আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে ভোটার উপস্থিতি কমার সম্ভাবনা দেখছে না ইসি

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট উপলক্ষে দেশি-বিদেশি নির্বাচন পর্যবেক্ষক ও সাংবাদিকদের উদ্দেশে আয়োজিত নির্বাচন কমিশনের ব্রিফিং। ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেল, ঢাকা। ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ছবি: তানভীর আহাম্মেদ

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশ না নেওয়ায় নির্বাচনের ফলাফলের গ্রহণযোগ্যতার ওপর প্রভাব পড়বে কি না, সে প্রশ্ন তুলেছেন ঢাকায় আসা একাধিক বিদেশি সাংবাদিক। তাঁদের এ প্রশ্নের সদুত্তর দিতে পারেনি নির্বাচন কমিশন (ইসি)। তবে নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে ভোটার উপস্থিতি কমার কোনো সম্ভাবনা দেখছেন না নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ। কারণ হিসেবে তিনি বলেছেন, আওয়ামী লীগ এই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে না পারলেও তাদের শরিক দল অংশ নিচ্ছে।

নির্বাচনের আগের দিন আজ বুধবার রাজধানীর একটি হোটেলে বিদেশি নির্বাচন পর্যবেক্ষক ও গণমাধ্যমকর্মীদের জন্য নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিবালয় ব্রিফিংয়ের আয়োজন করে। সেখানে নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরের দিন শুক্রবার সকালে সারা দেশ থেকে আসা ফলাফল গণনা করে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা করা হবে।

বিবিসির একজন সাংবাদিক নির্বাচন কমিশনারের কাছে জানতে চান, নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য করতে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে; কিন্তু একটি গুরুত্বপূর্ণ দল কার্যত নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না—এতে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতার ওপর ছায়া পড়ছে কি না? বাংলাদেশে এমন মানুষ থাকতে পারেন, যাঁরা ওই দলকে সমর্থন করতে চান, কিন্তু আগামীকাল ব্যালট পেপারে তাঁদের সেই পছন্দ থাকবে না। নির্বাচনের বৈধতা নিয়ে সরকার কি উদ্বিগ্ন নয়—এ প্রশ্নের জবাবে আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেন, ‘এই নির্বাচনের প্রেক্ষাপট ভুলে গেলে চলবে না। দেড় দশক ধরে এই দেশ গণতান্ত্রিক ঘাটতির মধ্যে ছিল। এই সময়ে যাঁরা এখন ত্রিশের কোঠায়, তাঁরা কখনো ভোট দেওয়ার সুযোগ পাননি। আমরা একটি রূপান্তর প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। যাঁরা মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নেওয়া সেই নির্বাচনী প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত ছিলেন, তাঁরা এখন আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি। সে কারণেই কিছু সত্তা নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না। তবে এতে ভোটার উপস্থিতি কমবে না—আপনারা আগামীকাল তা দেখবেন।’

সম্পূরক প্রশ্নে বিবিসির আরেক সাংবাদিক জানতে চান, তাহলে কি আপনি নিষেধাজ্ঞাকে সমর্থন করছেন? জবাবে নির্বাচন কমিশনার বলেন, ‘আমি বলছি, এটি একটি নির্দিষ্ট প্রেক্ষাপটের বিষয়। আমাদের জুলাই-আগস্ট ২০২৪-এর ঘটনাগুলো ভুলে গেলে চলবে না।’

# আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে ভোটার উপস্থিতি কমার সম্ভাবনা দেখছে না ইসি
# নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতার ওপর আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন

এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের অবস্থান জানতে চাইলে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেন, ‘আমরা ভোটার উপস্থিতি কমার কোনো সম্ভাবনা দেখছি না। রাজনৈতিক মতাদর্শ নির্বিশেষে মানুষের মধ্যে সমান উৎসাহ রয়েছে। কিছুসংখ্যক মানুষ না-ও আসতে পারেন—এটি সব সময়ই ঘটে। কিন্তু সামগ্রিকভাবে অধিকাংশ মানুষই ভোট দেবেন। আর যে দলের কথা বলছেন, তারা একা ছিল না—তাদের অন্য অংশীদাররা নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে।’

