটুল চন্দ্র তালুকদার (নোয়াখালী–৪) ও দীপা মজুমদার (চট্টগ্রাম–১১)।
জেএসডির প্রার্থী হিসেবে খুলনা–১ আসনে নির্বাচন করছেন প্রসেনজিৎ দত্ত। বাংলাদেশ জাসদের হয়ে ভোট করছেন গৌতম চন্দ্র শীল (পটুয়াখালী–১) ও বড়ুয়া মনোজিত ধীমন (কুমিল্লা–১)।
বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টিও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের দুজনকে প্রার্থী করেছে। তাঁরা হলেন চম্পা রানী সরকার (নেত্রকোনা–৪) ও জুঁই চাকমা (রাঙামাটি)।
বিএমজেপির ৭ প্রার্থী
বাংলাদেশ মাইনরিটি জনতা পার্টি (বিএমজেপি) থেকে এবার আটজন নির্বাচন করছেন। তাঁদের মধ্যে সাতজনই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের। দলটির সভাপতি সুকৃতি কুমার মণ্ডল যশোর–৪ (অভয়নগর-বাঘারপাড়া) আসন থেকে ভোট করছেন।
এ ছাড়া বিএমজেপির হয়ে ভোট করছেন কমলা কান্ত রায় (ঠাকুরগাঁও–২), তরুণ কুমার ঘোষ (কুষ্টিয়া–৪), প্রবীর গোপাল রায় (খুলনা–১), মৃণ্ময় কান্তি দাস (ফরিদপুর–১), রুবেল গাইন (সাতক্ষীরা–৩) ও উশ্যেপ্রু মারমা (খাগড়াছড়ি)।
বিএমজেপির সভাপতি সুকৃতি কুমার মণ্ডল প্রথম আলোকে বলেন, তাঁরা নয়জনকে মনোনয়ন দিয়েছিলেন। সবার মনোনয়নই বৈধ হয়েছিল। এর মধ্যে আটজন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের। এই আট প্রার্থীর মধ্যে একজনের বাবা মারা যাওয়ায় তিনি প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নেন।
সুকৃতি কুমার মণ্ডল বলেন, ভোটের মাঠে এখন পর্যন্ত কোনো প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হননি তাঁরা।
আরও যেসব দল মনোনয়ন দিল
জাকের পার্টি থেকে রঘুনাথ চন্দ্র রায় (দিনাজপুর–১), বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট থেকে সুনীল শুভ রায় (খুলনা–১), বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টি থেকে নিতাই চক্রবর্তী (মাদারীপুর–৩), বাংলাদেশ কংগ্রেস থেকে উজ্জল চন্দ্র রায় (রংপুর–৪), বাংলাদেশ সমঅধিকার পার্টি থেকে সুব্রত মণ্ডল (খুলনা–১), বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি থেকে সুবল চন্দ্র মজুমদার (মাদারীপুর–২), বাংলাদেশ লেবার পার্টি থেকে জগদীশ বড়ুয়া (কক্সবাজার–৩) এবং বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোট থেকে সজল কুমার কর (কুমিল্লা–৭) জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
১২ স্বতন্ত্র প্রার্থী
স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ১৮ জন এবারের নির্বাচনে মনোনয়নপত্র দাখিল করেছিলেন। এর মধ্যে পাঁচজনের মনোনয়নপত্র বাতিল করে নির্বাচন কমিশন। একজন মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করেন। বাকি ১২ জন ভোটের লড়াইয়ে আছেন। এর মধ্যে কোটালীপাড়া ও টুঙ্গিপাড়া নিয়ে গঠিত গোপালগঞ্জ-৩ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ভোট করছেন বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাজোটের মহাসচিব গোবিন্দ চন্দ্র প্রামাণিক। রিটার্নিং কর্মকর্তার বাছাইয়ে তাঁর মনোনয়ন বাতিল করা হয়েছিল। পরে নির্বাচন কমিশনে আপিল করে তিনি প্রার্থিতা ফিরে পান।
এ ছাড়া সুকেশ সাহা আনন্দ (নড়াইল–১), অচিন্ত্য কুমার মণ্ডল (খুলনা–১), গোবিন্দ হালদার (খুলনা–১), জিত বড়ুয়া (গাজীপুর–২), উৎপল বিশ্বাস (গোপালগঞ্জ–২), মিল্টন বৈদ্য (মাদারীপুর–২), এস এন তরুণ দে (ব্রাহ্মণবাড়িয়া–২), সমীরন দেওয়ান (খাগড়াছড়ি), ধর্ম জ্যোতি চাকমা (খাগড়াছড়ি), জিরুন ত্রিপুরা (খাগড়াছড়ি) ও পহেলা চাকমা (রাঙামাটি) স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে জাতীয় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
নারী প্রার্থী যাঁরা
সংখ্যালঘু সম্প্রদায় থেকে ১০ জন নারী এবার জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তাঁদের মধ্যে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করছেন একজন।
বাকি নয়জন বিভিন্ন দলের প্রার্থী। এর মধ্যে বাসদ (মার্ক্সবাদী) থেকে নির্বাচন করছেন তিনজন। তাঁরা হলেন সীমা দত্ত (ঢাকা-৭), প্রগতি বর্মণ তমা (রংপুর-৪) ও দীপা মজুমদার (চট্টগ্রাম-১১)।
বাসদ থেকে নির্বাচন করছেন দুজন, মনীষা চক্রবর্ত্তী (বরিশাল–৫) ও শম্পা বসু (মাগুরা–১)।
বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি থেকে নির্বাচন করছেন জুঁই চাকমা (রাঙামাটি) ও চম্পা রানী সরকার (নেত্রকোনা–৪)।
জাতীয় পার্টির প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করছেন দুজন। তাঁরা হলেন বহ্নি ব্যাপারী (ঢাকা-১০) ও মিথিলা রোয়াজা (খাগড়াছড়ি)।
এ ছাড়া স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে জিরুনা ত্রিপুরা (খাগড়াছড়ি) নির্বাচন করছেন।
বাসদের প্রার্থী মনীষা চক্রবর্ত্তী প্রথম আলোকে বলেন, নারী বা সংখ্যালঘু হিসেবে তিনি রাজনীতি করেন না। জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে রাজনীতি করেন তিনি।