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও সহিংসতার অভিযোগ আছে। নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা কি দুর্বল নয়—এ প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে নির্বাচন কমিশনার পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে বলেন, ‘আমি একটি পাল্টা প্রশ্ন করি—কেউ কাজ করছে কি না, তা কি সব সময় দৃশ্যমান হয়? আমরা কার্যকরভাবে কাজ করছি। নিরপেক্ষ সরকারের অধীন নির্বাচন সব সময় ভালো—বাংলাদেশ ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১, ২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীন সফল নির্বাচন করেছে। বর্তমানে অন্তর্বর্তী সরকারের কারণে সরকারি প্রভাব নেই। সাম্প্রতিক সময়ের তুলনায় এটি অন্যতম সেরা পরিবেশ। বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটেছে, তবে আমরা সতর্ক। ইতিহাসে এবারই সর্বোচ্চ সক্ষমতা মোতায়েন করা হয়েছে—৯ লাখ ৫০ হাজারের বেশি সদস্য মাঠে, প্রথমবার ইউএভি, ড্রোন, বডি ক্যামেরা, সিসিটিভি ব্যবহার হচ্ছে।’

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট উপলক্ষে দেশি-বিদেশি নির্বাচন পর্যবেক্ষক ও সাংবাদিকদের উদ্দেশে আয়োজিত নির্বাচন কমিশনের ব্রিফিং। ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেল, ঢাকা। ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
ছবি: তানভীর আহাম্মেদ

এই নির্বাচন কমিশনার বলেন, ‘১৩ ডিসেম্বর থেকে “অপারেশন ডেভিল হান্ট” শুরু হয়েছে; প্রায় ৯০০ অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে। তিন স্তরের নিরাপত্তা বলয় রয়েছে। সাধারণ কোনো হুমকি নেই। বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটতে পারে, আমরা ব্যবস্থা নেব।’

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেন, ‘তবে আমরা এমন ঘটনার সম্ভাবনা উড়িয়ে দিচ্ছি না। বিশেষ করে আজ রাতে সব রিটার্নিং কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটতে পারে—আমরা সে বিষয়ে প্রস্তুত আছি। আর চরম পরিস্থিতিতে যদি কোনো কেন্দ্র এতটাই ক্ষতিগ্রস্ত হয় যে সেখানে ভোট নেওয়া সম্ভব না হয়, তাহলে সেদিনই বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

পোস্টাল ভোটের বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে নির্বাচন কমিশনার জানান, পোস্টাল ভোটের রেজিস্ট্রেশন ডিজিটাল ছিল, বাকিটা ম্যানুয়াল। প্রতিটি পোস্টাল ভোট সংসদীয় আসন অনুসারে গণনা করা হবে। ভোটের দিন বিকেল চারটার মধ্যে যে ভোটগুলো পোস্টে পৌঁছাবে, শুধু সেগুলোই গণনা করা হবে বলে জানান তিনি।

নির্বাচনের ফলাফল কবে ঘোষণা করা হবে জানতে চাইলে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেন, বিকেল ৪টা ৩০ মিনিটে ভোট শেষ হবে। এরপরই গণনা শুরু হবে। প্রতিটি কেন্দ্রে গড়ে দুই–তিন হাজার ভোট, দুই ধরনের ব্যালট—গণনায় চার থেকে ছয় ঘণ্টা লাগতে পারে। রাত থেকে ভোরের মধ্যে প্রাথমিক ফল আসতে শুরু করবে।’

ওই অনুষ্ঠানে প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে (সিইসি) প্রশ্ন করা হয়েছিল আগের দুই সিইসি যথাযথভাবে দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হওয়ায় তাঁরা এখন কারাগারে। নির্বাচনের সামনে দাঁড়িয়ে পূর্বসূরিদের পরণতি তাঁকে ভাবায় কি না? সিইসি এ এম এম নাসির উদ্দীন বলেন, ‘অবাধ, সুষ্ঠু ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের জন্য আমরা এ পর্যন্ত যা করেছি, জাতির কাছে যে ওয়াদা দিয়েছি সে লক্ষ্যেই আইনকানুনের মধ্যে থেকেই কাজ করছি। সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা থেকেই কাজ করছি। আমরা যে কমিটমেন্ট (প্রতিশ্রুতি) দিয়েছি, সেই কমিটমেন্টকে ফোকাসে (লক্ষ) রেখেই কাজ করছি। সুতরাং আমাদের ভয়ের কোনো কারণ নেই।’

ব্রিফিংয়ে আরও বক্তব্য দেন ইসির জ্যেষ্ঠ সচিব আখতার আহমেদ।